‘মিনুর স্বপ্ন’ – শামীমা এম রিতু।
(১)
হেমন্তের শেষ বিকাল। শীত এসেই গেছে বলা যায়।দুপাশে ধানের শীষে আলতো দোল দিয়ে যাচ্ছে উত্তরীয় হাওয়া।পাখিরা কিচির মিচির করতে করতে যার যার ঘরে ফিরে যাচ্চে। পাখিদের সাথে পাল্লা দিয়ে মেঠো পথে দ্রুত গতিতে হেঁটে চলেছে একটি মেয়ে। হাতে ব্যাগ ঝোলানো ২৮ বছরের যুবতী মেয়েটির মনে খুশির উচ্ছাস বয়ে যাচ্ছে। তাকে খুব তাড়াতাড়ি বাড়িতে পৌঁছাতে হবে।সেখানে তার মা অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে আছেন। একা পথে কোথা থেকে দৌড়ে এসে একটা বাদামি কুকুর এসে জুটলো, মিনু ভাবল ভালই হলো, অন্তত একজন সঙ্গী পাওয়া গেলো, এখনো অনেকটা পথ তাকে যেতে হবে। কুকুরটি তার পা ঘেঁষেই হাটছে।মিনুর মনে হলো মানুষ সঙ্গীর চাইতে কুকুর সঙ্গী নিরাপদ,কারণ কুকুর কখনও বিশ্বাস ঘাতকতা করেনা, বেঈমানী করেনা, অপকার করেনা বরং আশ্রয়দাতার জন্য জীবন দেয়! কিন্তু শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ কেন এমন নিকৃষ্ট হয়! সেটাই সে বুঝতে পারেনা! সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে তারা মেঠো পথে এগোতে থাকে। পাখিরাও যেন মিনুর সাথে সাথে ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে, অনেক গুলো বক, শালিক,ঘুঘু দল বেঁধে উড়ে যাচ্ছে। আকাশে পাখির দল, আর মাটির পথে একটি মেয়ে এবং একটি কুকুর; এ যেন এক অপার্থিব দৃশ্যের মত লাগছে।
মিনু যখন বাড়িতে পৌঁছালো তখন গোধূলি পেরিয়ে অন্ধকার হলো বলে। কুকুরটাও মিনুর সাথে সাথে ওর বাড়িতেই গিয়ে উঠল। ঘরের বাইরে থেকে মা বলে ডাক মিনুর মা আনন্দে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। অনেকদিন পর মেয়েটা বাড়িতে এলো, মায়ের চোখে মুখে খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। অনেক কষ্ট করে মেয়েটাকে বড় করেছেন তিনি।নানা রকম পিঠা পায়েসের গন্ধে বাড়িটা ম ম করছে। মিনু তার মায়ের তৃতীয় সন্তান। ওর বড় আরো দুটি বোন আছে।কয়েক বছর আগেও মিনুর মায়ের এই স্বচ্ছলতা ছিল না।নিজের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমে তিনি মেয়েদের স্বাবলম্বী করে তুলেছেন। বড় মেয়ে নিশি নিজে কাপড়ের ব্যবসা করে, মেঝো মেয়ে ঐশী প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক আর ছোট মেয়ে মিনু আজ বিসিএস ক্যাডার হয়ে ফিরল। সে এখন পুলিশের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
মিনু হাত মুখ ধোয়ে এলো। মিনুর দু’বোন, মা সবাই একসাথে খেতে বসলেন। তারা ভরা রাতের মধুময় ঝলকানী যেনো তাদের মনের ভিতর উল্লাসিত করছে। সবাই আছে নেই শুধু বাবা! অবশ্য বাবা নিয়ে মিনুর তেমন মাথা ব্যাথা নেই। নিশি তার বাবাকে শৈশবে দেখেছিল, হালকা মনেও পড়ে। কিন্তু সে স্মৃতি ঘৃণার অতলে হারিয়ে গেছে। মায়ের হাতের ভর্তা আর ডাল দিয়ে অনেকদিন পর তৃপ্তি করে খেল মিনু। মিনু যখন খাচ্ছিলো তখন ওর মা মাজেদা বিবির যেন বহুদিনের জমে থাকা হৃদয়ের তৃষ্ণা প্লাবিত হয়েছিল। এই মেয়েটির জন্মস্মৃতি তাবে বার বার অতীতে নিয়ে যাচ্ছিলো। আনন্দে বার বার আঁচলের আড়ালে চোখ মুচছিলেন তিনি।
(২)
খাবার পরে মিনু ঘুমাতে গেলো কিন্তু কেন যেন ঘুম তার ধারে কাছেও আসল না। মিনু বেড়ার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। উঠোনে রাখা খড়ের উপর কুকুরটা দিব্যি আরাম করছে। ঝিঁঝিঁ পোকাদের গান যেন থামতেই চাইচে না। হঠাৎ মিনুর খেয়াল হলো – সে তার মায়ের কাছে গেলো।
মিনু- মা ঘুমাও নি এখনো?
মা- না রে কাঁথাটা কিছু বাকি আছে যে।
মিনু- তোমাকে না বলেছি এ বয়সে আর কাঁথায় হাত দিবে না, তোমার না চোখে সমস্যা?
মা- (হা হা) পাগলী মেয়ে বলে কি? কাজ না করলে সময় কাটবে কি করে?
মিনু- রাত অনেক হয়েছে, ঘুমিয়ে পড়ো।
মা- ছাড় তো যাচ্ছি।পাগলী মেয়ে অামার।
মিনু মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে গেলো সেই ছোট্টবেলার মত। এ যে কত আরামের,কতো শান্তির ঘুম একমাত্র মিনুই বলতে পারে। পৃথিবীর কোন কিছুর সাথে এ ঘুমের তুলনা হয় না। পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে অবশেষে কাকডাকা ভোরে জেগে উঠল মিনু। জেগেই কানে গেলো মায়ের মধুর সুর। তিনি ফজরের নামাজ সেরে তিলাওয়াতে মগ্ন। চুপচাপ সে বিছানায় পড়ে রইল। অনেক ক্ষণ পর সে হাত মুখ ধোয়ার জন্য পুকুর ঘাটের দিকে গেলো। চারদিকে দিনের অলো ফুটছে, কচি পাতারা জেগেছে, পাখিরা মধুর আহ্বানে উন্মলিত করছে চারদিক। পুকুরের টলমল জলে হাতমৃখ ধোয়ে এসে দেখল মা পিঠে বানিয়েছেন। মায়ের হাতের পিঠে- এর থেকে অমৃত কি আর কিছু হয় না কি!
সকালের খাবার দাবাড় শেষ করে মিনু মাকে বলল –
মা আজকেই চলে যেতে হবে অামাকে।
মা- আজই যাবি?
মিনু- হ্যা মা।ট্রেনিংয়ের চিঠি এসে গেছে।আর দেরি করা যাবে না।
মিনুর মায়ের মুখটা কালো হয়ে এলো। তবুওতো মেয়েকে বিদায় দিতে হবে এত্ত বড় চাকরিটা পেয়েছে সে! দু’চোখ বেয়ে জলধারা নেমে এলো। মিনু জানে এ জলের ধারা কি বলতে চাইছে। শত ব্যাথার অন্তরালেও একে লুকানো যায় না।
মিনু তার মায়ের কাঁধে মাথা রেখে বলল –
আমি জানি মা কেন তোমার চোখে জল, তৃতীয় কন্যা হিসাবে জন্ম নেয়ার অপরাধে এই কন্যাটির জন্মদাতা কন্যাকে ত্যাজ্য করেছিল, স্ত্রীকে হাসপাতালের বারান্দায় সেই যে রেখে গিয়েছিল আর ফিরেনি। সেই কন্যাটিই এই মিনু – বাঁকা হাসির রেখা দেখা গেলো।
নিশ্চুপ মাজেদা বিবি। তিনি জানেন মিনুর এই কথা গুলোর মধ্যে কতটা যন্ত্রণা, কতটা অভিমান জড়ানো। তবু দু’চোখ স্বপ্নে বিভোর। নবজীবনের আহ্বানে নতুনের স্বপ্ন।যে স্বপ্নে কখনো মিনুরা হার মানে না। নবতর গতিতে তারা এগিয়ে চলে অশ্রুকে আশীর্বাদে পরিণত করে। জীবন তো এমনি!আমাদের এভাবেই গড়ে নিতে হয় সব তোয়াক্কা কে পিছনে ফেলে, আমাদের কেউ গড়ে দেয়না মা! চলি।
হনহনিয়ে হেঁটে যায় মিনু, প্রতিটি পদে পদে বুনে যায় জীবনের স্বপ্ন, যে স্বপ্ন মাথা তুলে দাঁড় করাতে শিখায়,শিখায় নিজের পরিচয়ে নিজেকে চেনাতে!





