রোহিঙ্গাদের ৩য় বছর !
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আগমনের তিন বছর পূর্ণ হলো। মিয়ানমারের আরাকানে রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর সে দেশের সেনা কর্তৃক হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের অভিযোগে জীবন বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। এই দিনটিকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করে রোহিঙ্গারা।
এবারো দিবসটি পালনের জন্য উদ্যোগ নেয়া হলেও এবার রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তবে রোহিঙ্গা নেতারা পুরনো দাবির গল্প এখনো বলে আসছে।
দাবির মধ্যে রয়েছে—
১. রোহিঙ্গারা আরাকানের স্থানীয় আদিবাসী এবং সে জন্য তাদের ন্যাটিভ স্ট্যাটাস বা স্থানীয় মর্যাদা সংসদে আইন করে পুনর্বহাল করতে হবে যার আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি থাকতে হবে।
২. নাগরিকত্ব : প্রথমত, আরাকান রাজ্যে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের সিটিজেন কার্ড দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরও সিটিজেনশিপ কার্ড দিয়ে প্রত্যাবাসন করে স্থানীয় নাগরিক মর্যাদা দিতে হবে।
তৃতীয়ত, একই সাথে বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় থাকা রোহিঙ্গাদের সিটিজেনশিপ কার্ড দিয়ে স্থানীয় নাগরিক মর্যাদা দিতে হবে।
৩. প্রত্যাবাসন : রোহিঙ্গাদের তাদের নিজস্ব গ্রামে ফিরিয়ে নিতে হবে এবং তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া জমিজমা যথাযথ ক্ষতিপূরণসহ ফেরত দিতে হবে।
৪. নিরাপত্তা : আরাকানে রোহিঙ্গাদের জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য রোহিঙ্গা পুলিশবাহিনীর সাথে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করতে হবে।
৫. জবাবদিহিতা : বার্মার স্থানীয় আদালতের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসির মতো কোনো ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনালে অপরাধীদের বিচার করতে হবে। শুরুর দিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে কিছুটা আলাপ-আলোচনা হলেও বর্তমানে থমকে গেছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে সব ধরনের আলোচনা। মাঝখানে দুইবার সরকারিভাবে প্রত্যাবাসনের সব আয়োজন হলেও কোনো রোহিঙ্গাই ফিরে যেতে রাজি হয়নি নিজ দেশে। বরং জুড়ে দিয়েছে নতুন শর্ত। এতে অন্ধকারে তলিয়ে গেছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন।
এদিকে ৩ বছরে রোহিঙ্গাদের কর্মকাণ্ডে কেবল অতিষ্ঠ নয় বরং রোহিঙ্গাদের নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটছে স্থানীয়দের। কারণ রোহিঙ্গারাই এখন স্থানীয়দের গুম-খুনসহ নানান অপরাধ জড়িয়ে পড়ছে। আর সব অপরাধ ধামাচাপা দিতে ব্যস্ত থাকে একটি সুবিধাভোগী মহল। এতে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আগামী দিনের কথা চিন্তা করে রীতিমত অস্থিরতায় আছে স্থানীয়রা। এদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের অন্য ভাসানচরসহ অন্য জেলায় বা অন্য কোনো দেশে স্থানান্তর করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইন ছেড়ে বাংলাদেশে আসতে থাকে রোহিঙ্গারা। এই সংখ্যা কিছুদিনের মধ্যে সাত লাখ ছাড়ায়।
আগে থেকে বাংলাদেশে অবস্থান করছিল আরও চার লাখ রোহিঙ্গা। তাদের কক্সবাজারের ৩৪টি কেন্দ্রে আশ্রয় দিয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় জরুরি মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে বাংলাদেশ সরকার।
আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে ২০১৭ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করলেও নানা কারণে প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ২০১৮ বছর ১৫ নভেম্বর প্রত্যাবাসন শুরুর তারিখ ঠিক হলেও নতুন করে নিপীড়নের মধ্যে পড়ার আশঙ্কা থেকে রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানায়।
প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের উদ্যোগকে ‘প্রতারণা’ বলছেন কক্সবাজারে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের একটি সংগঠনের একজন নেতা। আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস নামের সংগঠনের চেয়ারম্যান মুহিব উল্লাহ বলছেন, মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জায়গা এখনো নিরাপদ নয়।
তাদের নিয়ে যদি ক্যাম্পে রাখা হয় তাহলে বাংলাদেশের ক্যাম্পই তাদের জন্য ভালো। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর দ্বিতীয় চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার দুদিন পর আপত্তির কারণ বললেন তিনি।
গত তিন বছরে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ এবং কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। বিভিন্ন দাবি-দাওয়া পূরণের অজুহাতে রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহের কারণে বারবার প্রত্যাবাসন আটকে রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘস্থায়িত্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যে কারণে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
রোহিঙ্গারা মনে করেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তাদের জন্য এখনো নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়নি। আবার সেখানে ফিরে গেলে মিয়ানমার তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেবে না এবং অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতদের জন্য তৈরি করা ক্যাম্পে প্রায় জিম্মি অবস্থায় তাদের রাখা হবে।
এ ধরনের নানা রকম অবিশ্বাস কাজ করছে রোহিঙ্গাদের মধ্যে। টেকনাফ রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর উখিয়া টেকনাফের ১২টি পয়েন্ট দিয়ে প্রবেশ করে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা।
আগে আসা রোহিঙ্গাসহ বর্তমানে ৩৪টি ক্যাম্পে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। যেটা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ আশ্রয়কেন্দ্র হিসাবে ইতোমধ্যে ঘোষণা হয়েছে। আমরা দেখেছিলাম সরকার প্রথমদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য কয়েকটি চুক্তি করেছিল।
রোহিঙ্গাদের কারণে এখন স্থানীয়রা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। কারণ তারাই এখন স্থানীয়দের অপহরণ করে গুম-খুন করতে দ্বিধা করছে না। টেকনাফের যুবলীগ নেতা ওমর ফারুক, উখিয়ার ব্যবসায়ীসহ অসংখ্য স্থানীয়দের অপহরণ করে হত্যাসহ চাঁদা আদায় করেছে রোহিঙ্গারা কিন্তু সেই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কি বা ব্যবস্থা নিয়েছে? বরং সুবিধাভোগী মহলের পৃষ্ঠপোষকতায় তারা পার পেয়ে গেছে। এখন আমাদের রোহিঙ্গাদের সমীহ করে চলার মতো অবস্থা হয়ে গেছে।
এই অবস্থা চলতে থাকলে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য বড় হুমকি হতে পারে। তাই প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত ভাসানচরসহ অন্য জেলায় বা তৃতীয় কোনো দেশে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করার দাবি জানান তিনি। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যবাসন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না এটা ঠিক না।





