দুই লাখ কোটি টাকা ঋণ খেলাপিদের কব্জায় !
ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক থেকে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় হলমার্ক গ্রুপ। সেই টাকা আদায়ে ২০১২ সালে আদালতে মামলা করে ব্যাংক। কিন্তু দীর্ঘ ৮ বছরেও টাকা আদায়ের কোনো পথ মেলেনি। এভাবে ঋণখেলাপিদের পকেট থেকে পাওনা টাকা বের করতে মামলা করে আদালতে ঘুরছে ব্যাংকগুলো। আড়াই লাখেরও বেশি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন। মামলাগুলোর বিপরীতে ব্যাংকগুলোর পাওনা প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। ব্যাংকাররা বলছেন, বিচারের দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিচ্ছেন অনেক ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। অনেক গ্রাহক ইচ্ছা করেই মামলায় জড়াতে চান। তাই ব্যাংকের টাকা আদায়ে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, আদালতে মামলার পর তা দীর্ঘ সময়ের জন্য ঝুলে যায়। আবার যা দুয়েকটি মামলার রায় হয় তার থেকেও আদায় অনেক কম হয়। বিচারিক প্রক্রিয়ায় গিয়ে ব্যাংক তার অর্থ আদায় নিশ্চিত করতে পারছে না। বরং ঋণখেলাপিরা টালবাহানার
সুযোগ পাচ্ছে। ব্যাংকারদের দাবি, অর্থঋণ আদালতে বিচারক বাড়িয়ে এবং উচ্চ আদালতে পৃথক বেঞ্চ গঠন করে খেলাপিদের বিরুদ্ধে দায়ের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো ২৫ হাজার কোটি টাকা আদায়ে ৬ হাজার ৭৩৫টি নতুন মামলা করেছে। এই সময়ে আগের মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১০ হাজার ৩০৪টি। তবে এসব মামলায় ব্যাংক ৭ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা দাবি করে মামলা করলেও আদায় করতে পেরেছে মাত্র ৫০১ কোটি টাকা, যা মোট দাবির মাত্র সাড়ে ৬ শতাংশ।
ব্যাংকগুলো এ পর্যন্ত ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে ২ লাখ ৭২ হাজার ৮১৬ কোটি টাকা আদায়ের জন্য ১২ লাখ ২০ হাজার ৯২৫টি মামলা করেছে। গত জুন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে ৯ লাখ ৭০ হাজার ২৮৮টি মামলা। ওই মামলাগুলোর বিপরীতে ব্যাংকের ৮২ হাজার কোটি টাকার দাবি থাকলেও নিষ্পত্তির পর আদায় হয়েছে মাত্র ২৮ হাজার কোটি টাকা।
চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বিচারাধীন মামলা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার ৬৩৭টি। এই মামলাগুলোর বিপরীতে ব্যাংকের দাবি এক লাখ ৯০ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা। বিচারাধীন মামলাগুলো থেকে গত ৬ মাসে ব্যাংক আদায় করতে পেরেছে মাত্র ৪ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিচারাধীন মামলা থেকে ব্যাংকগুলোর আদায় হয় ৪ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা। ওই সময়ে এক লাখ ৭৩ হাজার ৩০২ কোটি টাকা আদায়ে ২ লাখ ৫৪ হাজার ২০৬টি মামলা বিচারাধীন ছিল।
বিচারাধীন মামলায় সবচেয়ে বেশি অর্থ আটকে আছে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর। সরকারি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ৯ ব্যাংকের ১ লাখ ৮১ হাজার মামলায় আটকে আছে ৯৪ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। আর বেসরকারি খাতের ৪১ ব্যাংকের ৬০ হাজার মামলায় আটকে আছে ৯২ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা। আর বিদেশি ব্যাংকগুলোর ৯ হাজার ২৪৪টি বিচারাধীন মামলায় আটকে আছে ৩ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, অর্থঋণ আদালতে ব্যাংকগুলোর এত পরিমাণ মামলা যে সেগুলো নিয়ে বিচারকরাও খুব ব্যস্ত থাকেন। অন্যদিকে রিট সংক্রান্ত ঝামেলা তা আছেই। সরকারের উচিত হাইকোর্টের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক প্রেসিডেন্ট ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতায় খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে বিলম্ব হচ্ছে। একবার মামলা করার পর বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে আর সেই টাকা আদায় হচ্ছে না। কিন্তু মামলা নিষ্পত্তি হতে অনেক সময় লেগে যাচ্ছে। অর্থঋণ আদালতে পর্যাপ্ত সংখ্যক বিচারক নিয়োগের জন্য আমরা দাবি জানিয়ে আসছি। তিনি আরও বলেন, রিট আবেদনকেও খেলাপি ঋণ আদায়ে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে মনে হয়। সব কিছু মিলিয়ে মামলা নিষ্পত্তির পুরো প্রক্রিয়াটাই সহজ ও দ্রুততর করতে হবে। আদালত খেলাপিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে অন্য খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা অসম্ভব হয়ে পরবে।





