#সাহিত্য ও সংস্কৃতি

“চুড়ালিয়া” — শিমুল সৈয়দ।

চুড়ালিয়া !

ওগো শুনছো ! স্ত্রীর এই গদগদ ডাকের মহিমা বশির সাহেব খুব ভালো করেই জানেন। টাকা খসানোর পায়তারা চলছে। তিনি ঘুমের ভান করে পাশ ফিরে শুয়ে আছেন। স্ত্রী আবারো ডাকলেন, তবে এবার মুখের সাথে হাত দিয়েও ঠেলা দিলেন।
কি শুনছো ? শুয়ে পড়লে নাকি ? এই ….
বশির সাহেব দাঁতে দাঁত চেপে পড়ে রইলেন। মনে মনে বললেন, আজকে যতই ঠেলা ঠেলি করো কোন লাভ হবে না।
স্ত্রীও মনে মনে বললেন, ঘুমের ভান করে পড়ে আছো, দাড়াও দেখাচ্ছি মজা। এই বলে উনি সুড়সুড়ি দেওয়া শুরু করলেন। বশির সাহেব প্রাণ পনে চেষ্ঠা করে যাচ্ছেন যাতে কোন মতেই জেগে উঠতে না হয়। মিনিট দুইয়েক সহ্য করে নিয়ে আর না পেরে লাফিয়ে উঠে বললেন – ধুর ছাতা ! এই রাত দুপুরে খুচাখুচি করছো কেনো ? স্ত্রী এবার মুচকি হেসে বললেন –
স্ত্রী : রাত ছাড়া তোমাকে পাবো কোথায় ?
বশির : কেন ? খাওয়ার টেবিলেও তো বলতে পারতে ?
স্ত্রী : আরে ধুর ! ছেলে মেয়ের সামনে কি সব কিছু বলা যায় ?
বশির সাহেব সন্দিগ্ন দৃষ্টি মেলে বললেন –
বশির : ব্যাপারটা কি – বলতো ?
স্ত্রী : (একটু হেসে নিয়ে ) না মানে অনেক দিন তোমার জন্য পায়েস রান্না করিনি, কাল করবো ?
বশির : (একটু বিরক্ত হয়ে ) এই কথা বলার জন্য তুমি আমায় রাত দুপুরে জাগিয়ে তুললে ?
স্ত্রী : এমন করো কেন ? তোমার সাথে ভালো করে দুইটা কথাও বলা যায় না !
বশির : (অবাক হয়ে ) কথা বলা যায় না ? সারা দিন যে মুখ দিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চলছে – সেটা কি তবে ?
স্ত্রী : ধুর ! ওসব তো সাংসারিক আলাপ।
বশির : আর এখনকার টা ?
স্ত্রী : (আল্হাদ করে ) পার্সোনাল মানে ব্যক্তিগত মানে প্রাইভেট।
বশির : দেখ ! এসব ধানাই পানাই ছেড়ে আসল কথায় আসো।
স্ত্রী : না … মানে একটা নতুন শাড়ি এসেছে ‘চুড়ালিয়া‘ খুব সুন্দর। জানো ৩ নম্বর ব্লকের রুমানা ভাবি পড়ে এসেছিলেন, যা মানিয়েছে না !
বশির : যা সন্দেহ করেছিলাম তাই ! এইতো কদিন আগে একটা কিনলে কমলিকা না পাহাড়িকা কি যেন নাম ? এখন আবার ?
স্ত্রী : ধুর ! সেটাতো ৬ মাস আগে। শুননা, অর্কিড প্লাজায় ২০ % ছাড় দিচ্ছে।
বশির : কতো দাম ?
স্ত্রী : বেশি না, মাত্র ১২ হাজার।
বশির : (চোখ কপালে তুলে ) কি ? ১২ হাজার ! তোমার মাথা খারাপ হয়েছে ? মাসের মাঝখানে এসে ১২ হাজার টাকার শাড়ি ? অসম্ভব !
স্ত্রী : হ্যা তাতো বলবেই ! আমি কিছু চাইলেই তোমার ধানাইপানাই শুরু হয় !
বশির : একজন মেয়ে মানুষের কতগুলি শাড়ি লাগে ? আলমারী ভর্তি তোমার শাড়িতে, তারপরও কদিন পরপর নতুন একটা লাগে ! আমাকে দেখ, সেই দুই বছর আগে দুটো শার্ট আর দুটো প্যান্ট বানিয়েছিলেন। দিব্যি কেমন চালিয়ে নিচ্ছি। অফিস, বিয়ে, জন্মদিন, শোক সভা সব কেমন কভার করে নিচ্ছি।
স্ত্রী : হ্যা – কভার করে নিচ্ছ ! লোকে যে তোমার পিছনে হাসাহাসি করে সেটা কি জানো ?
বশির : করুক হাসাহাসি ! তাতে আমার কি ?
স্ত্রী : তোমার তো কিছু নয়, আমাদেরকে কথা শুনতে হয়।
বশির : যারা এসব বলে তাদের থেকে দূরে থাকলেই তো হয় ?
স্ত্রী : কয়জনের কাছ থেকে দূরে থাকবো ?
বশির : তা অবশ্য ঠিক। পরনিন্দা করেনা এমন মেয়ে মানুষ এই পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া মুশকিল !
স্ত্রী : কি আমরা পরনিন্দা করি ?
বশির : করোনা ?
স্ত্রী : নাহ ! আমরা শুধু একটুখানি গসিপ করি।
বশির : সেটা কি জিনিস ?
স্ত্রী : একটু আধটু খবরা খবর নেওয়া।
বশির : তা ঠিক। তোমরা পরনিন্দা করোনা, শুধু একটুখানি খবর নেও- কার মেয়ে লো কাট জিন্স পড়ে কোন ছেলের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কার ছেলেকে কোন মার্কেটে কোন মেয়ের সাথে দেখা গেছে, কার স্বামী রাত
করে বাড়ি ফিরে, কোন মহিলার শাড়ির ফাঁকে পেট ও নিতম্ব দেখা যায় ! বাই দা ওয়ে – তামান্না ভাবীর ফিগারটা কিন্তু দারুন ! ( কথাটা বলেই বশির সাহেব বুঝলেন ঝুঁকের মাথায় অনেক বড় ভুল করে ফেলেছেন )
স্ত্রী : (রেগে গিয়ে ) কি ? কি বললে ? তামান্না ভাবীর ফিগার কি ?
বশির : না, মানে বলছিলাম, ভদ্রমহিলা নিজেকে খুব মেইনটেইন করেন আরকি ?
স্ত্রী : তা এই মেইনটেইনের সাক্ষাৎ কোথায় পেলে ?
বশির : না, সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে রাস্তায় দেখা হলো – তাই।
স্ত্রী : আর ঐ এক দেখাতেই ফিগারের হিসাব নেয়া হয়ে গেলো ?
বশির : না না – কিযে বলো ?
স্ত্রী : এই জন্যেই তো বলি – অফিস থেকে আসতে এতো দেরি হয় কেন ? পথে পথে মেয়ে মানুষের ফিগার দেখা হয় ?
বশির : ছি ছি ! কি বলছো এসব ? পথে পরিচিত কারো সাথে দেখা হলে কি মুখ ফিরিয়ে রাখা যায় ?
স্ত্রী : তা যাবে কেনো ? কচি মেয়েদের দেখলে কি আর চোখ জায়গায় থাকে ?
(ঠিক এই সময় ওদের দরজায় মৃদু টোকা শুনা গেলো। ওদের কলেজ পড়ুয়া ছেলে নিচু গলায় বললো )
ছেলে : মা ! মা !
স্ত্রী : কি হয়েছে ?
ছেলে : তুমি মূল বিষয় থেকে সড়ে এসেছো। তোমার শাড়ির মূল্যরাশ কিন্তু বেশিদিন থাকবে না ?
স্ত্রী : দেখছিস ! ভুলেই গিয়েছিলাম। হে ! বলো কবে কিনে দিবে চুড়ালিয়া?
বশির : ( ছেলের প্রতি হুঙ্কার দিয়ে ) এই হারামজাদা ! দরজার ওপাশে বসে আমাদের কথা শুনছিস কেনো ?
এতো কষ্ট করে তর মাকে অন্যদিকে ভুলিয়ে রেখেছিলাম, দিলো সব পন্ডু করে !
(স্ত্রী দিকে তাকিয়ে বললেন ) না না, ওসব আশুলিয়া পুরুলিয়া এখন হবে না। ( বলেই তিনি পাশ ফিরে শুয়ে পড়লেন ) ।
বশির সাহেবের স্ত্রী একবার দরজার দিকে তাকাচ্ছেন আরেকবার স্বামীর দিকে, কিংকর্তব্যবিমূর হয়ে বললেন ‘এটা কি হলো ’ !!
বশির সাহেব শুধু একটু মুচকি হাসলেন ….!

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *