#ইতিহাস ও ঐতিহ্য #সিলেট বিভাগ

রেডিও পল্লীকণ্ঠ ; আমার কণ্ঠ (মৌলভী বাজার)- শামীমা এম রিতু ।

সভ্যতার শুরু থেকেই যুগে যুগে মানুষের আনন্দ বিনোদনের মাধ্যমে এসেছে পরিবর্তন। বাংলাদেশে একসময় ছিলনা কোন ইলেকট্রনিক মাধ্যম। পূর্ণিমার রাতে বটের তলই ছিল বিনোদনের মাধ্যম। চাঁদনী রাতে সেখানেই গায়েন-বাউলেরা জড়ো হয়ে গানের আসর জমাতেন। ঝিঁঝিঁ ডাকা রাতে চলত বাউল-কবিগান আর পালাগানের লড়াই। গ্রামের সহজ সরল মানুষেরা দলবেঁধে নির্দিষ্ট স্থানে এসব উপভোগ করতেন। পরবর্তী সময়ে যুগের স্রোতে ভেসে এলো রেডিও বা বেতার তরঙ্গ। বিনোদন জগতে শুরু হলো প্রথম বিপ্লব।তখনকার সময়ে কারো একটি রেডিও সেট থাকা মানেই সেটা অনেক বড় গৌরবের বিষয়।পরিবারে আভিজাত্যের প্রতীক ছিল রেডিও।

১৯২৭ সালের ২৬ আগস্ট বাংলাদেশে প্রথম রেডিও স্টেশন স্থাপিত হয় এবং রেডিও সম্প্রচার শুরু হয় ১৬ ডিসেম্বর ১৯৩৯ সালে। যা প্রথমে ‘রেডিও বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত ছিল। ০৪ মার্চ ১৯৭১ সালে এটি ‘রেডিও পাকিস্তান’ থেকে ‘রেডিও বাংলাদেশ’ নামকরণ হয়। ১৯৭৬ সালে এটি ‘বাংলাদেশ বেতার’ নামধারণ করে।বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতারের অবদান সর্বজনবিদিত।জীবন বাজি রেখে সেদিন রেডিও কর্মীরা করেছিলেন কন্ঠযুদ্ধ; যাদের কণ্ঠ সৈনিক বা শব্দ সৈনিক বলে সম্মানীত করা হয়।

সময়ের পরিক্রমায় ২০০৬ সালের মে মাসে রেডিও টু’ডে এর সম্প্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশে শুরু হয় বেসরকারি এফএম রেডিওর সম্প্রচার। এর পরেই যাত্রা শুরু করে কমার্শিয়াল রেডিও ফুর্তি ও রেডিও আমার। যা বাংলাদেশের বিনোদন জগতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করলেও সেটি ছিল বাণিজ্যিক রেডিও এবং প্রান্তিক পর্যায়ের জনসাধারন তাতে অংশ নেবার তেমন সুযোগ ছিল না। রেডিও শুধু মাত্র বিনোদন মাধ্যম নয়; শিক্ষা, সচেতনতা এবং সমাজের অগ্রগতিতে রয়েছে এর বিরাট ভ‚মিকা।বিশেষত,স্বাস্থ্য সচেতনতা,নারী ও শিশু শিক্ষা ,যৌন হয়রানি নির্মূল ,ইভটিজিং, বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ সহ নানা সামাজিক অপরাধ নিরসনে রেডিও অনুষ্ঠান অগ্রগণ্য কার্যাবলি সম্পাদন করছে।

বর্তমান ইন্টারনেটের যুগে উন্নয়নশীল দেশের দরিদ্র্য জনগোষ্ঠীর জন্য এক আশীর্বাদ হলো কমিউনিটি রেডিও। কমিউনিটি রেডিও কার্যক্রম প্রথম শুরু হয় দক্ষিণ আমেরিকায়। দারিদ্র্যতা ও সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ১৯৪৮ সালে এর উৎপত্তি হয়। বলিভিয়ার ‘মাইনার্স রেডিও’ এবং ‘কলম্বিয়ার ‘রেডিও সুতাতেনজা’র মাধ্যমে কমিউনিটি রেডিওর ধারনা বিশ্বে এক নবদ্বারের উন্মোচন করে। কমিউনিটি রেডিও হচ্ছে- স্থানীয় একটি বেতার কেন্দ্র। যা একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে সম্প্রচারিত হয়।এর মূল উদ্দেশ্যই হলো স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন কেন্দ্রিক সমস্যা ও তাদের চাওয়া-পাওয়া কে তুলে ধরে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন করা। কমিউনিটি রেডিওর সকল কাজেই স্থানীয়রা অংশগ্রহণ করে থাকেন এবং মতামত প্রদান করে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন।

দক্ষিন এশিয়ায় প্রথম ২০০৬ সালে ভারত কমিউনিটি রেডিও চালু করে।ভারতে প্রায় ৬ হাজার কমিউনিটি রেডিও রয়েছে।থাইল্যান্ডে এর সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার। তবে কমিউনিটি রেডিওর কার্যক্রমের দিক থেকে নেপাল অনেক এগিয়ে আছে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ সরকার ১৭ টি কমিউনিটি রেডিওকে সম্প্রচারের অনুমতি প্রদান করে। ফলে বাংলাদেশে বিনোদন এবং তথ্য ক্ষেত্রে নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়।
ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার যুগেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে কমিউনিটি রেডিও প্রধান শক্তিশালী ও জনপ্রিয় মাধ্যম। বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও এন্ড কমিউনিকেশন্স (বিএনএনআরসি) -বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কমিউনিটি রেডিও স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে। যার ফলে বর্তমানে প্রায় ১৭ টি কমিউনিটি রেডিও ১ হাজার তরুন-তরুণীর অংশগ্রহণে দৈনিক ১৩৫ ঘণ্টার বেশি সময় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে।১৬টি জেলার ১১৫ টি উপজেলায় প্রায় ৬১ লক্ষ মানুষ এর উপকারীতা ভোগ করছে।

বাংলাদেশের কমিউনিটি রেডিও গুলোর একটি হলো বিশ্বের বৃহত্তম এনজিও স্যার ফজলে হাসান আবেদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ব্র্যাক,সামাজিক ক্ষমতায়ন কর্মসূচীর অন্তর্গত মৌলভীবাজারের মাতারকাপনে স্থাপিত হয় রেডিও পল্লীকণ্ঠ এফএম ৯৯.২, মৌলভীবাজার এর স্টেশন। ‘আমরার রেডিও আমরার কথা কয়’ এই প্রতিপাদ্যকে নিয়ে সিলেট বিভাগের চা বাগানের নির্মলতায় ঘেরা মনু নদীর তীরে মৌলভীবাজার শহরতলী মৌলভীবাজার- শমসের নগর -চাতলাপুর রোডের মাতার কাপন এলাকায় ২০১১ সালের ১২ জানুয়ারি শুরু হয় রেডিও পল্লীকণ্ঠের কার্যক্রম। প্রথমে ০৭ টি উপজেলায় শ্রোতা সংখ্যা প্রায় ০৫ লক্ষ (আনুমানিক) হলেও বর্তমানে এর সম্প্রচার এরিয়া বৃহত্তর সিলেট জুড়ে প্রায় ১১টি উপজেলায় (আংশিক) এবং শ্রোতা সংখ্যাও প্রায় ০৬ লক্ষাধিক। প্রজেক্ট ডিরেক্টর জনাব আন্না মিন্জ এর সার্বিক সহায়তায় রেডিও প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. আজিজুর রহমান এর দিকনির্দেশনায় প্রতিষ্ঠাকালীন স্টেশন ম্যানেজার মেহেদী হাসান এবং প্রোগ্রাম প্রডিউসার মো.আল-আমীন এর কর্মতৎপরতায় প্রায় ২৫ জন রেডিওকর্মী নিয়ে পল্লীকণ্ঠ গৌরবের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। চা-বাগানের আজন্ম অবহেলিত চা শ্রমিক ,সুবিধাবঞ্চিত হরিজন সম্প্রদায় সহ রেডিও তার বার্তা পৌছে দিয়েছে স্থানীয় কমিউনিটির সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে।প্রবাসী অধ্যূষিত এই এলাকার সকল মানুষের কাছে এটি তুমুল জনপ্রিয়। শিক্ষা, কৃষি,স্বাস্থ্য ও পরিবার,সংবাদ প্রচার, বিনোদন, স্থানীয় শিল্পীদের প্রতিভার প্রকাশ ,জনসচেতনতা ,স্থানীয় বাজার মূল্য প্রচার সব মিলিয়ে রেডিও পল্লীকণ্ঠ অনন্য উচ্চতায় অধিষ্টিত।প্রতিটি অনুষ্ঠানেই স্থানীয়রা অংশগ্রহল করে থাকেন। এটি সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় পরিচালিত হয় বলে সহজইে কমিউনিটির মানুষ সহজেই এটিকে আপন মনে করেন। সিলেটী সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রচার-প্রসারে পল্লীকণ্ঠ সুদূরপ্রসারী ভ‚মিকা পালন করছে। রেডিও পল্লীকণ্ঠের বিশেষ অনুষ্টান ছাড়াও নিয়মিত অনুষ্ঠান রয়েছে ৪২ টি। প্রতিটি অনুষ্ঠানই জনপ্রিয় এবং স্থানীয় মানুষ এবং তাদের জীবনকে তুলে ধরে জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।

কমিউনিটি রেডিওর একটি বিশেষ দিক হলো- এর সহজলভ্যতা।ইন্টারনেট,ডিশ এন্টেনা,প্রভৃতিতে খরচ থাকলেও রেডিও শুনতে কোন খরচ করতে হয়না।যে কোন সময় যে কোন স্থানে মোবাইল ফোন থেকেই রেডিও শোনা যায়।ফলে সময় ও খরচ দুটোই সাশ্রয় হয়।কাজের মাঝেও যে কোন অনুষ্ঠান উপভোগ করা যায়।এ জন্য এলাকায় গাড়ি থেকে চায়ের দোকান কিংবা শপিং সেন্টারেও শোনা যায় পল্লীকণ্ঠের কণ্ঠ।এতে স্থানীয় সংবাদ প্রচারিত হওয়ার ফলে সহজেই স্থানীয় এলাকার সকল খবরাখবর শ্রোতারা সহজেই পেয়ে যান।শ্রোতাক্লাব এবং শিশু শ্রোতাক্লাব রেডিওর প্রচার এবং অনুষ্ঠান নির্মাণে বিশেষ ভ‚মিকা রাখে।শ্রোতাক্লাব সভায় শ্রোতারা তাদের মতামত ব্যক্ত করে অনুষ্ঠান নির্মাণে আরো সহযোগী ভ‚মিকা পালন করেন। করোনা কালীন সময়েও কমিউনিটি রেডিও তার কার্যক্রম চালিয়ে গিয়েছে এবং রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় ভ‚মিকা। কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ কমিউনিটি রেডিও পল্লীকণ্ঠ লাভ করেছে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার। এর মধ্যে অন্যতম হলো এবিইউ পুরস্কার, ইউনিসেফের মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড (প্রায় ১২ টি) সহ নানা সম্মাননা। যা বাংলাদেশের কমিউনিটি রেডিও গুলোর মধ্যে পল্লীকণ্ঠকে অনন্য সম্মান ও উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে।

সিলেট বিভাগের একমাত্র কমিউনিটি রেডিও পল্লীকণ্ঠের সাথে যুক্ত থাকতে পেরে আমি গর্ববোধ করি যে আমার মাতৃভাষায় আমি আমার সাহিত্য-সংস্কৃতি সকলের মাঝে তুলে ধরার চেষ্টা করতে পারছি।বহুবছর আগে সিলেটী ভাষায় নাগরি লিপিতে বই-পুঁথি রচিত হয়েছিল আর বর্তমানে সেই ভাষাতেই অনুষ্ঠান নির্মাণ ও সম্প্রচার করে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরা হচ্ছে বৃহত্তর সিলেটী কমিউনিটিকে। প্রায় একযুগ ধরে পল্লীকণ্ঠ চালিয়ে যাওয়া কার্যক্রম নিয়ে আরো অনন্যতায় পৌঁছোক এই শুভকামনা ও প্রচেষ্টা সবসময়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *