মায়া শাহ ; অন্তরালের এক মরমী প্রদীপ – শামীমা রিতু।
“বাবা শাহ জালালের মাটি সর্ব গুণে খাঁটি
এই মাটিতেই জন্ম মোদের পরিচয় সিলেটী”
মাহতাব ফকিরের এই গানের মতই সিলেটের মাটি সর্বগুণে খাঁটি। কিংবা “শাহজালালের সন্তান সবাই হিন্দু মুসলমান”-কাকন ফকিরের এই কলিতেই বাঁধা সকলে। যেখানে সবাই এক বাক্যে অন্তরে লালন করেন “আমরা হক্কল সিলটি”। একে আনাম সুরমা নদীর জল চোখে মেখে তিনি সুরমা লাগিয়েছেন- যার এক কিনারে শাহজালাল আরেক কিনারে নিমাইচাঁদ। চারদিক পাহাড় একদিকে সায়র সম হাওর!কী মনোরম প্রকৃতির শোভা!যেখানে প্রকৃতিই বাউল হয়ে আছে ; সেখানে ই তো জন্ম নিবেন সাধক বাউল মরমী কবিরা।
বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী এই পবিত্র ভূমি সিলেট।কত আউল বাউল সুফি সাধকরা তাদের কর্ম আর সাধনায় ধন্য করেছেন আমাদেরকে।আরকুম শাহ, দুর্বিন শাহ,হাসন রাজা,মাওলানা ইয়ামিন শাহ,ফকীর শীতালং শাহ, রাধারমন দত্ত, দ্বীন ভবানন্দ,শাহ আব্দুল করিম সহ অনেকের পদচারনায় ধন্য সিলেটের গৌরবময় সাহিত্য সংস্কৃতি।এর মধ্যে কত জনকে জানি আমরা?আলোচনায় কেউ কেউ আসলেও অনেকেই রয়ে গেছেন অন্তরালে।আড়ালেই করে গেছেন রূপসাধনা।এমনি একজন অন্তরালের সাধক হলেন শামসুল হুদা চৌধুরী (মায়া শাহ)।
পরিচয় :
গোলাপগঞ্জের যত গোলাপের সুভাস ধরণী আলোকিত করেছে,মানুষের মাঝে প্রদীপের মত উজ্জ্বল করেছে জ্ঞান কে তাদের মধ্যে একজন হলের মায়া শাহ।
মায়াশাহের পিতৃপ্রদত্ত নাম শামসুল হুদা চৌধুরী। তিনি মায়া শাহ নামেই পরিচিত ছিলেন।১৯৪৪ সালের ০৭ই মার্চ বৃহত্তর সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার রাণাপিং পরগণার ফাজিল পুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা মো.মদরিছ আলী ও মাতা শামসুন নাহার চৌধুরী। ছোটবেলা থেকেই আধ্যাত্মিকতার প্রতি আগ্রহ ছিল অধিক। পাড়াগায়ে হলেও এই পরিবারে শিক্ষার ঝোঁক ছিল বলেই ১৯৬৬ সালে ভাদেশ্বরের বিখ্যাত নাছির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন (বর্তমান এসএসসি) পাশ করে বাংলাদেশ ডাক বিভাগে “পোস্ট মাস্টার” পদে চাকুরি জীবন শুরু করেস। তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন সিলেটের টিলাগড় নিবাসী পীর সৈয়দ সিরাজ উদ্দিন।পারিবারিক জীবনে তাঁর সহধর্মিনী ছিলেন মহীয়সী রমণী রাবেয়া হুদা চৌধুরী।তিনি দুই পুত্র এবং এক কন্যা সন্তানের জনক এবং তারা স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।
কর্মজীবন ও আধ্যাত্মিকতা:
মায়াশাহের কর্মজীবনে সেই সময়ের ডাক বিভাগের বিপুল ব্যস্ততার মাঝেও নিজের মনে লালন করেছেন পরমাত্মার রূপ দেখার বাসনা তাই তো তিনি লিখেছেন-
“দেখবো বলে রূপ মাধুরী
ফকীর মায়া শাহরই আহাজারি গো…”।
সেই সময়ে একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি নিজেকে “ফকীর” মনে করতেন। চলাফেরা ছিল অতি সাধারণ। সদাহাস্য মানুষটির কাছ থেকে কেউ কখনো কালো মুখের ব্যবহার পাননি।দেখতে ফর্সা, দীর্ঘদেহী চাঁদপানা মুখের দিকে তাকালে সকলেই শ্রদ্ধায় অবণত হতেন।সিলেটে ইসলাম ধর্মের প্রচারক হযরত শাহজালাল (রহ) এর একনিষ্ট ভক্ত ছিলেন।প্রতি বৃহস্পতিবার সারারাত দরগাহে জিকিরে মশগুল থাকতেন তিনি।তাঁর কর্মস্থল ছিল শাহজালাল (রহ) দরগাহ পোস্ট অফিস। সরকারি নিয়মানুসারে প্রমোশন হলে এই কর্মস্থান পরিবর্তন করতে হবে -।একমাত্র এই কারনেই তিনি কর্মজীবনে প্রমোশন তথা উচ্চপদের সরকারি কর্মাদেশও প্রত্যাহার করেন!যা অতি বিরল। এ থেকেই বোঝা যায় কতটা নির্লোভ, সরল এবং সাধক স্বভাব ছিলেন।এরপরও তিনি ১৯৮৭ সালে লিখেছেন-
“কর্মদোষে দন্ডধারীরে মায়া
কর্মদোষ তোর গেল না রে
সাধন ভজন তোর হইল না রে..”।
দেহপ্রাণে তিনি সবসময় লালন করতেন নিজের সাধনাকে। ইহজগতের বাইরে তিনি জ্ঞানজগতে বিরাজ করতেন। নিজের মনে নিজের কাজেই ব্যস্ত থাকতেন সবসময়।প্রাণসখির সেবায় নিজেকে প্রস্তুত করে তিনি বলেছেন-
“সখিরে- আসতো যদি প্রাণের বন্ধু
দেখতাম নয়ন ভরিয়া
মায়ার জীবন ধন্যহইত রে সখি
তাহান চরণ সেবিয়া রে..”।
তিনি ইহজগতের প্রতি লালায়িত ছিলেন না বলেই এমন সব কথা তিনি যেমন লিখতে পেরেছিলেন তেমনি বাস্তবিক জীবনেও পরিচালিত করতে পেরেছিলেন।তাঁর কাছে জীবন ছিল ক্ষণিকের।তাই বলেছেন-
“কত খাঁচা আছে পড়ি
সবার পাখি গেছে উড়ি রে
দেখলনা কেউ তাহার ছবি
পড়িয়া রিপুর ধাঁধায়..!
কতো মধুর সে কথা,কতো জ্ঞানের সে বাণী,অথচ কতইনা আড়ালে ছিলেন তিনি,এখনো রয়ে গেছেন।লোকসমাজের অন্তরালে এই মহান ব্যক্তি নিজেকে নিজে চেনার চেষ্টা করেছিলেন।সে চেষ্টাতেই পূর্ণ হয়েছে বৃহত্তর সিলেটের সুফি ভূবন। উনার গানের কথাতেই বুঝা যায় কতটা জ্ঞান গভীরতা ছিল –
“সখি গো –
তোরা সবাই আমার হইয়া
প্রাননাথরে কও বুঝাইয়া
তার বিরহে মায়ার প্রাণ
উঠে জ্বলিয়া জ্বলিয়া গো ..”।
জাগতিক সবকিছু থাকার পরও তিনি বলেছেন-
“আমি কই আইলাম রে আল্লাহ
আমি কি হইত উপায় “।
তৎকালীন সিলেট অঞ্চলের মরমী সাধক ,বাউল আর মরমী শিল্পীদের সাথে মায়া শাহের ছিলো আত্মার সম্পর্ক।শাহ আব্দুল করিম,বাউল আলী হোসেন সরকার,অন্নদা বাবু, ছাতকের সাবুল মিয়া, মখলিছুর রহমান উদাসী, হরেন্দ্র বাবু, সুনামগঞ্জের গীতিকবি সামসুল মিয়া,গোলাপগঞ্জের আলী মিয়া সহ সিলেট ও সিলেটের বাইরের অনেক মরমী শিল্পীদের নিয়মিত আসা যাওয়া ছিলো মায়াশাহের বাড়ীতে।
তাঁরা সকলেই অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন এই আত্মভোলা মানুষটাকে।নিয়মিত সুফী গানের আসর বসত মায়া শাহের বাড়ীতে। তিনি নিজ হাতে খিঁচুড়ি রান্না করে গ্রামের বাচ্চাদের খাওয়াতেন। সেদিনের সেই বাচ্চারা এখন অনেকেই মধ্যবয়সী কিন্তু মায়া শাহের নিজ হাতে তৈরী খিঁচুড়ির কথা এখনও তাদের কাছে মধুর স্মৃতি। সিলেটের বিখ্যাত লোক গবেষক কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব সৈয়দ মোস্তফা কামাল মরমী সাধক দ্বীন ভবানন্দ, হাসন রাজা, রাধারমন, আরকুম শাহ, শীতালং শাহ দেরই অনুসারী মনে করতেন। তাইতো মাহতাব শাহ ফকীর সংকলিত মায়া শাহের গানের বই “মনঃপীড়া”র ভূমিকা লিখেছিলেন সিলেটের অমূল্য রত্ন সৈয়দ মোস্তফা কামাল ।
মায়া শাহের নামের সাথে যে নামটি অবিচ্ছেদ্য ভাবে উঠে আসে, সেটি হলো মাহতাব শাহ ফকীর। মায়া শাহের গানে মোহিত হয়েই সেই সময়ের কিশোর মাহতাব উদ্দিন “মাহতাব শাহ ফকীরে” পরিণত হয়েছেন- যার পেছনে প্রধান ভূমিকা রয়েছে মায়াশাহের। মায়া শাহ ছিলেন মাহতাব ফকিরের দাদা।মায়া শাহের মায়ার সুর প্রাণে বাজিয়ে তিনি লালন করে যান তাঁর গীত,কথা ও সুর। মাহতাব শাহ ফকীরের গানের প্রথম হাতেখড়ি হয় মায়া শাহের কাছেই,পরবর্তীতে তিনি বিখ্যাত গণসঙ্গীত শিল্পী শ্রী ভবতোষ চৌধুরীর কাছে গান শিখেন ।
এই মহান মরমী সাধক মায়া শাহ ১৯৯৪ সালের ০২ সেপ্টেম্বর ইন্তিকাল করেন।কিন্তু কীর্তিমানের কখনো মৃত্যু হয় না।তাঁর গানে তিনি অমর হয়ে থাকবেন সিলেটের মরমী ভূবনে।সিলেটের মরমী সঙ্গীতে মায়া শাহের অবদান অনস্বীকার্য।আমাদের উচিত তাদের সে অবদান কে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া।
২০০৩ সালের মার্চ মাসে মায়া শাহেন সহধর্মিণী রাবেয়া হুদা চৌধুরীর সর্বস্বত্ত্বে মাহতাব শাহ ফকির মায়া শাহের গানগুলোকে এক মলাটে আবদ্ধ করেন “মনঃপীড়া” নামে। বইটির প্রচ্ছদ করেছিলেন মুহিত চৌধুরী। আমাদের উচিত এইসব সাধকদের বানীকে প্রচার করা, চর্চা করা,নবীনদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া।অন্তরালে নয় মায়া শাহরা সকলের সামনে নবীন প্রজন্মের মাঝে মরমী মায়া দ্বারা আবদ্ধ করুন প্রতিটি মানুষ কে। মরমী সাধক মায়া শাহের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

তথ্যসূত্র: শাহান চৌধুরী





