জিন্নাহ ধর্ম ভারত বিভাগ ইতিহাসের ভিতরের ইতিহাস – সৈয়দ এনায়েতুর রহমান
আজ ভারত বিভাগের ৭৩তম বার্ষিকী।৭৩ বছর আগে, ১৯৪৭ সনের এই দিনে পাকিস্তান এবং ১৫ই অগাস্ট ভারত নামে দুটি দেশের জন্ম হয়।সচেতন ইতিহাসমনষ্ক ব্যক্তি মাত্রেই জানেন ভারত ভাগের ধারাবাহিকতায় আমাদের আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম।
ইতিহাস বড়ই নির্মম সত্য—তারচে নির্মম হল ইতিহাসের ভিতরের সত্য।আমরা জানি,শুধুই ইতিহাস—ভিতরের ইতিহাস জানি কয় জন?আজ কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের রেষারেষি।ভারতের বড়ভাই সুলভ খবরদারীতে প্রতিবেশী দেশগুলো অতিষ্ঠ।কোন কোন প্রতিবেশী দেশ ভারতের চাপে বাধ্য হয়ে নতজানু পররাষ্ট্র নীতি অনুসরণ করছে।ভারতের সাংষ্কৃতিক ও বাণিজ্যিক অগ্রাসনে প্রতিবেশীরা দিকভ্রান্ত ও অসহায়।
আজকের এ অবস্থার জন্য দায়ী কে বা কারা?যারা কথায় কথায় দেশ ভাগের জন্য বৃটিশদের দায়ী করেন,তারা কেবল ইতিহাস জানেন,ইতিহাসের ভিতর ইতিহাস জানেন না!১৯৩৫সনের বৃটিশ সরকারের”ভারত শাসন আইন”করা হয়ে ছিল এই উপমহাদেশের শাসন ভার এঁদের হাতে দিয়ে যথাসম্ভব নির্বিবাদে ফিরে যাওয়া।কিন্তু এতে ফ্যাঁকড়া বাধান আমাদের কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের তৎকালীন নেতারা।
১৯০৬ সনের ৩০শে ডিসেম্বর তারিখে ঢাকায় এক সম্মোলনে অবিভক্ত ভারতের মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ ও ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ের নেতা আগা খানের উদ্যোগে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের জন্ম হয়।১৯৪০সালে লাহোর প্রস্তাবে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাস ভূমি দাবী করা হয়।এই সর্বসম্মত প্রস্তাবের উত্থাপক ছিলেন শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক।পরবর্তী সময়ে আমরা দেখতে পাই বৃটিশ কর্ত্তৃপক্ষের সঙ্গে দরকষাকষিতে কেবল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর দাপট।
১৯১৭ সনের অগাস্ট মাসে ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ডের সময় বৃটিশ সরকার প্রথম ঘোষনা করে যে,তাদের ভারত নীতির লক্ষ্য হল এখানে একটি দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্টা করা।সে লক্ষ্যই সব এগুচ্ছিল।ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল ১৯৪৮সনের জুন মাসে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটা সম্ভাব্য সময়সীমা ঠিক করেন।লর্ড ওয়াভেলের পর ভাইসরয় হিসেবে অভিষিক্ত হন লর্ড মাউন্টব্যাটন ১৯৪৭ সনের ২৪শে মার্চ।ইতিপূর্বে বৃটিশ ক্যাবিনেটের সিদ্ধান্ত ছিল ভারতকে অবিভক্ত রেখেই ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে।
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ছিল অবিভক্ত ভারতের পক্ষে।কিন্তু জিন্নাহ পাকিস্তান দাবী করলেন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ৬টি প্রদেশ সহ।এর মধ্যে অবিভক্ত পাঞ্জাব ও বঙ্গদেশ রাখতে হবে।ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেন কোন মতেই অবিভক্ত পাঞ্জাব ও বঙ্গদেশ সহ পাকিস্তান দিতে নারাজ।তাঁর মত,হয় অখণ্ড ভারত,নয়তো বিভক্ত পাঞ্জাব ও বঙ্গদেশ সহ পাকিস্তান।এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক চলতেই থাকল।যারা মনে করেন ধর্মের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তানের জন্ম।সেটা ভুল।দু’জনের যুক্তি-তর্কের নমুনা দেখুন——
মাউন্টব্যাটেন :”পাঞ্জাব ও বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু অঞ্চলকে পাকিস্থানের অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না”।
জিন্নাহ: “আপনি বুঝছেন না,পাঞ্জাব একটা জাত,বাংলা একটা জাত।একজন মানুষ প্রথমে পাঞ্জাবী বা বাঙ্গালি পরে সে হিন্দু অথবা মুসলমান”।
মাউন্টব্যাটেন: “আপনি যা বলছেন তা ঠিকই,একজন মানুষ হিন্দু বা মুসলমান হবার আগে সে পাঞ্জাবী বা বাঙ্গালিই নয়,সবার আগে সে ভারতীয়।আপনি যা বললেন তা তো ভারতকে অখণ্ড রাখার যুক্তি…।”—–
জিন্না যুক্তিতে হেরে গেলেন।তাঁর পরও তিনি গোঁ ধরে থাকলে ভাইসরয় তাঁকে পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন পাকিস্তান চাইলে পাঞ্জাব ও বাংলা ভাগ হবেই।সুতরাং তিনি শেষ পর্যন্ত”খন্ডিত ও পোকায় খাওয়া(Tranked & moth eaten)পাকিস্থানের দাবী মেনে নিলেন।
শাসক জাতি ইংরেজরা আগেই টের পেয়ে ছিল, হয় অখণ্ড ভারত নয় ওই প্রদেশ দুটি বিভক্ত করেই ভারত-পাকিস্থান ডোমিনিয়ন সৃষ্টি করতে হবে নতুবা ভবিষ্যতে রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটবেই।আর জিন্নাহও টের পেয়েছিলেন যে ভবিষ্যতে পূর্ব পাকিস্তান বিছিন্ন হয়ে যাবে।বাধ্য হয়েই তাঁকে এই শর্ত মেনে নিতে হয়েছিল।কাকতালীয় ভাবে বৃটিশ রাজ ও জিন্নাহ’র ধারনা মিলে যায়।এ দুটো ছিল ১৯৪৬ইং ১৬ই অগাস্ট তারিখে মুসলিম লীগ আহুত” ডাইরেক্ট একশ্যন ডে”র দিন “গ্রেট কলিকাতা রায়ট” আর ২৪ বছর পর বাংলা দেশের জন্ম।
জিন্নাহ কিন্তু ধর্মকে বিভক্তিকরনের একমাত্র উপাদান হিসেবে দেখেন নি।তবে ধর্ম রুপী তাসের টেক্কাটা সময়োচিত ব্যবহার করছেন এতে কোন সন্দেহ নেই।যার ধারাবাহিকতা আজও বিভক্ত উপমহাদেশের রাজনীতিবিদরা করে যাচ্ছেন।সেটা মোদীজি,ইমরান বা আমাদের প্রধানমন্ত্রী সবার ক্ষেত্রেই খাটে…!সময় বদলেছে বটে—খেলা পালটায় নি।
জিন্নাহ ব্যক্তিগত ভাবে ধর্মনিষ্ঠ ছিলেন তার কোন প্রমান নেই।তাঁর ব্রান্ডেড জিন্নাহ টুপিটা ছিল স্রেফ একটা টুপিই—যদিও তখনকার অনেক মুসলিম লীগ নেতা এঁকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে মাথায় দিতেন।এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনা বলে লেখার উপসংহারে যাব।
আজ হতে ৭৩ বছর আগে ১৯৪৭সনের ১৪ই অগাস্ট ছিল পবিত্র মাহে রমজান মাস।করাচীতে পাকিস্তানের ক্ষমতা হস্তান্তর দিবসের অনুষ্টান ছিল।রাজপ্রতিনিধি হিসেবে মাউন্টব্যাটন উপস্থিত থাকার কথা।জিন্নাহ সাহেব ১৪ই অগাস্ট লাঞ্চ পার্টির আয়োজন করেন।উনি ভুলেই গিয়েছিলেন যে মাহে রমজান চলছে,—তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেবার পর সেটা ১৩ই অগাস্ট ডিনার পার্টিতে এগিয়ে নেয়া হয়।আর ভারতের ক্ষমতা হস্তান্তর অনুষ্টানের আয়োজন করা হয় ১৪ই অগাস্ট ১৯৪৭ইং ১২টা বাজার সামান্য মূহুর্ত আগে।





