#দেশের খবর

পাটুরিয়া ঘাটে ভয়াবহ ফেরি দুর্ঘটনা !

মানিকগঞ্জের শিবালয়ের পাটুরিয়া ঘাটে আমানত শাহ নামের একটি রো-রো ফেরি ১৭টি ট্রাক এবং বেশ কয়েকটি যানবাহন নিয়ে যমুনা নদীতে ডুবে গেছে। গতকাল বুধবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ঘাটে এ ঘটে। এতে ১৫ জন সামান্য আহত হয়েছেন। তবে প্রাণহানির কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ফেরিতে থাকা ১৭টি পণ্যবাহী ট্রাকের মধ্যে মাত্র ৩টি ট্রাক নামতে সক্ষম হলেও বাকি ১৪টি ট্রাক ও মোটরসাইকেল নিয়ে ফেরিটি উল্টে যায়। এ ঘটনা তদন্তে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় জেলা প্রশাসন থেকে পৃথক দু’টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এদিকে ফরি উল্টে যাওয়ায় দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রবেশদ্বার নামে পরিচিত রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন আরিচা শাখার উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. জিল্লুর রহমান জানান, খবর পাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি ইউনিট কাজ শুরু করে। উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা কাজ করছে। উদ্ধারকাজ করতে মুন্সিগঞ্জ থেকে প্রত্যয় নামে একটি উদ্ধারকারী জাহাজ আসছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মো. শরিফুল ইসলাম জানান, তাদের দুটি টিম উদ্ধারকাজ করছে। ঢাকা থেকে ৩টি টিমসহ মোট ৫টি টিম কাজ করছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বি আইডব্লিউটিসি) আরিচা শাখার উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. জিল্লুর রহমান জানান, সকাল ৯টার দিকে দৌলতদিয়া ঘাট থেকে যানবাহন নিয়ে আমানত শাহ নামের দীর্ঘদিনের পুরানো রো-রো ফেরিটি পাটুরিয়া ঘাটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। সকাল পৌনে ১০টার দিকে ফেরিটি পাটুরিয়া ৫ নম্বর ঘাটে ভেড়ে। এরপর দু’টি পণ্যবাহী ট্রাক ও ২-৩টি মোটরসাইকেল এবং শতাধিক যাত্রী ফেরি থেকে নামার পরপরই ফেরিটি ডান ডানদিকে কাত হয়ে পড়ে যায়। তিনি বলেন, ফেরি ও এতে থাকা যানবাহনগুলো উদ্ধারে বি আইডব্লিউটিএ ও ফায়ার সার্ভিসের লোকজন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিআইডব্লিউটিসির আরিচা অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী রুবেলুজ্জামান জানান, পাটুরিয়া ৫ নম্বর ফেরি ঘাটে আমানত শাহ ফেরিটি কাত হয়ে পড়ে যাওয়ার সময় এতে ১৭টি পণ্যবাহী ট্রাক ও ১৪টি মোটরসাইকেল ছিল। ফেরি ও যানবাহনগুলো উদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে।

এদিকে ফেরি উল্টে যাওয়ার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। তাদের ডুবুরি দল সেখানে তল্লাশি চালাচ্ছে বলে ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা রাফি আল ফারুক জানিয়েছেন। কীভাবে ফেরিটি ডুবে গেল- সে বিষয়ে কোনো তথ্য তিনি দিতে পারেননি। তবে অমল ভট্টাচার্য্য নামে ওই ফেরির একজন যাত্রী বলেছেন, ঘাটের কাছাকাছি পৌঁছানোর পরপরই ফেরিতে পানি উঠতে শুরু করে। ঘাটে ভেড়ার পর ফেরি কাত হয়ে ডুবতে শুরু করে।

শিবালয় থানার ওসি ফিরোজ কবির বলেন, ফেরির নিচে যে ডাম্প (ফাঁকা অংশ) থাকে, সেখানে ফুটো হয়ে পানি ঢোকায় নৌযানটি উল্টো যায় বলে তারা ধারণা করছেন। পাটুরিয়া নৌ থানার ওসি আবু বকর সিদ্দিক জানান, হতাহতের কোনো খবর তারা এখন পর্যন্ত পাননি। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, তিনটি ট্রাক ভেসে গেছে। ট্রাক ছাড়াও ফেরিতে কয়েকটি মোটর সাইকেল, প্রাইভেট কার ছিল। কতজন লোক ছিল সেটা এখনও নিশ্চিত নয়।

রাজবাড়ীর এমপি কাজী কেরামত আলী ঢাকা যাওয়ার পথে ফেরি দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পাটুরিয়া ঘাটে চলে আসেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এটা আজকে ঘাটে ঘটেছে, যদি মধ্য নদীতে হত কী পরিণাম হত? দুর্ঘটনার খবর পেয়ে মানিকগঞ্জের ডিসি মুহাম্মদ আব্দুল লতিফ এবং পুলিশ সুপার মো. গোলাম আজাদ খান, শিবালয়ের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন সুলতানা পাটুরিয়া ঘাটে ছুটে যান। ইউএনও জেসমিন বলেন, দৌলতদিয়া ঘাট থেকে ছেড়ে পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ঘাটে আসার পর ওই ফেরি থেকে ‘চার-পাঁচটি গাড়ি’ নামার সুযোগ পেয়েছিল। তারপর হুট করে ফেরিটি উল্টে গেছে। আমরা জানতে পেরেছি, মোট ১৭টি ট্রাক ছিল, আর বেশ কিছু যাত্রী ছিল। যখন ফেরি কাত হয়ে গিয়েছে, অধিকাংশ যাত্রী তখন নেমে গেছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
তলার ছিদ্র দিয়ে পানি ঢুকছিল ফেরিতে : ফেরিঘাটে নোঙর করার পর শাহ আমানত নামের রো-রো ফেরিটি তলদেশের ছিদ্র দিয়ে পানি ঢুকে ফেরি উল্টে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ প্রত্যক্ষদর্শীদের। কুষ্টিয়া থেকে আসা ফেরির মোটরসাইকেল যাত্রী মোহাম্মদ সুজন বলেন, দৌলতদিয়া থেকে ছেড়ে আসার পর মাঝ পদ্মাতেই ফেরির তলদেশের ছিদ্র দিয়ে পানি ঢুকতে শুরু করে। এতে ফেরি কিছুটা কাত হয়ে যায়। ফেরিটি ৫ নম্বর ঘাটে আসা মাত্রই একপাশে কাত হতে থাকে। কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই ফেরিটি উল্টে যায়।

খুলনা থেকে ছেড়ে আসা কাভার্ডভ্যান চালক আসলাম বলেন, আমরা গাড়িতেই ছিলাম। কয়েকজনকে বলতে শুনেছি ফেরিতে পানি উঠছে। নদীতে স্রোত থাকলে ফেরিতে পানি উঠে এটা সব সময় দেখি, এজন্য গুরুত্ব দেইনি। যখন ফেরি পাড়ে ভিড়ল তখন দুমড়ে-মুচড়ে একটা গাড়ি আরেকটার সঙ্গে ধাক্কা লাগছিল। তখন গাড়ি থেকে নেমে নদীতে ঝাঁপ দিই। ফেরির মাস্টার শরিফুল ইসলাম লিটন বলেন, চার মাস আগে ফেরিটি নারায়ণগঞ্জ থেকে ভারী মেরামত শেষে পাটুরিয়া সার্ভিসে আসে। তবে সম্প্রতি ফেরিটির তলদেশে একটি ছিদ্র হয়। ফেরিটি সকাল সোয়া ৯টার দিকে পাটুরিয়া অভিমুখে রওনা দেওয়ার কিছু সময় পরই ফেরিটির তলদেশের ছিদ্র দিয়ে ভেতরে পানি প্রবেশ শুরু করে। কিন্তু বিষয়টি যখন টের পাই তখন আর কিছু করার ছিল না। ৫ নম্বর ঘাটে ভাসমান ফেরি মেরামত কারখানা মধুমতিতে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফেরি সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এই ভাসমান ফেরি মেরামত কারখানায় মেরামতের নামে জোড়াতালি দেওয়া হচ্ছে।

মেরামত কারখানার এজিএম (প্রকৌশলী) আবদুল মান্নান তার কাছে ফেরির মাস্টাররা ফেরি মেরামতের জন্য আসলে তিনি বিভিন্ন সময় টালবাহানা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ফেরিটি আসার পর পরই মেরামত শুরু করা হয়। কী কারণে ফেরিটি ডুবলো এখনও তারা নিশ্চিত হতে না পারলেও সেক্টরের এজিএম (মেরিন) আব্দুস সাত্তার ফেরিটির তলদেশ ছিদ্র থাকার বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত দেন।

পাটুরিয়া ঘাটে ফেরি উল্টে যাওয়ায় দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রবেশদ্বার নামে পরিচিত রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে সকাল থেকেই যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। সকালে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ায় ৫ নম্বর ঘাট পন্টুনে আমানত শাহ নামের রো রো ফেরিটি পৌঁছানোর আগে উল্টে যাওয়ায় দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌ রুটে ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দৌলতদিয়া প্রান্তে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা যানবাহনগুলোর জট তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছে বি আইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ। বি আইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সকালে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া প্রান্ত থেকে আমানত শাহ ফেরিটি গাড়ি লোড করে পাটুরিয়ায়ার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। আমানত শাহ ফেরিটি ডুবে যাওয়ার পরই ৫ নং ফেরিঘাট বন্ধ করে দিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে ফায়ার সার্ভিস সহ বি আইডব্লিউটিসি। ফলে উভয়প্রান্তে ঘাটসংকট ও ফেরিসংকটের কারণে দৌলতদিয়া প্রান্তে যানজট সৃষ্টি হয়। আরিচা ফেরি স্টেশনের পরিদর্শক মুজিবুর রহমান জানান, পানির নিচ থেকে এখন পর্যন্ত একটি মোটরসাইকেল পাওয়া গিয়েছে। শেষ গাড়ি ও যাত্রী উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা অব্যাহত থাকবে।

ঘাট এলাকায় দেখা যায়, ঘাটের জিরো পয়েন্ট থেকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের বাংলাদেশ হ্যাচারিজ পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার এলাকায় ৬ শতাধিক যানবাহনের দীর্ঘ সারি। এর মধ্যে জিরো পয়েন্ট থেকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পেট্রোল পাম্প পর্যন্ত ২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে রয়েছে যাত্রীবাহী বাস। চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা দিগন্ত পরিবহনের যাত্রী ইশান শেখ বলেন, ঘাট এলাকায় সাড়ে ৫ ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছি। ঘাট থেকে এখনো ৩ কিলোমিটার দূরে আছি। পাটুরিয়ায় ফেরি উল্টে যাওয়াও ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। তাই এখনো সিরিয়ালে আটকে আছি। তথ্যসূত্রঃ সংগ্রাম।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *