বৃদ্ধাশ্রমে ঈদ – খাইরুন নাহার চৌধুরী
আজ কোরবানির ঈদ! সোবহান সাহেব সহ যারা এই বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রিত আছেন,সবাই ভোরে উঠে গোসল সেরে আশ্রমের মাঠেই ঈদের জামাত আদায় করলেন। করোনার কারনে এবার মসজিদে যেতে পারছেন না বলে, এই বিকল্প ব্যবস্থা । ইমামতি করলেন মওলানা রুহুল আমিন সাহেব । যিনি সারাজীবন ছেলে মেয়েদের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি দীন শিক্ষা দিয়েছিলেন। নিজের পিতা মাতার যত্নের ত্রুটি করেন নাই । পাঁচ সন্তানকেও সেভাবে মানুষ করতে পেরেছেন বলে তাঁর বিশ্বাস ছিল। ৭৬ বছর বয়সে এসে মাওলানা সাহেব টের পেলেন, তাঁর দেয়া শিক্ষা আসলে কোনো কাজেই লাগেনি । স্ত্রী বিয়োগের পর স্বেচ্ছায় বৃদ্ধাশ্রমে চলে এসেছেন । উনার আসবার দিন তিনি আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করলেন ,ছেলে মেয়েরা এক বারের জন্যও বাঁধা দিলো না! সবাই বললো, “বাবা, দোয়া করো আমাদের জন্য , মা বাবার দোয়া আল্লাহ্ ফেলতে পারেন না ।” রুহুল আমিন সাহেব সব সময় তাঁর সন্তানদের কল্যাণে আল্লাহর দরবারে হাত উঠান আর কান্নায় ভেঙে পড়েন । আজকের ঈদের নামাজ শেষে তিনি হাউমাউ করে কাদছিলেন । বৃদ্ধাশ্রমের কেউ টু শব্দটিও করলেন না, তখন সবার চোখেই পানি । নামাজ শেষে ঈদের বিশেষ খাবার যখন সবাই খেতে বসেছেন, ঠিক তখন ,সেখানকার এক পরিচালক লক্ষ্য করলেন সোবহান সাহেব নিরবে চোখের পানি ফেলছেন। সোবহান সাহেবের তিনটি সন্তান । খুব কম বয়সে স্ত্রী হারিয়েছেন। পিঠাপিঠি তিনটা বাচ্চা বলতে গেলে একা এক হাতে মানুষ করেছেন । বাচ্চাদের অযত্ন হবে ভেবে, দ্বিতীয় বিয়ের কথা চিন্তাও করেন নাই । এখন তাঁর তিন সন্তান সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত । সোবহান সাহেবের বয়স হয়েছে, নানান অসুখ বিসুখ লেগেই থাকে । ছেলে মেয়েদের বিয়ে হলো,নাতি নাতনিরাও বড় হচ্ছে । ততদিনে সংসারে উনার মূল্য ক্রমশ কমতে কমতে তলানিতে এসে ঠেকেছে । নিজেকে বড় বেশী অসহায় লাগে, অপদার্থ মনে হয় । নিজের এতো অপমান আজকাল আর সহ্য করতে পারেন না, তাই নিজেই খোঁজ খবর নিয়ে এখানে উঠে এসেছেন। কিছু জমানো টাকা আছে, সেখান থেকেই খরচ চালান। আজ সেখানকার পরিচালক সোবহান সাহেবের কাঁদে স্বস্নেহে হাত রাখতেই চোখের পানিতে যেনো জোয়ার নেমে এলো । তিনি বার বার পাঞ্জাবির কুনা টেনে চোখ মোছার ব্যর্থ চেষ্টা কতরে লাগলেন। কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলেন না, কথা আটকে গেলো।
বৃদ্ধাশ্রমের বাবাদের সব কথা বুকেই আটকে থাকে। কিছু কথা হয়তো চোখের জল হয়ে ঝরে।





