#সিলেট বিভাগ

বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে সিলেট শহর।

সিলেট প্রতিনিধি :
পাহাড়ি ঢল আর অতি বৃষ্টিতে সিলেটের ছয় উপজেলাসহ মহানগরীর বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। পানিবন্দি মানুষ শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছেন। বুধবার নগরীর আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়েছে। একের পর এক রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও জলমগ্ন অবস্থায় রয়েছে। কয়েক দিন ধরে পানিবন্দি অবস্থায় থাকা নগরবাসী চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মজিবর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, কিছু সরকারি স্থাপনায় পানি উঠলেও সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে না। সব প্রতিষ্ঠানেরই স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত আছে। বন্যায় জেলাজুড়ে ১৯৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এ ছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারি করার নির্দেশনা দেওয়া আছে।

বন্যাকবলিতদের জন্য দ্বিতীয় দফায় ১০০ মেট্রিক টন চাল এবং তিন হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর আগে ১২৯ টন চাল ও এক হাজার প্যাকেট শুকানো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল বলে জানান জেলা প্রশাসক। বুধবার দুপুরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এনামুল হক বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ করেন।

দুপুরে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেটের প্রধান নদী সুরমা কানাইঘাট পয়েন্টে বিপৎসীমার ১২৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সিলেট পয়েন্টে ১৩ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৪২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অপরদিকে সুনমাগঞ্জ পয়েন্টে ১৭ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এ ছাড়া কুশিয়ারা নদীর পানি অমলসিদ পয়েন্টে ২০ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ১৫৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অপরদিকে শেওলা পয়েন্টে নদীটির পানি ৮ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৫৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলের কতিপয় স্থানে বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হতে পারে বলে পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে।

সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সিলেট ফায়ার সার্ভিস অফিস, সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শকের কার্যালয়, কোতোয়ালি থানা, বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয়, তোপখানা সড়ক ও জনপথের কার্যালয়, সোবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়ি, তালতলা, উপশহর ও বিদ্যুতের আঞ্চলিক কার্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকেছে।

নগরীর বন্যাকবলিত এলাকা ও উপজেলাগুলোর বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এখন পানি। বন্যা পরিস্থিতির অবনতিতে নগরীর সাতটি ওয়ার্ডে ১৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করেছে সিলেট সিটি করপোরেশন। এদিকে সিলেট আবহাওয়া অফিসের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিন এই বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে। তাছাড়াও ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বৃষ্টিও কমছে না। তাই পাহাড়ি ঢল নামায় পানি বাড়ছে।

সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ১ হাজার ৪৭৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এর মধ্যে বুধবার দুপুর পর্যন্ত ৪শত টি পানিতে প্লবিত হয়েছে। এছাড়া মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রায় দেড় শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় পানি ওঠেছে। এগুলোতেও বন্ধ রয়েছে পাঠদান। ফলে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্ধ রয়েছে পাঠদান কার্যক্রম।

মহামারি করোনার কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এরপর কিছুদিন ক্লাস হওয়ার পরই শুরু হয় ঈদের ছুটি। সেই ছুটি শেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতেই সিলেটে বন্যার কারণে পাঠদান ফের ব্যাহত হচ্ছে।

সিলেটের অন্তত সাড়ে ৫শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া দুই শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খোলা হয়েছে আশ্রয় কেন্দ্র। ফলে জেলার প্রায় সাড়ে ৭শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

এদিকে সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। এতে দুই শতাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয় প্লাবিত হয়েছে বলে জানা গেছে। বন্যার কারণে মঙ্গলবার ২৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিপিইও) এসএম আব্দুর রহমান। তিনি বলেন, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে মঙ্গলবার সকাল থেকে অস্বাভাবিক হারে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে দোয়ারাবাজার, ছাতক উপজেলা প্লাবিত হয়েছে বেশি। এছাড়াও সুনামগঞ্জ সদর, তাহিরপুর, শান্তিগঞ্জ উপজেলাসহ পাঁচটি উপজেলার ২১৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্লাবিত হয়েছে।

ছাতক, দোয়ারাবাজার ও তাহিরপুর উপজেলার ১৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বন্যাশ্রয় কেন্দ্র এবং ১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি প্রবেশ করায় মঙ্গলবার থেকে ২৮টি বিদ্যালয় সাময়িক বন্ধ করা হয়েছে।

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আরও বলেন, হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পাওয়ার পর আমরা বিভিন্ন বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছি। বিদ্যালয় ক্যাম্পাসের চারদিকে পানির কারণে অভিভাবকরা শিক্ষার্থীদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন না। তবে বিদ্যালয়ে সকল শিক্ষকদের উপস্থিতি আগের মতোই বাধ্যতামূলক রয়েছে।

তথ্যসূত্র : দৈনিক সিলেট।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *