#দেশের খবর

বেঁধে দেয়া দামে মিলছেনা ভোজ্যতেল।

ভোজ্যতেলের বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতা কাটেনি। সরকার দর ঠিক করে দিলেও সেই দরে সয়াবিন তেল বা পামসুপার তেল পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ অস্বাভাবিক দাম বাড়ার প্রেক্ষিতে ভোক্তাদের স্বার্থে খুচরা, পাইকারি ও মিলগেট পর্যায়ে সয়াবিন ও পামসুপার তেলের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, এমন অভিযোগ ঠিক নয়। সরকার বলছে মনিটরিং চলছে।

সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রতি লিটার সয়াবিন (খোলা) মিলগেটে ১০৭ টাকা, পরিবেশক মূল্য ১১০ টাকা এবং খুচরা মূল্য ১১৫ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। বোতলের প্রতি লিটার সয়াবিন মিলগেট মূল্য ১২৩ টাকা, পরিবেশক মূল্য ১২৭ টাকা এবং খুচরা মূল্য ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। আর বোতলের ৫ লিটার সয়াবিন মিলগেট মূল্য ৫৮৫ টাকা, পরিবেশক মূল্য ৬০০ টাকা এবং খুচরা মূল্য ৬৩০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। সেইসঙ্গে পাম সুপারের প্রতি লিটার মিলগেট মূল্য (খোলা) ৯৫ টাকা, পরিবেশক মূল্য ৯৮ এবং খুচরা বাজারে ১০৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এখনও ভোজ্যতেলের দরের ক্ষেত্রে অস্থিরতা ও অরাজকতা দেখা গেছে। অধিকাংশ বাজার বা দোকানেই সরকার নির্ধারিত দরে ভোজ্যতেল বা সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে খোলা সয়াবিন তেল ১১৫ টাকা দরে বিক্রি করার কথা থাকলেও বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকায়। একইভাবে পামসুপার বিক্রি হচ্ছে ১২৫ টাকায়। যা বিক্রি করার কথা প্রতিলিটার ১০৪ টাকা। বোতলের ৫ লিটার সয়াবিন তেল ৬৩০ টাকায় বিক্রি করার কথা থাকলেও তা বিক্রি হচ্ছে ৬৭০ টাকার ওপরে। ১৩৫ টাকা বোতলে এক লিটার সয়াবিন পাওয়া গেলেও কোনও কোনও কোম্পানির বোতলের এক লিটার সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজার ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ গোলাম মাওলা জানিয়েছেন, আমরা পাইকারি বাজারে সরকার নির্ধারিত দরেই ভোজ্যতেল বিক্রি করছি। পাইকারি বাজারে এখন সুপারপাম তেল ৯৬ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেল ১১০ টাকা লিটার দরে বিক্রি হচ্ছে।

সিটি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক বিশ্বজিৎ সাহা জানিয়েছেন, সরকার যেহেতু দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, আমাদের তা মানতেই হবে। আমরা শুরু থেকেই সরকার নির্ধারিত দামে সয়াবিন তেল বিক্রি শুরু করে দিয়েছি। কাজেই সরকার নির্ধারিত দরে ভোজ্যতেল বিক্রি হচ্ছে না এমন অভিযোগ সঠিক নয়।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এর আগে ভোজ্যতেলের সর্বোচ্চ দাম ছিল ২০১২ সালের মাঝামাঝি। ওই বছর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি মেট্রিক টন ১ হাজার ৪০০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। তখন আমদানি কম হওয়ায় বাজারে তেলের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৭ জুলাই বিশ্ববাজারে প্রতিটন অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম ছিল ৭৪৩ ডলার, যা গত মাসে সাড়ে ১১শ ডলার ছাড়িয়েছে। এ দরে সয়াবিন তেল দেশের বাজারে এলে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য দাঁড়াবে ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা।

উল্লেখ্য, দেশে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ তেল আমদানি করতে হয়। কোম্পানিগুলো অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানি করার পর পরিশোধন করে তা বাজারজাত করে।

ব্যবসায়ীরা বলেছেন, এখনও নতুন দামের সয়াবিন তেল কারখানা থেকে সরবরাহ করা হয়নি। আগের কেনা তেলই বিক্রি করছেন বলেও জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, দেশের ২/৩টি কারখানার মালিকই ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে ৫টি পরিশোধনকারী কারখানা। এই ৫ কারখানার মালিকই নির্ধারণ করেন বাজারে সয়াবিন তেলের মূল্য কত হবে। তারা ঠিক করেন, দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিলে কত কমবে, আদৌ কমবে কীনা? বর্তমানে দেশের ১১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভোজ্যতেল আমদানিতে সবগুলো প্রতিষ্ঠান সক্রিয় নেই। এগুলো হলো সিটি গ্রুপ, টিকে গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, এসএ গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেড, ব্রাদার্স গ্রুপ, সেভেন সার্কেল এডিবল অয়েল, দাদা গ্রুপ ও নুরজাহান গ্রুপ । এগুলোর মধ্যে অনেক কোম্পানিই এখন ভোজ্যতেলের ব্যবসা করছে না। সক্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি তেল আমদানি করে সিটি গ্রুপ। পরের অবস্থানে টিকে গ্রুপ। এরপরের অবস্থানে মেঘনা গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ ও বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেড। এ গ্রুপগুলোই মূলত বাংলাদেশের ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে বলে জানা গেছে। বেসরকারি কারখানাগুলোর পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) কিছু পরিমাণ সয়াবিন তেল আমদানি করে।
উল্লেখ্য, দেশে ১৬ কোটি মানুষের জন্য বছরে ভোজ্যতেলের মোট চাহিদা হচ্ছে ১৫ লাখ টন। এর মধ্যে সয়াবিনের চাহিদা ১১ লাখ টন, পামঅয়েলের চাহিদা ৩ লাখ টন এবং সরিষা তেলের চাহিদা ১ লাখ টন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব জাফরউদ্দিন জানিয়েছেন, বিষয়টি সরকারের নজরে আছে। সরকার নির্ধারিত দরেই ভোজ্যতেল বিক্রি করতে হবে। এসব বিষয় মনিটরিংয়ের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক টিম কাজ করছে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *