#আন্তর্জাতিক

কাবুল বিমানবন্দরে আত্মঘাতি হামলা !

কাবুলের হামিদ কারজাই বিমানবন্দরের বাইরে জোড়া আত্মঘাতী বোমা হামলায় ১২ মার্কিন সেনা ও শিশুসহ অন্তত ৯০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও শতাধিক। নিজ নিজ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন গণমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও ব্রিটিশ গণমাধ্যম ডেইলি মেইল অনলাইন।

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের বিমানবন্দরে সন্ত্রাসী হামলার সতর্কতা জারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই ‘আত্মঘাতী’ বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলো।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশত্যাগের জন্য বিমানবন্দরের বাইরে অবস্থান করছিলেন আফগানরা। আফগানদেন কাবুল থেকে সরিয়ে নেওয়ার কাজ করছিলো ডেনমার্কসহ কয়েকটি দেশ। এর মধ্যেই বিমানবন্দরের অ্যাবে গেটের বাইরে একটি আত্মঘাতী বোমা হামলা হয়। এ সময় সেখানে প্রায় চার থেকে পাঁচশ মানুষ ছিলেন। প্রথম বিস্ফোরণের পর দূর থেকে গুলি চালায় আরেক হামলাকারী। এর কিছুক্ষণ পরই পাশের ব্যারন হোটেলের বাইরে আরেকটি বিস্ফোরণ ঘটে।

তালেবান বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় এই জোড়া বিস্ফোরণ ঘটেছে। বিস্ফোরণে ১২ মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার খবর দিয়েছে বিবিসি।

বিমানবন্দরের বাইরে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা তালেবান যোদ্ধারাও বিস্ফোরণে আহত হয়েছে বলে ওই বাহিনীর একজন মুখপাত্র রয়টার্সকে জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ধারণা করছিলেন, ইসলামিক স্টেটের খোরাসান গ্রুপ (আইএসআইএস-কে) এর পেছনে থাকতে পারে।

রাতে টেলিগ্রামে আইএস এর মুখপত্র আমাক নিউজ এজেন্সির এক বার্তায় দাবি করা হয়, কাবুল বিমানবন্দরের আত্মঘাতী এই বোমা হামলা তাদেরই কাজ।

১১ দিন আগে তালেবানের হাতে কাবুলের পতন হওয়ার পর এই হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়েই ৮২ হাজারের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিদেশিদের পাশাপাশি আফগানরাও রয়েছেন তাদের মধ্যে।

৩১ অগাস্টের চূড়ান্ত সময়সীমার মধ্যে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য তোড়জোড় করছে পশ্চিমা দেশগুলো। দেশ ছাড়ার চেষ্টায় হাজার হাজার আফগানও মরিয়া হয়ে বিমানবন্দরের ভেতরে ও বাইরে অপেক্ষা করছেন প্রতিদিন।

এই নাজুক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস সেখানে হামলা চালাতে পারে বলে খবর আসছিল গত কয়েক দিন ধরেই।

কাবুল বিমানবন্দর সন্ত্রাসী হামলার ‘উচ্চ ঝুঁকিতে’ রয়েছে জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের ওই এলাকা এড়িয়ে চলতে বলেছিল বুধবার।

এই সতর্কবার্তার মধ্যেই যুক্তরাজ্যের আর্মড ফোর্সেস বিভাগের জুনিয়র মন্ত্রী জেমস হিপি বৃহস্পতিবার বিবিসি রেডিও ফোরকে বলেন, কাবুল বিমানবন্দরে মারাত্মক হামলার চেষ্টা হতে পারে বলে ‘খুবই বিশ্বাসযোগ্য‘ খবর আছে তার কাছে।

তিনি বলেছিলেন, সম্ভবত কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেরকম কিছু ঘটতে পারে।

এরপর আফগানিস্তানের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পেন্টাগনের প্রেস সেক্রেটারি জন কিরবি জানান, কাবুল বিমানবন্দরের বাইরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে এবং এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে অবহিত করা হয়েছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিস্ফোরণ পরবর্তী ভিডিওতে দেখা গেছে লাশের স্তূপ। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চার মার্কিন সেনা ও শিশুসহ অন্তত ৯০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন আরও প্রায় শতাধিক। তাদের অনেককে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঘটনাস্থলে থেকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অনেককে ঘটনাস্থলেই প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তবে ভিড়ের মধ্যে ঘটা বোমা হামলায় আহতের সংখ্যা বেশি হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় হাসপাতালগুলোর চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিস্ফোরণে হতাহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনা সদস্য ছিলেন। এমনকি নিহতদের মধ্যে অন্তত ১২ মার্কিন নাগরিক থাকার কথা বলছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। আহত হয়েছেন আরও ১৫ মার্কিন নাগরিক।

এদিকে জোড়া আত্মঘাতী বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট (আইএস)। নিজস্ব বার্তা সংস্থা আমাক-এর এক প্রতিবেদনে হামলার দায় স্বীকার করে তারা। আমাক নিউজ এজেন্সির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামিদ কারজাই বিমানবন্দরের কাছে মার্কিন ‘ব্যারন ক্যাম্প’ এলাকায় আত্মঘাতী বোমা নিয়ে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। মার্কিন সেনাবাহিনীর অনুবাদকদের এবং সহযোগীদের একটি বিশাল সমাবেশে পৌঁছে বিস্ফোরক বেল্টটি বিস্ফোরণ ঘটায় সে।

বিলাল সারওয়ারি নামের একজন আফগান সাংবাদিক প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে এক টুইটে বলেছেন, বিমানবন্দরের অ্যাবি গেইটের বাইরে কাগজপত্র পরীক্ষার জন্য দিয়ে একটি নালার পাশে অপেক্ষা করছিলেন বহু আফগান। তাদের মধ্যে অনেক নারী ও শিশুও ছিল। সেখানেই ভিড়ের মধ্যে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটনায় একজন অন্তত আরও একজন সেখানে গুলি চালায়।

আফগানিস্তানের টোলো নিউজের খবরেও ভিড়ের মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটানোর কথা বলা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের ফরেন অ্যায়ের্স অ্যান্ড ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্যাটেজি কমিটির সদস্য অ্যালিসিয়া কেয়ার্নস বলেছেন, ব্যারন হোটেলের বাইরে বিস্ফোরণের ঘটনায় বহু মানুষ আহত হয়েছেন। যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের পাশাপাশি আফগানদের মধ্যে কাদের সরিয়ে নেওয়া হবে, তা বাছাইয়ের কাজ চলছে ওই হোটেলে।

এই কনজারভেটিভ এমপি এক টুইটে জানিয়েছেন, ওই হোটেলের উত্তর গেইটের কাছে বোমা হামলার পাশাপাশি গুলিও চালানো হয়েছে।

টোলো নিউজের এক টুইটে দেখা যায়, ঘটনাস্থল থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় মানুষজনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিছু ভিডিওতে দেখা যায় রক্ত আর লাশ, আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মানুষের জুতা, ব্যাগ আর বিভিন্ন জিনিসপত্র।

সিএনএস জানিয়েছে, বিস্ফোরণের খবর যখন এল, প্রেসিডেন্ট বাইডেন তখন হোয়াইট হাউজের সিচুয়েশন রুমে আফগানিস্তানের ওপর প্রতিদিনের ব্রিফিং শুনছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনও ছিলেন তার সঙ্গে।

কাবুলে বিস্ফোরণের খবর আসার পরপরই জরুরি বেঠক ডেকেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, পরিস্থিতি হয়তো এমন দাঁড়াতে পারে যে কোনো কিছুই আর কারও নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।

তথ্যসূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *