#দেশের খবর

নারায়ণগঞ্জে জুস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ড।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের হাশেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৫৫ জন নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে কারখানায় আগুন লাগার পর গতকাল শুক্রবার দুপুর সোয়া দুইটা পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে ৪৯ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে আগুন দেখে ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে তিন জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় দগ্ধ ও আহত হয়েছেন আরও অনেকে। ৫১ শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। লাশ শনাক্তে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করছে সিআইডি। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পঞ্চম ও ষষ্ঠতলার ফ্লোরের আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

গতকাল আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসায় দুপুর নাগাদ থেকে একের পর এক লাশ বের করে আনতে থাকেন ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা। এরপর থেকেই ওই এলাকার বাতাসে পোড়া লাশের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এসময় স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। ভেতরে আরও লাশ থাকার আশঙ্কা করছেন ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কর্মীরা। বিক্ষুব্ধ জনতার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকদফা সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে। এ ঘটনা তদন্তে সাত সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। এ ছাড়া জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে ২৫ হাজার আর আহতদেরকে ১০ হাজার করে টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। বিকেল তিনটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর ছয়তলা ভবনের চতুর্থতলা পর্যন্ত প্রবেশ করা গেছে। সেখান থেকেই এতোগুলো লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ছয়তলা কারখানা ভবনের ওপরের দুই ফ্লোরে এখনো আগুন জ্বলছে। সেখানে আগুন নেভানোর কাজ চলছে এখনো। ধ্বংসস্তুপে তল্লাশিও এখনো শেষ হয়নি। এর আগে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শাহ নুসরাত জাহান জানান, কারখানার ভেতর থেকে অনেকের লাশ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।

বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ওই কারখানা ভবনের নিচতলায় আগুন লাগে। মুহূর্তেই আগুন ভবনের অন্যান্য তলায় ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কে শ্রমিকরা ভবনের ছাদে জড়ো হন। ছাদসহ বিভিন্ন তলা থেকে লাফিয়ে পড়েন অনেকে। এতে ওই রাতেই তিনজনের মৃত্যুর খবর জানানো হয়, আহতও হন অসংখ্য শ্রমিক। ভবনের চতুর্থ তলায় ললিপপ, তরল চকলেট, তৃতীয় তলায় অরগানিক পানীয় (জুস, লাচ্ছি), দোতলায় টোস্ট বিস্কুট, বিভিন্ন ধরনের পানীয় এবং নিচতলায় বাক্স ও পলিথিন তৈরির কারখানা ছিল। পঞ্চমতলার একপাশে সেমাই, সেমাই ভাজার তেল, পলিথিন; অপর পাশে কারখানার গুদাম ছিল। কারখানার ষষ্ঠতলায় ছিল কার্টনের গুদাম। টানা ২০ ঘণ্টা ধরে আগুন জ্বলতে থাকায় ভবনটিতে ফাটলও দেখা দেয়।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স নারায়ণগঞ্জ অফিসের উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফীন জানান, ‘পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্সে করে আমরা ৪৯ জনের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠিয়েছি। তিনি বলেন, কারখানাটির ভেতরে বিভিন্ন রাসায়নিকসহ দাহ্যপদার্থ মজুত থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস জানায়, শুক্রবার ভোরের দিকে আগুন প্রায় নিয়ন্ত্রণে এসে গেলেও সকালে পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলায় নতুন করে আগুন বেড়ে যায়। কারখানায় আটকা পড়া কর্মীদের সন্ধান না পেয়ে ততক্ষণে বাইরে জড়ো হওয়া স্বজনরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এক পর্যায়ে তারা কারখানা কম্পাউন্ডের বাইরের অংশের আরেকটি অক্ষত ভবনে ঢিল ছুড়তে শুরু করেন এবং বাইরে থাকা সাতটি মোটর সাইকেল ও তিনটি গাড়ি ভাঙচুর করেন। পুলিশ তাদের থামাতে গেলে শুরু হয় সংঘর্ষ। পরে পুলিশ তাদের সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিত নিয়ন্ত্রণে আনে। ভবনটিতে ফাটল ধরায় আরও সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম বলেন, পাঁচ ও ছয়তলায় আগুন নেভানো শেষে তল্লাশি চালানো হবে। সেখানে লাশ থাকলেও থাকতে পারে। তিনি বলেন, কিছু উচ্ছৃঙ্খল লোক কারখানায় ভাঙচুর করার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের কাঁদানে শেল ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়েছে। আটকা পড়াদের স্বজনরা কারখানার সামনের অংশে ভাঙচুর করেছে। থামাতে গেলে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ওই কারখানার মালিকপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে ২০০ শ্রমিক কাজ করতেন। শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ৫১ জন শ্রমিক নিখোঁজের তথ্য তারা লিপিবদ্ধ করেছে। ইতিমধ্যে ৪৯ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। লাশগুলো পুড়ে গেছে, সেগুলো দেখে চেনা বা শনাক্ত করার উপায় নেই।

পুলিশ সুপার বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিআইডি ও পুলিশের টিম রয়েছে। জেলা পুলিশের নিয়ন্ত্রণকক্ষ (কন্ট্রোল রুম) খোলা হয়েছে। সেখানে ডিএনএ টেস্ট করে পরিচয় নিশ্চিত করা হবে।
প্রচুর দাহ্যপদার্থ থাকায় ভয়াবহ হয়ে ওঠে আগুন : হাসেম ফুড লিমিটেডের ছয়তলা ভবনে প্রচুর প্লাস্টিক, কেমিক্যাল, কার্টনসহ প্রচুর দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। এ কারণে আগুন দ্রুত অন্য ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে। আগুন নেভাতেও বেগ পেতে হয়। লাশ উদ্ধারের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানান ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) দেবাশীষ বর্ধন। তিনি জানান, আগুন নেভানোর পর আবার আগুন জ্বলে উঠছিল। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও ডেমরা ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিট ২০ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তিনি বলেন, ওই কারখানার দুটি ফ্লোরের পাঁচ ও ছয়তলায় আগুন ড্যাম্পিংয়ের কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস।

ড্যাম্পিংয়ের কাজ শেষে সেখানে আরও লাশ রয়েছে কি না, সেটি তল্লাশি চালানো হবে। দেবাশীষ বর্ধন সাংবাদিকদের বলেন, লাশগুলো উদ্ধারের পর অ্যাম্বুলেন্সযোগে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পাঁচ ও ছয়তলায় তল্লাশি চালিয়ে পরে আপডেট তথ্য জানাতে পারবেন। তিনি বলেন, ওই কারখানায় কেমিক্যালসহ প্রচুর দাহ্য পদার্থ ছিল। এ কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়। প্লাস্টিক, ফয়েল, কাগজ, রেজিন, ঘিসহ তৈরি করা মালামালসহ বিভিন্ন পদার্থ ছিল। এ কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে সময় লাগে এবং বেগ পেতে হয়। তিনি বলেন, দুপুরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। এখন ড্যাম্পিংয়ের কাজ চলছে।
কারখানার ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, তাদের ওই ভবনের কারখানায় ২০০ শ্রমিক কাজ করতেন। ওই ভবন সেন্ট্রাল গোডাউন হিসেবে তাঁরা ব্যবহার করতেন। ওই ভবনে বিভিন্ন জুসের ফ্লেভার, রোল, ফয়েল প্যাকেটসহ বিভিন্ন মালামাল ছিল। আগুন লাগার পর কত শ্রমিক আটকা পড়েছেন, তা তারা জানেন না। তিনি বলেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত। ভবন থেকে লাশ উদ্ধার করে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে মো. আবদুল জলিল ও মো. আবু সামাদ নামের দুজন শ্রমিক জানিয়েছেন, আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবনটিতে ১০০০-১২০০ শ্রমিক কাজ করতেন।
এদিকে জ্বলতে থাকা কারখানা ভবনের গেটের বাইরে উদ্বিগ্ন স্বজনদের অনেককে আহাজারি করতে দেখা যায়। ইয়াসিন রিপন নামে এক শ্রমিকের মা নাজমা বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, ‘কোনো বিচার নাই, কোনো বিচার নাই গো। আমি কারো কাছে হাত পাতি নাই, ছেলেরে এসএসসি পাস করাইছি। আমার বাবার কোনো খবর নাই গো।’ নাজমা জানান, তার ছেলে ওই কারখানার চতুর্থ তলায় চকলট কারখানায় কাজ করতেন। আগুন লাগার পর তিনি আর বের হতে পারেননি।

সজীব গ্রুপের হাসেম ফুডস কারখানায় আগুন লাগার সময় কতজন ছিল, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো ভাষ্য পাওয়া যায়নি। বৃহস্পতিবার রাতে মৃত দুই নারীর পরিচয় জানান নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম। তারা হলেন- সিলেট জেলার যতি সরকারের স্ত্রী স্বপ্না রানী (৩৪) এবং রূপগঞ্জের গোলাকান্দাইল নতুন বাজার এলাকার হারুন মিয়ার স্ত্রী মিনা আক্তার (৩৩)। এছাড়া রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনার পর আরেকজনের মৃত্যু হয়। তার নাম মোরসালিন (২৮) বলে জানিয়েছেন মেডিকেল পুলিশ ফাড়ির পরিদর্শক মো. বাচ্চু মিয়া। মোরসালিনের বাড়ি দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার উত্তর সুবেদপুর গ্রামে। বাবার নাম আনিসুর রহমান। এক ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি বড় ছিলেন। আগুনে দগ্ধ ও ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আহত স্বপ্না, মানিক, আশরাফুল, সুমন, সজিব, মেহেদী, মুন্না, মাজেদা, রুমা, মনোয়ারা, নাদিয়া, আছমা, মারিয়া, রুজিনা, সুমা, শফিকুল, সুফিয়া, সুজিদা, পারুল, রওশন আরা, শ্যামলাকে রূপগঞ্জের কর্ণগোপ ইউএস-বাংলা হাসপাতালে পাঠানো হয়। এছাড়া নাহিদ, মঞ্জুরুল ইসলাম, মহসীন হোসেন, আবু বকর সিদ্দিক, আমেনা বেগম ও ফাতেমা আক্তার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। পরিদর্শক মো. বাচ্চু মিয়া বলেন, নারায়ণগঞ্জ থেকে ছয়জনকে আনা হয়, তাদের মধ্যে তিনজনের ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট হওয়ায় বার্ন ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে। আহত আবু বকর জানান, কারখানায় আগুন লাগার পর বাঁচার জন্য ভবন থেকে লাফ দিয়েছিলেন তিনি, তখনই আহত হন। আগুনে কারখানাটির বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল, উৎপাদিত পণ্য নষ্ট হয়েছে। তবে ক্ষতির পরিমাণ এখনও নিরুপণ করা যায়নি। আগুন কীভাবে লাগল- সে বিষয়েও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা কিছু বলতে পারেননি। কারখানার উপমহাব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন সাংবাদিকদের বলেন, গ্যাস লাইন লিকেজ কিংবা বিদ্যুতের শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *