‘আমার মনে ‘টিংটংবেল’’ – শামীমা এম রিতু।
সাহিত্য- তিনটি অক্ষরের শব্দে প্রতিফলিত হয় একএকটি দেশ ও জাতির ইতিহাস। এই সাহিত্যেই ফোটে উঠে আমাদের জীবন, আমাদের মননশীলতা আর সাংস্কৃতিক রুচিবোধের পরিচয়। সাহিত্যের বিভিন্ন ধারা রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘শিশু সাহিত্য’। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এই শিশু সাহিত্যের গুরুত্ব অপরিহার্য।
বাংলা শিশুসাহিত্যের বয়স খুব বেশি নয়। মাত্র দুই-আড়াইশ বছর। রবীন্দ্রনাপূর্ববর্তী যুগে শিশুসাহিত্য ছিল নিছক উপদেশমূলক। এরপর মানববন্দনা আর ধর্মবন্দনা যোগ হয়েছিল। এর মধ্যে থেকেই দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজমুদার,উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং যোগীন্দ্রনাথ সরকার এসে শিশুসাহিত্যে বিপ্লবের জোয়ার বইয়ে দেন। অন্দর ছেড়ে এল শিশুসাহিত্য। আলো-বাতাসের সঙ্গে একাকার হয়ে স্বপ্নময় জগতে পরিণত হল। বুদ্ধদেব বসু সেই স্বপ্নময় জগতের নাম দিলেন‘শিশুসাহিত্যের সোনালি যুগ’।
বাংলা শিশুসাহিত্য আর আঁতুড়ঘরে নেই। নেই আর অন্দরেও। ধারাবাহিক পরিবর্তনের মাধ্যমে শিশুসাহিত্য আর শিশুটিও নেই। নামে শিশুসাহিত্য হলেও সে এখন টগবগ করছে গণমানুষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। বলা যেতে পারে, সে এখন অনুশাসন মানে না কারও। বরং শাসক হিসেবেই ধারাবাহিক বাড়ন্ত অবয়ব তার। সময়ের প্রয়োজনেই জীবনকে জীবনের মতো দেখে ‘শিশুসাহিত্য’নামক একদা অবহেলিত এই সাহিত্য এখন জীবনের জয়গান গেয়ে যাচ্ছে অবিরাম।অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, খগেন্দ্রনাথ মিত্র, সুকুমার রায়রা বাংলা শিশু সাহিত্যকে একটি মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়েছিলেন। সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন ঘটে সাহিত্যের স্রোতেও ,যদিও ইতিহাসের নিয়মে অবস্তুগত সংস্কৃতি রূপ পাল্টায় ধীরে ধীরে।দেশ বিভাগের পর কবি হাবীবুর রহমান, ফয়েজ আহমদ, আব্দুল্লাহ আল মুতী, সরদার জয়েনউদ্দীন প্রমুখ বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব তখন ছোটদের নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করেছেন, পত্রপত্রিকা প্রকাশ করেছেন। এখানকার প্রথম শিশু-পত্রিকা পাক্ষিক ‘মুকুল’ প্রকাশিত হয়েছিল আবদুল্লাহ আল মুতীর সম্পাদনায় ১৯৪৮ সালে ২ ডিসেম্বরে। ফয়েজ আহমদ বের করেছিলেন মাসিক ‘হুল্লোড়’ ১৩৫৭-র শ্রাবণে (১৯৫০-এর আগস্টে)। ‘আলাপনী’ বেরিয়েছিল ১৩৬১ সালের ভাদ্র মাসে, ১৯৫৪-র আগস্টে, সম্পাদক আবদুল ওয়াহেদ। পঞ্চাশ দশকের সবচেয়ে সুন্দর ও জনপ্রিয় ছোটদের পত্রিকা বের করেছিলেন সরদার জয়েনউদ্দীন পাক্ষিক : ‘সিতারা’ এবং ‘শাহীন’।(প্রকাশকাল যথাক্রমে ১৯৫৫-র ১ ও ৭ই মার্চ) এ দুটি কাগজ প্রাদেশিক শিক্ষা দপ্তরের আনুক‚ল্যে সরকারি অনুদান নিয়ে বেরুত। এরও পরে বেগম জেবুননেসা আহমদ প্রকাশ করেছিলেন তাঁর ‘খেলাঘর’ ১৩৬২-র আষাঢ়ে, ১৯৫৫ সালের জুন-জুলাই মাসে। এগুলো ছাড়াও সে যুগে ক্ষীণায়ু ও স্বল্পজীবী পত্রপত্রিকা নেহাত কম বেরোয়নি। গ্রন্থের সংখ্যাও অপ্রতুল বললে ভুল হবে। রোকনুজ্জামান খান তাঁর একটি জরিপে দেখিয়েছেন যে, পঞ্চাশ দশকে সর্বমোট শিশুগ্রন্থ বেরিয়েছিল পাঁচশ’ সাতচল্লিশটি। গল্পগ্রন্থ, উপন্যাস, কবিতার বই, জীবনী, বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা, কোনোটির সংখ্যাই কম নয়। আতোয়ার রহমান লিখেছেন, উপন্যাসই শুধু প্রকাশিত হয়েছিল ১২৫টি। এক নজরে মনে হতে পারে, খুবই সাফল্যজনক অগ্রগতি, কিন্তু পরবর্তী দুই দশকে গ্রন্থ ও গ্রন্থকার উভয়ের নামই যে কেবল ঐতিহাসিক অনুসন্ধিৎসার বিষয় হয়ে গেল তা কোনো প্রকারেই কার্যকারণরহিত নয়। মোহাম্মদ নাসির আলী, হাবীবুর রহমান, সাজেদুল করিম এবং গোলাম রহমান- অসংখ্যের মধ্যে মাত্র এই ক’জন ধারাবাহিকতা ও প্রতিভা অক্ষুন্ন রেখে পরবর্তীকালেও স্মরণীয় হতে পেরেছিলেন।শামসুর রহমানের মতো কবি অপরূপ গদ্যে রচনা করেছিলেন ‘স্মৃতির শহর’, সৈয়দ শামসুল হক বা শওকত আলীর ন্যায় গল্পলেখক এ্যাডভেঞ্চার কাহিনী। এই ঋতুবদলে ‘কচি ও কাঁচা’ এবং ‘টাপুর টুপুরে’র দান সর্বাধিক। সময়ের পরিক্রমায় নজরুল-কিংবা রবীন্দ্র শিশু কিশোর রচনা ছাড়িয়ে আধুনিক যুগের পরে উত্তর আধুনিক অনেকেই সচেতন হয়ে শিশু সাহিত্য রচনায় ব্রতী হয়েছেন।বর্তমানে যারা শিশু সাহিত্য নিয়ে কাজ করছেন তাদের মধ্যে অন্যতম গ্রেট ব্রিটেন প্রবাসী লেখক দিলারা রুমা।
লেখক দিলারা রুমা’র প্রকাশিত শিশু সাহিত্যের ছড়াগ্রন্থ ‘টিংটংবেল’। ০১ জানুিয়ারি ২০২০ বইটি প্রকাশিত হয়। প্রকাশ করেছেন- লিখন প্রকাশনীর কর্ণধার গুণী লেখক কবি আনিসুল হক লিখন, বইয়ের পাতায় পাতায় শিশুদের উপযোগী অলংকরণের সাথে চমৎকার প্রচ্ছদ করেছেন ‘কাব্য করিম’। একুশটি ছড়া সম্বলিত এই গ্রন্থে রয়েছে বিভিন্ন বিষয়ের উপর নান্দনিত প্রকাশের লেখা আর রঙিন পাতায় রংবেরঙের প্রকাশ,যা বইটিকে শিশুদের প্রতি আরো আকৃষ্ট করে তোলে । এর গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বইটিতে বাঙলার সাথে সাথে রয়েছে ছড়া গুলোর ইংরেজি অনুবাদ। যা লেখকের সুদূরপ্রসারী যুগোপযোগী ভাবনাকে প্রকাশ করে। যেমন-
“পাখির মত মেলে ডানা উড়তে না পারে
কবে পাখি হবে সে জগতের ধারে ।”
‘শিশুর হাসি’ শিরোনামের ছড়ায় তিনি শিশুদের নিয়ে আশাব্যক্ত করেছেন –
“শিশুর মুখে কচি হাসি
সবচেয়ে লাগে ভালো
শিশুরা সব উড়তে থাক
ফোটাক নতুন আলো ।
উদ্ধান্ত কণ্ঠে তিনি তার লেখায় শিশুশ্রমের প্রতিবাদ করে বলেছেন –
“সব শিশুদের জন্য মায়া
বাড়ুক সবার কাছে
শিশুশ্রম বন্ধ করো
এই ধরনীর মাঝে” ।
নানু মনির স্মৃতি জাগ্রত করে তিনি লিখেছেন-
‘নানু মনি কথা বলে করে কুট কুট
ছড়া বলে ফিটফিটিয়ে ছোট্ট চিরকুট ।”
টিংটংবেল – হলো ক্লাস শুরু
চলো যাই চলো যাই ,চলে এলা গুরু।’
এই ছড়ার নামে বইটির নামকরণ করেছেন। এখানে লুকিয়ে আছে এক গভীর দর্শন। শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। শিশুরা শিক্ষিত মানেই জাতি শিক্ষিত।আর শিক্ষার জন্য অবশ্যই বিদ্যালয়ে যেতে হয়।বিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হয় যে ঘণ্টাধ্বনি দিয়ে তখনি শিক্ষক পাঠদান শুরু করেন- ‘টিংটংবেল’ মূলত সেটাকেই নির্দেশ করে।এখানেই লেখকের শিশুদের নিয়ে চিন্তার গভীরতা প্রকাশ পায়।
একেএকে প্রজাপতি,দুঃখী মানুষ,শিশুর সুখ – প্রভৃতি রচনার মধ্য দিয়ে তিনি শিশুদের নিয়ে দেখেছেন নতুন প্রভাত- বলেছেন-
‘উল্লাসে উৎসবে বাংলার মাঠ
ভরে যাবে রঙ সঙে বৈশাখী হাট’।
তিনি কথা বলেছেন শিশুদের স্বাধীনতা নিয়ে- স্মৃতিচারণ করেছেন ‘শিশু’ ছড়ায় ছেলেবেলাকে তাইতো তিনি চেয়েছেন –
‘সব শিশুদের ভালবাসী ওরে মানুষ চলো
শিশুদের জন্য আগামীটা হোক ঝলমলো’।
লাল সবুজের পতাকায় তিনি স্বপ্ন দেখেছেন একদিন সব শিশু একত্রিত হবে,চিরসুখে থাকবে। ‘খুকুর হাসি’,ঈদ মোবারক ছড়ায় প্রকাশিত হয়েছে শিশুর প্রতি অগাধ ভালবাসা।‘কন্যা’ তে তিনি প্রকাশ করেছেন কন্যা সন্তানের প্রতি আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্য আর নিরাপত্তার কথা-
‘আমার মায়ের মুখ দেখি কন্যা তোমার মাঝে
আমি আমার মুখ দেখি কন্যা তোমার মাঝে
—–
কন্যা আমার আলো, সবটুকু সুখ ভালো
আমার ভাল থাকা, আমার ভাল রাখা।
হুমায়রা, শুভ জন্মদিন,সুখ পাখি,বিশ্বকাপ,ঈদ আনন্দ, প্রতিটি ছড়াই গভীর অর্থপূর্ণতার সাথে সাথে ছন্দের বাহারও চমৎকার। অমর একুশে- ছড়াতে কবি প্রকাশ করেছেন -বাংলা ভাষার মর্যাদা ও ইতিহাস কে। তিনি তাদের বলেছেন –
“একুশ মানে মায়ের মুখে শোনা প্রথম ভাষা
এই ভাষাতে আবেগ আছে , আছে ভালবাসা।
একুশ মানে প্রভাতফেরী ভাই হারানো গান
একুশ মানে বাংলা ভাষা, রাখবো তাহার মান।”
শিশুদের কাছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে তুলে ধরতে রচনা করেছেন ‘কাজী নজরুল’ ছড়াটি –
“নদীর কল কল ধ্বনি , সাগরের উচ্ছ্বাস
সর্ব সময়ের বীর তুমি ,করেছো সভ্যতার চাষ।
তুমি কবি আলোক রবি ,হারাবার নয়
শংকা করেছো দূর ,হওনি পরাজয়।”
হ্যা, কবিরাই সভ্যতার চাষ করে যান, যার ফসলে পরিরপূর্ণ হয় শিশুরা। শিশুরাই হলো আগমি, তাদের দ্বারাই সজীব থাকে সভ্যতা, পরিপূর্ণ হয় ধরণী। সকল শিশুদের মাঝে ছড়ায় ছড়ায় আমরা ছড়িয়ে দিই জ্ঞানের আলো।একটি ভাল বই বাতিঘরের বাতির মত,যেটি আলোকিত করে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
কবি দিলারা রুমার ‘টিংটংবেল’ যেন সেই বিদ্যালয়ের ঘণ্টার মতই যা শিশুদের নিয়ে যাবে তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। বিদ্যালয়- যেখানে ফোটে সভ্যতার ফুল। টিংটংবেল- সেই সময়ের চিহ্নিত ধ্বনি যা আগামি প্রজন্মকে নিয়ে যাবে নব আলোয় নবপ্রভাতে । আসুন ভাল বই পড়ি এবং শিশুদেরকে বই পড়তে আগ্রহী করে তুলি।
#বিদ্র: সিলেটে বইটি পাওয়া যাবে- #জসিম বুক হাউজ, আম্বরখানা (বড়বাজার) সিলেট।





