#পাঠক সমাচার

নারী ও মাতৃত্ব — রিফাত মুনির ইতি

জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ বলেছিলেন, “পৃথিবীতে নারী ও শিশু এই দুই শ্রেনী নিজের স্বার্থ সম্পর্কে খুব সচেতন” হুমায়ুনের জনপ্রিয়তা কে যারা লঘু ভাবেন, তাদের প্রতি বিদ্বেষ না রেখেই বলছি,কথাটা কিন্তু গভীর অর্থবহ। শিশুদের কথা বাদ দেই, স্বার্থপরতায় মেয়েদের অবস্হান সর্বোচ্চে।

আর এই স্বার্থ পরায়নতা এমনকি মাতৃত্বের বেলাতেও প্রকট। নিজের সন্তানের মূল্য যে কোন মায়ের কাছে সবচেয়ে বেশী হবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু , অন্য কারো সন্তান, এমনকি একাম্ত প্রিয়জনের অনাথ শিশুর ক্ষেত্রে ও মা তার নিজের সন্তানকে বাঁচানোর জন্য সেই শিশু কে বিপদে ফেলতেও দ্বিধা করবেন না। অথচ, মাতৃত্ব একটা বোধের নাম, এবং এটি সার্বজনীন হওয়া বাঞ্ছনীয়।

এবার দেখি মাতৃত্বের এই বিষয়টা আদৌ মেয়েদের কাছে কেমন। যেহেতু, বলা হচ্ছে, নারীর পূর্ণতা মাতৃত্বে ( মূলত, পুরুষ তান্ত্রিক চাপিয়ে দেয়া মতবাদ) সেহেতু প্রতিটি মেয়ের মাতৃত্বের আকাঙ্খা নাকি সর্বোচ্চ! আসলে, সত্যি টা হচ্ছে এটার মাত্রা শতকরা বিশ ভাগ। আচ্ছা,আপনারা রাগ করতে পারেন। আরো পাঁচভাগ বাড়াচ্ছি। পঁচিশ। বাকিটা পরিবার, সমাজ, রাস্ট্রের চাহিদা।

এখন কেন বললাম পঁচিশ ভাগ। কারন, মাতৃত্ব সোজা জিনিস না। যে অবর্ননীয় শারিরীক ও মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে একজন মাকে যেতে হয়, সেই কষ্ট অন্য কাউকে ভোগ করতে হয়না, তা আর অন্য কেউ বোঝেওনা। গর্ভধারণকালীন সময়ে, দৃশ্যত কোন শারীরিক সমস্যা ছাড়াও একজন মা জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে অবস্হান করেন।
স্বাভাবিক ভাবেই মায়েরা সাধ করে এই জুয়াটা খেলেননা। এর পেছনে অন্য অনেক কারন থাকে। সবচেয়ে বড় যেটি সেটা পরিবার টিকিয়ে রাখার প্রবনতা। কারন সন্তানহীন পরিবার এখনো টিকে আছে এটা এখনো, এ সমাজে, অনেক উচ্চ শিক্ষিত মেয়েদের কাছেও বিস্ময়ের! যেন পরিবার ভেঙে যাওয়াটা একরকম “ফরজে আইন”!

আপনি যদি সন্তানহীন হন, তবে অবধারিত ভাবে মেয়েদের কাছে যে কথাটা শুনতে হবে, তা হলো, আপনার যে বাচ্চা নেই, আপনার হাজবেন্ড কিছু বলেনা? আর তারপর, কিছুটা ঈর্ষান্বিত আক্ষেপের সুরে, “বাব্বাহ্! আসলে আপনি খুব লাকি!’ ব্যাপারটা এমন, যেন আপনার কিল চড়, লাথি, ঘুষি প্রাপ্য, ঘর থেকে বের করে দেয়াটা উচিত, এবং স্বাভাবিক ঘটনা, কেন দিচ্ছেন না?!!!!

পাঠক, জানি অনেকে পঁচিশ ভাগ বলায় রাগ করেছেন, কিন্তু এটাই অপ্রিয় সত্যি। যদি তা না হতো তাহলে, পৃথিবীতে অনাহুত গর্ভধারন কথাটা থাকতো না, একজন মা, তার সন্তানকে গর্ভপাতের মাধ্যমে মেরে ফেলতে চাইতেন না। আসলে বাস্তবে ঘটে তেমনই।

আরেকটা কথা, আঁটুনি বজ্র হলে গোড়া ফস্কাবেই। ঠিক তেমন অকাল গর্ভপাতের ঘটনা বাংলাদেশের সেই সব অঞ্চলে প্রকট, যেখানে ধর্মীয় বিধি নিষেধের নামে মেয়েদের আটকে রাখার প্রবনতা বেশি। যার একটি চট্টগ্রাম। বারো আউলিয়া ‘র দেশ বলে খ্যাত চট্টগ্রামে গর্ভপাতের হার শতকরা পঞ্চাশ ভাগ! ভাবুন একবার, বাকি অর্ধেক, অন্য তেষট্টি জেলায়!

ও হ্যা, মেয়েদের নামে যে চিরায়ত অপবাদ, যে এরা বিয়ের আগে বাবা, পরে স্বামী, এবং শেষ বয়সে ছেলে সন্তানের ওপর ভর দিয়ে চলে, এজন্য ও কিন্তু শুধু পুরুষ তান্ত্রিকদের দোষ দিলে হবে না। আসলেই তাই। মেয়েরা প্রথমে সন্তান চায়, তারপর ছেলে চায়, কারন তার ওপর ভর দেয়া যাবে। তারা ধরেই নেয়, একসময় তারা শক্তিহীন হয়ে পড়বে। ছেলে থাকলে তার ভরন পোষনের দায়িত্ব নেবে! বিস্মিত হবার মত বিষয় হচ্ছে, মেয়েদের নিজেদের শারিরীক সুস্হতার প্রার্থনাও অতটা জোরালো না, যতটা পুত্র সন্তান কামনার প্রার্থনা । অর্থাৎ, তারা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সু্স্হ, স্বাভাবিক কর্মক্ষম থাকার প্রার্থনা করেনা, যতটা করে পুত্র সন্তান পাওয়ার জন্য দোয়া।
শুধু মাত্র পুত্র সন্তানের আশায়, জনসংখ্যা বিস্ফোরনের এই দেশে, একাধিক সন্তান গ্রহনের প্রবনতা এমনকি তথাকথিত ‘নারীবাদী’দের মধ্যেও ব্যাপক। কথা ও কাজের মিল, আমাদের কোনকালে ছিলনা, নেই…..

আর, সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে, ছেলেরা কিন্তু দেখেনা। যদি দেখতো, তাহলে ‘বৃদ্ধাশ্রম” কনসেপ্ট টাই আসতো না। আসলে, এই সমাজে, এখন, একজন মাকে সঙ্গী ও পরিজনবিহীন একাকী মরতে হয়….

পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসা…..

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *