এতো বিষম দায় দেখছি !
নজরুল-রবীন্দ্রনাথ যদি আজকে জীবিত থাকতেন তাহলে স্বরবৃত্ত ও বর্ণমাত্রার সংযোজন বৈষম্যের কারণে তাদের রচিত কবিতা সমুহের বেহাল দশার করুণ পরিণতি স্বচক্ষে দেখে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কমপক্ষে “স্বরবৃত্তের সাত কাহন ও বর্ণমাত্রার বিচিত্র বিধি”-এর উপরে না জানি কতবার যে এম.ফিল এবং পি.এইচ.ডি করতেন একমাত্র ড. মোহাম্মদ এনামুল হক,বিশ্বজীবন মজুমদার,ড.হুমায়ুন আজাদ প্রমূখ ভাষা বিজ্ঞানীরা ছাড়া কেউ বলতে পারতেন না। গীতা’র কথা নাইবা আলোচনা করা গেল। কিন্তু এ যুগে যদি মহাকাব্য রামায়ণ রচনা হতো,আমার মনে হয় অনুষ্টুপ ছন্দের মিল-অমিল দেখে শুধু আটে-ছয়ে-চৌদ্দের বাড়তি উপদ্রবের ভিত্তিতে ভাষাতত্ত্ব ও ধ্বনি বিজ্ঞানের মহাবিজ্ঞানীরা আদি কবি বাল্মিকী’র পর্যন্ত প্রমাদ শুধরাতেন। যার জন্যে হয়তো নারদেরও মর্ত্যলোকে চিরতরে আসা হত না।
আর আমাদের জাতীয় সংগীত স্বরবৃত্তের বারোটা বাজিয়ে ছন্দের অন্তমিলের পয়ার ভিত্তিক সুরের পসরা নিয়ে যে সতত দরজায় দন্ডায়মান তা যেন কারো রক্ত চক্ষুকে তোয়াক্কাই করেনা।
এরপরেও ধন্যবাদের যেন শেষ নেই।।আসলে (৮+৬)-এর মাধ্যমে (ভাবের প্রবর্তন+ বর্ণনার সমাস্তি) শুধু মহাকবি মধুসূদনই কোমল পন্থায় সার্থক ভাবে তাঁর “মেঘনাদবধ”-মহাকাব্যে উপস্থাপন করে গেছেন। জীবনানন্দ দাসও তাঁর রোমান্টিকতায় চতুর্দশপদীতেও চর্চার কমতি করেন নি। আবার মনে হয় এই সনেট রচনা করতে গিয়ে আধুনিক বাংলা কবিতার ঐ মহান দুই স্রষ্টাদের স্বরবৃত্ত কিংবা অক্ষরবৃত্তের কাব্যিক ব্যাকরণের কোনো স্থলন ঘটে কি না। এরপরেও দেখা যায় লম্বিক ও অনুভুমিকভাবে ১৪/১৪-এর অক্ষরমাত্রা বজায় রাখার প্রচন্ড ঝোঁক প্রবণতা।
তবে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন সবার তাত্ত্বিক ও তাথ্যিক পরামর্শ উপস্থাপনের জন্যে। কিন্তু একটি কথা কথাচ্ছলে না বললেই না হয়, প্রেম,ভালবাসা যেমন বয়সের মাপকাঠিতে বিচার করা যায়না ঠিক তেমনি মানব মনের মুক্ত ভাবকে মাত্রা, অর্ধমাত্রা, মাত্রাহীন অক্ষরের অক্ষরবৃত্তের বন্দী কারাগারে আবদ্ধ করে রাখা যায়না। সে তো একাদশী,চতুর্দশপদী কিংবা অষ্টাদশপদী’র শৃঙ্খল ভঙ্গ করে,ছন্দের চিরাচরিত ধারা ভেঙ্গে,পদ্যের কঠিন কঠোর নিয়ম উপেক্ষা করে সর্পিল-বিনুনি পথে গদ্যের মহা সাগরে প্রাণ বিসর্জন দিবেই দিবে।
মহাকবি হেমচন্দ্র যেখানে বৃত্রসংহার করেন,মাইকেল সেখানে স্বরবৃত্তের সংযোজন করেন, রবীন্দ্র-নজরুল যেখানে অক্ষরমাত্রার জাল ছিন্ন করেন, জীবনানন্দ-অক্ষয়-বিনয়েরা সেখানে বৃত্তে বসবাস করে রোমান্টিক হয়ে যান। সাহিত্যচর্চার কাব্য-ধারায় আহা কি বৈচিত্র্যময়তা সম্প্রতি আমার একটি সনেট কবিতা লেখার পর থেকে বিভিন্ন দেশের কবি সংঘের কবি,অকবি,মৌলভী সবাই কেন জানি উঠেপড়ে লেগেছেন। এতদিন ময়নাকে বুলি শেখানোর ন্যায় আমাকে সবক দেওয়া হচ্ছিলো যে আমি নাকি ব্যাকরণ বিরুদ্ধ কবিতা লিখে মহাকবিদের বিরুদ্ধাচারণ করে যাচ্ছি।
বর্ণমাত্রা,স্বরমাত্রা,স্বরবৃত্ত,অক্ষরবৃত্ত,পয়ার,অন্তরা,স্তবক,শ্লোক ইত্যাদি থরে বিথরে বিন্যাস না করে শুধু ভাবের পিঠে চড়ে মনের অবাধ্য ঘোড়া দৌড়াতে চলছি। সে সুবাদে কবিকুলের বায়ুমন্ডলীয় কাব্যিক চাপে যখন কবিতার পারদ আটে-ছয়ে চৌদ্দের স্থিতিশীল মাত্রায় অসহায়,নির্বাক অবস্থায় আসন গেড়ে বসল, ঠিক তখনই চারদিকে হৈচৈ শুরু হয়ে গেল যে ইহা সনেট নয় বরং চতুর্দশপদী কবিতা। এ যেন মহাখালি ফ্লাইওভার আর খিলগাঁও ফ্লাইওভার। যদিও একই নির্মাণশৈলীতে নির্মিত তারপরে নাকি একটি ফ্লাইওভার আর অন্যটি ওভারব্রীজ! কি সেকুলাস মন্তব্য। ভিন্ন ভিন্ন ভাব থাকলেও সমসত্ব উপাদানিক গঠনশৈলীর সনেট হওয়া সত্ত্বেও বাংলায় লিখলে পের্ত্রাক, পিয়ারভন, সুইডেন, মধুসূদনের মতো হয় কিন্তু মৃত-সংস্কৃত ভাষায় সনেট লিখলে তা সনেট না হয়ে শেক্সপিয়র,স্পেনসার, এস.টি কোলরিজের চতুর্দশপদীর মতো নাকি চকচক করে। এতো বিষম দায় দেখছি। ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথের আঠারো মাত্রার মহা পয়ারের সনেট যে রচনা করিনি,এমন মন্তব্য কেউ না করায় অন্তত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার ভরসা পেলাম।
লেখকঃ শাহ আব্দুস সালাম।
কবি, সাহিত্যিক ও গবেষক।





