#সিলেট বিভাগ

দুই প্রবাসীকে জেলদন্ড দেয়ায় নিন্দার ঝড়।

যুক্তরাজ্য ফেরত দুই ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী বাংলাদেশির জেল-জরিমানা নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়েছে। প্রবাস থেকে নিন্দার ঝড় বইতে শুরু করেছে।

জানা যায়, সিলেট নগরীর দরগাগেইটস্থ হোটেল স্টার প্যাসিফিকে তারা কোয়ারেন্টিনে থাকাবস্থায় করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দেন। পরবর্তিতে সিলেটের সিভিল সার্জন অফিস থেকে তারা ব্যক্তিগতভাবে তাদের করোনা নেগেটিভ রির্পোট সংগ্রহ করে হোটেল ছাড়তে চান। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলেও বাধ সাধে হোটেল কর্তৃপক্ষ। হোটেল কর্তৃপক্ষ তাদের কাছে ১০ দিনের ভাড়া দাবী করে। তারা ৭ দিনের ভাড়া দিতে চায়। এনিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে হোটেল স্টার প্যাসিফিকের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে জানানো হয় যুক্তরাজ্য ফেরত দুই প্রবাসী কোয়ারেন্টিন না মেনে পালিয়ে যাচ্ছেন।

খবর পেয়ে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মেজবাহ উদ্দিনের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে গত মঙ্গলবার রাতে তাদের প্রত্যেককে ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদন্ড ও ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। এছাড়া ১০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদন্ডের আদেশ দেয়া হয়। তবে উভয় প্রবাসীই অর্থদন্ড পরিশোধ করেন। ভ্রাম্যমান আদালতের রায় অনুযায়ী ৭ দিনের সাজাভোগের জন্য মঙ্গলবার রাতেই তাদেরকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

এই দুই প্রবাসী একজন সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার চানপুর গ্রামের আবদুল রউফের ছেলে আলম হাসান রউফ (৩৫) ও সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার গোদামপুর গ্রামের মৃত আলতাব আলীর ছেলে মো. আবদুল নূর (৪২)। তারা দু’জনই দেশে এসেছিলেন একটি মহৎ কর্ম নিয়ে। তারা এসেছিলেন এলাকার বিপুল সংখ্যক গরীব অসহায় মানুষদেরকে পবিত্র রমজানের আগে খাদ্য সহায়তা দিতে। আর এ নিয়ে একটি অনুষ্ঠানও করার কথা ছিলো যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন এমপি থাকার কথা ছিলো।

অন্য একটি সূত্র জানায়, এই দুই প্রবাসী সিলেটের জেলা প্রশাসকের অফিসে হাজির হয়ে ছিলেন জামিনের জন্য। প্রায় সারা দিন অপেক্ষা করার পরও তাদের জামিন হয়নি। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মো. মেজবাহ উদ্দিন নাকি ছুটিতে তার স্বাক্ষর ছাড়া জামিন হবেনা। তিনি রোববার ফিরবেন, আর তখন এই দুই প্রবাসীর সাজার মেয়াদ শেষ হয়ে আসবে , জামিনের আর প্রয়োজন হবে না।

এ ব্যাপারে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট কমিউনিটি নেতা আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, যুক্তরাজ্য প্রবাসী আলম হাসান রউফ ও মো. আবদুল নূর এই দুই ব্যক্তিকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি, তারা চ্যারিটি ওর্য়াকার। তাদের সাথে যে আচরণ করা হয়েছে এটা মেনে নেয়া কষ্ট কর। প্রবাসী হিসেবে তাদেরকে জেল না দিয়ে অর্থ দন্ড দিয়ে সর্তক করা যেত। তবে প্রবাসীদেরকেও আইন মেনে চলা উচিৎ। আমাদের সরকার চান প্রবাসীরা দেশে ঘন ঘন আসুক এবং দেশে বিনিয়োগ করুক। সে জন্য প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রবাসীদের কল্যাণে নানা ধরণের উদ্যোগ গ্রহন করেছেন।
প্রবাসীদের প্রতি সংশ্লিষ্ট সকলের আরো উদার এবং মানবিক হবার জন্য আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী আহ্বান জানান।

গ্রেটার সিলেট ডেভেলাপমেন্ট এন্ড ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল ইন ইউকের সাধারণ সম্পাদক খসরু মোহাম্মদ খান ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, এ ধরণের হয়রানী আমরা মেনে নিতে পারিনা। কেউ ছুটিতে গেলে কিংবা মারা গেলে এ জন্য তো প্রশাসনের কর্মকান্ড আটকে থাকতে পারে না। তিনি বলেন, এটা সিলেট এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন বিরোধীদের গভীর যড়যন্ত্র। এরা চায় না প্রবাসীরা দেশে আসুক দেশে রেমিটেন্স প্রেরণ করুক, দেশের উন্নয়নে সম্পৃক্ত থাকুক। জিএসসি এর সাধারণ সম্পাদক যুক্তরাজ্য ফেরত দুই ব্রিটিশ বাংলাদেশি হয়রানীর ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবী করেন।

স্যান্ডওয়েল ইউকে আওয়ামী লীগের সভাপতি মো: বিলাল বদরুল বলেন, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের সাথে এমন অমানবিক আচরণ আমরা মেনে নিতে পারিনা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুক্তরাজ্য প্রবাসী সিলেটিদের খুব বেশি ভালোবাসতেন। কোন ধরনের বিলম্ব না করে তাদের দাবী মেনে নিতেন। বঙ্গবন্ধু আবেগজড়িত কন্ঠে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন
‘সিলেটের প্রবাসী জনগন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবনবাজী রেখে যে অবদান রেখেছেন অসহযোগ আন্দোলনে সিলেটের জনগন যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ তা চিরদিন স্মরণ রাখবে। সিলেটের জনগনের সংগ্রামী ভূমিকা দেশ কখনো ভুলবে না।’ অথচ আজ প্রবাসী দেশে গিয়ে নানা ধরণের হয়রানীর শিকার হচ্ছে। আমি মনে করি সরকারের সকল সফলতাকে ম্লান করতে প্রশাসনে একটি চক্র অতি উৎসাহী হয়ে এই সব কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। এ ব্যাপারে তদন্ত হওয়া দরকার।

পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রে মো. মেজবাহ উদ্দিন এই দুই প্রবাসীর ব্যাপারে আরো মানবিক হতে পারতেন। প্রবাসীদের বক্তব্যকে গুরুত্ব না দিয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যকে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন।

তিনি ইচ্ছে করলে জেল না দিয়ে শুধু অর্থদন্ড দিতে পারতেন। তাহলে দেশের এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হতো না। বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন প্রবাসীদের উন্নয়নে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন। যে কারণে প্রবাসীরা সরকারের উপর খুবই আস্থাশীল। প্রশাসনের কিছু সংখ্যক কর্মকর্তার এই সব কান্ডজ্ঞানহীন কর্মই সরকারের সকল সফলতাকে ম্লান করে দিচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে সিলেট ১ আসনের এমপি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সাথে কথা বললে তিনি জানান, প্রবাসীরা আমাদের দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখে যাচ্ছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসীদের ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গৌরবজনক অধ্যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রবাসীদের প্রতি খুবই আন্তরিক। বর্তমান সরকার প্রবাসীবান্ধব সরকার। আমরা প্রবাসীদের প্রতি কোন ধরণের অমানবিক কর্মকান্ড মেনে নিতে পারিনা। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য প্রবাসী এই দুই ব্যক্তির ব্যাপারে কোন ধরণের অনিয়ম এবং আইনের ব্যত্যয় ঘটলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

জামিন আবেদন প্রসঙ্গে সিলেটের জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলামের সাথে কথা বললে তিনি জানান, জামিনের ব্যাপারে যে কথা বলা হচ্ছে সেটা সঠিক নয়। মামলার সার্টিফাই কপি না পাওয়ায় ঐদিন জামিনে কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রে মো. মেজবাহ উদ্দিন ছুটিতে থাকার যে কথা বলা হয়েছে সেটাও তথ্য নির্ভর নয়।তিনি সরকারী গুরুত্বপূর্ণ কাজে ঢাকা গিয়েছিলেন। জেলা প্রশাসক আরো বলেন, আইনের ঊর্ধ্বে আমরা কেউই নই। আইন ভঙ্গের জন্য দুই প্রবাসীকে যে শাস্তি দেয়া হয়েছে সেটা রাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী করা হয়েছে।

তথ্যসূত্রঃ দৈনিক সিলেট।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *