নবর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ।
নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এই শুভ মুহূর্তে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় স্নাত হয়ে সকলকে নিয়ে বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের একটি সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই।’
বুধবার (১৩ এপ্রিল) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পারস্পরিক সৌহার্দ্য আর ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আসুন বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করি। যেখানে বৈষম্য থাকবে না, মানুষে মানুষে থাকবে না কোনো ভেদাভেদ, থাকবে না ধর্মে ধর্মে কোনো বিভেদ।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সকল সংকীর্ণতা, কূপমণ্ডূকতা পরিহার করে উদারনৈতিক জীবনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পহেলা বৈশাখ আমাদের অনুপ্রাণিত করে। মনের ভেতরের সকল ক্লেদ, জীর্ণতা দূর করে আমাদের নতুন উদ্যমে বাঁচার শক্তি জোগায়, স্বপ্ন দেখায়। আমরা যে বাঙালি, বিশ্বের বুকে এক গর্বিত জাতি, পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণের মাধ্যমে আমাদের মধ্যে এই স্বাজাত্যবোধ এবং বাঙালিয়ানা নতুন করে প্রাণ পায়, উজ্জীবিত হয়।’
তিনি বলেন, আজ শুধু দেশে নয়, বিশ্বের যে প্রান্তেই বাঙালি তার বসবাস গড়ে তুলেছেন সেখানেই বাঙালির হাজার বছরের লোক-সংস্কৃতিকে বয়ে নিয়ে গেছেন এবং যাচ্ছেন। বর্ষবরণসহ নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তারা জানান দেন তারা বাঙালি। আর এর মাধ্যমেই পৃথিবী জুড়ে তৈরি হচ্ছে বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে অন্য সংস্কৃতির সেতুবন্ধ।
করোনাভাইরাসের কারণে বিগত দুই বছর জনসমাগম করে উন্মুক্ত স্থানে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানমালা করা যায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বছর বহিরাঙ্গনে সীমিত আকারে অনুষ্ঠানের আয়োজন হলেও করোনাভাইরাস একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। নতুনরূপে করোনাভাইরাস আবার যেকোনো সময় যেকোনো দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই সকলকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এসব অনুষ্ঠানে যোগদানের আহ্বান জানান তিনি।
সরকার যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ টিকা পাওয়ার যোগ্য মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছে। টিকা প্রদান অব্যাহত রয়েছে। দ্বিতীয় ডোজের পর এখন বুস্টার ডোজ দেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মহামারিজনিত ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকার সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত আমরা ২৮টি প্যাকেজের মাধ্যমে এক লাখ ৮৭ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছি। এতে প্রায় ছয় কোটি ৭৪ লাখ মানুষ উপকৃত হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠান উপকৃত হয়েছে প্রায় এক লাখ ১৮ হাজার।’
দ্রব্যমূল্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘করোনাভাইরাসের মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং এই যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে পণ্যের দামে অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আন্তর্জাতিকভাবে পণ্য পরিবহনেও ভাড়া ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে আমাদের দেশেও কিছু কিছু পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা কিন্তু চুপচাপ বসে নেই। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি সাধারণ মানুষের জীবনযাপনে স্বস্তি নিয়ে আসার।’
তিনি বলেন, ‘চলতি পবিত্র রমজান মাসে আমরা টিসিবির মাধ্যমে ভর্তুকি দিয়ে প্রায় এক কোটি পরিবারকে কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাশ্রয়ী দামে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছি। ঢাকায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রতিদিন ১৫টি ফ্রিজার ভ্যানে করে সাশ্রয়ী দামে মাংস, ডিম এবং দুধ বিক্রির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম ইতিমধ্যে কমে স্বাভাকিক পর্যায়ে এসেছে। এ ছাড়া সরকার আসন্ন ঈদ উপলক্ষে এক কোটি ৩৩ হাজার ৫৪টি ভিজিএফ কার্ডের বিপরীতে এক লাখ ৩৩০ মেট্রিক টনের বেশি চালের বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাসের মহামারির সময়ও ২০২০-২১ অর্থবছরে আমাদের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬.৯৪ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত অর্থবছর রেকর্ড ২৪.৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। এ বছরও আশানুরূপ রেমিট্যান্স আসছে। গত বছর রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৪.২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে রপ্তানি আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩৮.৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।’
শেখ হাসিনা দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এ বছর রপ্তানি আয়ে বাংলাদেশ নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করবে ইনশাআল্লাহ।
আমাদের অর্থনীতির মূল শক্তি কৃষি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমাদের সরকারের কৃষিবান্ধব নীতির ফলে চাল, শাকসবজি, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ উৎপাদনে আমরা এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ।’ কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে চলতি বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন আশা করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।





