#আন্তর্জাতিক

আফগানিস্তানে নতুন সরকার গঠন হবে সেপ্টেম্বরে।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আফগানিস্তানের নতুন সরকারি কাঠামো ঘোষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে তালেবানের। সংগঠনটির এক মুখপাত্র গতকাল শনিবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

আফগানিস্তানের ক্ষমতা তালেবানের হাতে চলে যাওয়ার পর প্রথমবারের মতো সরকারি কাঠামোর বিষয়ে দলটির পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সময় জানানো হলো। এদিকে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে পৌঁছেছেন তালেবানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা আব্দুল ঘানি বারাদার। সেখানে তিনি জিহাদি নেতা ও আফগান রাজনীতিবিদদের সঙ্গে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গড়ার বিষয়ে আলোচনা করবেন। গতকাল শনিবার তালেবানের এক জ্যেষ্ঠ নেতা বার্তা সংস্থা এএফপি’কে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এএফপির খবরে বলা হয়েছে, এরই মধ্যে খলিল হাক্কানির মতো তালেবানের অন্য শীর্ষ নেতাদের আফগান রাজধানীতে দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হাক্কানি এখনো মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসী, যার মাথার বিনিময়ে ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তালেবানপন্থি নিউজফিডে হাক্কানিকে গুলবাদিন হেকমতিয়ারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেখা গেছে। নব্বইয়ের দশকে গৃহযুদ্ধ চলাকালে তারা একে অপরের চরম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নিলেও আফগান রাজনীতিতে এখনও বেশ প্রভাব রয়েছে হেকমতিয়ারের। এছাড়াও চলতি বছর সেপ্টেম্বরে আফগানিস্তানে নতুন সরকার গঠন করা হবে। শুক্রবার মার্কিন বার্তাসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) বরাত দিয়ে করা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।

এ ছাড়াও তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর দেশ ছাড়তে মরিয়া হয়ে উঠেছেন গত দুই দশক ধরে পশ্চিমাদের সহায়তা করা আফগান নাগরিকরা। তাদের সঙ্গে ইউরোপ-আমেরিকায় গিয়ে উন্নত জীবন গড়ার প্রত্যাশীরাও যোগ হয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। এ ধরনের আফগান নাগরিকেরা প্রায় প্রতিদিনই ভিড় করছেন কাবুল বিমানবন্দরে। তাদের আশ্রয় দিতে রাজিও হয়েছে বেশকিছু দেশ।

তালেবান আফগান রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার দুদিন পরেই গত মঙ্গলবার ১৭ আগস্ট কাতার থেকে দেশে ফেরেন মোল্লা বারাদার। তবে সরাসরি কাবুলে না গিয়ে তালেবানের আধ্যাত্মিক জন্মস্থান কান্দাহারে পা রাখেন তিনি। বারাদারের প্রত্যাবর্তনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি ঘোষণা দেয়, আগের তুলনায় তাদের এবারের শাসননীতি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

তালেবান জানিয়েছে, তারা সব জাতিগোষ্ঠীকে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গড়তে আগ্রহী। তবে এতে কারা থাকবেন, কে নেতৃত্ব দেবেন সে বিষয়ে এখনো স্পষ্টভাবে কিছু জানানো হয়নি। অবশ্য কিছু গণমাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে, মোল্লা বারাদারই হতে চলেছেন তালেবান সরকারের নতুন প্রধান। ২০১০ সালে পাকিস্তানে গ্রেফতার হয়েছিলেন তালেবানের অন্যতম এ প্রতিষ্ঠাতা। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর দোহায় তালেবানের রাজনৈতিক অফিসের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন বারাদার।
আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার।

তালেবানের আইন বিষয়ক, ধর্মীয় এবং পররাষ্ট্রনীতির বিশেষজ্ঞরা আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নতুন সরকারি কাঠামো প্রকাশের পরিকল্পনা করছেন বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন ওই মুখপাত্র। এর আগে ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ছিল তালেবান। সে সময় বেশ কঠোরভাবেই আফগানিস্তান শাসন করেছে তারা। তবে এবার আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর তালেবান অনেকটাই নমনীয় আচরণ প্রকাশ করেছে।

গত রোববার ১৫ আগস্ট রাজধানী কাবুল দখলের পর পুরো আফগানিস্তান তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তখন থেকেই পরবর্তী দিনগুলোতে কী ঘটতে যাচ্ছে তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়। তাছাড়া তালেবান কীভাবে সরকার গঠন করবে বা তাদের সরকারি কাঠামো কেমন হবে তা নিয়েও আলোচনা শেষ হচ্ছে না। তবে এবার তালেবান ক্ষমতা দখলেও পরও পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন বলা যায়। তালেবান দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরও মেয়েদের স্কুলে যেতে দেখা গেছে, টিভি চ্যানেলে নারীদের সংবাদ উপস্থাপনা করতেও দেখা গেছে। বড় ধরনের কোনো সহিংসতার খবরও সেখানে পাওয়া যায়নি। এমনকি তালেবানের নেতাদের পক্ষ থেকে তাদের যোদ্ধাদের কোনো ধরনের সহিংসতা না করার এবং লোকজনের বাড়ি-ঘরে প্রবেশ না করার আহ্বান জানানো হয়।

নারীসহ অন্যান্য লোকজনকে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফেরা এমনকি তালেবান সরকারে নারীদের অংশগ্রহণের আহ্বানও জানিয়েছে তালেবান। তবে নারীদের অবশ্যই হিজাব পরেই সব কাজে অংশ নিতে হবে বলে জানানো হয়। তালেবানের পক্ষ থেকে দেশের উন্নয়ন এবং জনগণের সেবা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সবাইকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। তবে এটা ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে তালেবান গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করবে না। তালেবান শাসনে আফগানিস্তান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হবে না বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন সংগঠনটির এক শীর্ষ নেতা। ওয়াহিদুল্লাহ হাশিমি নামের ওই নেতা বলেন, এখানে কোনো রকম গণতান্ত্রিক পদ্ধতি থাকবে না। কারণ আমাদের দেশে এর কোন ভিত্তি নেই। তালেবানের সিদ্ধান্ত প্রণয়নকারী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে হাশিমির। তিনি বলেন, আফগানিস্তানে কী ধরনের রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা থাকবে এ নিয়ে আমরা আলোচনা করব না। কারণ এটা পরিষ্কার। আফগানিস্তান চলবে শরিয়া আইনে। সেটাই শেষ কথা। এই নেতা আরও বলেন, তালেবোনের সুপ্রিম নেতা হিবাতুল্লাহ আকুন্দজাদার নেতৃত্বে গঠিত শাসক পরিষদের মাধ্যমে আফগানিস্তান পরিচালিত হবে।

সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আল-কায়েদার নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার অভিযোগে ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোটের যৌথ অভিযানে তালেবান শাসনের অবসান ঘটে। অভিযানে আল-কায়েদার শীর্ষ নেতাদের দমন করা হলেও ‘শান্তিরক্ষার স্বার্থে’ সেখানে ঘাঁটি গেড়ে অবস্থান করছিল পশ্চিমা সেনারা। কিছু বছর পার হওয়ার পর সেখান থেকে ধাপে ধাপে যুক্তরাষ্ট্র বাদে অন্য দেশের সেনাদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রও তাদের সেনাদের ফিরিয়ে নিতে শুরু করলে প্রত্যন্ত এলাকা দখল করে থাকা তালেবান কাবুলের ক্ষমতার মসনদে উঠতে জোর লড়াইয়ে নামে। যদিও এর মধ্যে তালেবানের সঙ্গে কাবুলের শাসকগোষ্ঠীর সংঘাতের অবসানে কাতারসহ বিভিন্ন পক্ষের মধ্যস্থতায় নানা সময়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সব আলোচনাই ভেস্তে গেছে।

আফগানিস্তানে নতুন সরকার গঠন হবে সেপ্টেম্বরে।কাবুলে তালেবান বাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ নেতা এপিকে এ সম্পর্কে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে নেয়া হবে। তাদের সঙ্গে আমাদের চুক্তি অনুযায়ী, সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত আমরা (সরকার গঠন বিষয়ক) আনুষ্ঠানিক কোনো পদক্ষেপ নেব না। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলা করেছিল মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আল কায়দা নেটওয়ার্ক। সে সময় সেই সংগঠনের প্রধান ঘাঁটি ছিল তালেবানশাসিত আফগানিস্তানে। এ ঘটনার জেরে ওই বছরই আফগানিস্তানে অভিযান শুরু করে মার্কিন ও ন্যাটো সেনাবাহিনী। অভিযানে পতন হয়ে তালেবান সরকারের। অভিযানের ১৮ বছর পর আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারে তালেবান নেতাদের সঙ্গে চুক্তি করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই চুক্তি অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে দেশটি থেকে মার্কিন সেনাদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সূত্র : আল জাজিরা।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *