গ্রামভিত্তিক প্রত্যাবাসনে রাজি নয় মিয়ানমারের।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ভিন্ন ভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে। বাংলাদেশ চাইছে গ্রাম বা অঞ্চলভিত্তিক প্রত্যাবাসন। অন্যদিকে মিয়ানমার বলছে, এখন পর্যন্ত যতজনকে তারা যাচাই-বাছাই করেছে সেটি দিয়ে প্রত্যাবাসন শুরু করতে। বিষয়টি সমাধানের জন্য চীন মিয়ানমারকে প্রভাবিত করে কিনা তার ওপর বাংলাদেশ অনেকাংশ নির্ভর করছে। প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য মিয়ানমার আরও সময় চাচ্ছে। আগামী জুনের মধ্যেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে চায় বাংলাদেশ। তবে এক্ষেত্রে আগের দুই ব্যর্থ প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাখাইন পরিস্থিতি সম্পর্কে রোহিঙ্গাদের আস্থায় নিয়ে অগ্রসর হতে চায় সরকার।
গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের মধ্যে দেড় ঘণ্টা ব্যাপী বৈঠক হয়। পরে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, মিয়ানমার যেটা বলেছে, যে সংখ্যাটি (৪২ হাজার) তারা যাচাই বাছাই করেছে, সেটি দিয়ে শুরু করা যায় কিনা। আমাকে দুই-তিনবার বলতে হয়েছে সংখ্যাটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পরস্পর পরস্পরকে চেনে বা একই গ্রাম বা একই এলাকা থেকে এসেছে এমন লোকদের একসঙ্গে পাঠানো, যাতে করে তারা যেতে উৎসাহ বোধ করে। দুটি বা তিনটি গ্রামের রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করে পাঠানোটা আরও বেশি বাস্তবসম্মত হবে।
আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ক বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের ত্রিপক্ষীয় ফোরামের মহাপরিচালক পর্যায়ের যৌথ কার্যকরী গ্রুপের (জেডব্লিউজি) বৈঠক এবং শেষ সপ্তাহে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এরপর সুবিধাজনক সময়ে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের আয়োজন করা হবে।
গতকাল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ক ত্রিপক্ষীয় ভার্চুয়াল বৈঠকে এ সব বিষয়ে আলোচনা হয়। এতে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি মিনিস্টার হু ডু সান। আর চীনের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাইস মিনিস্টার লিও জাওহু। দুপুর ২টা থেকে শুরু হওয়া বৈঠক চলেছে প্রায় দেড় ঘন্টা।
বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের দেয়া ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, মিয়ানমার যেহেতু আগে থেকে একটি অবস্থান নিয়েছে, সেজন্য তারা সঙ্গে সঙ্গে এটি মেনে নেয়নি। তবে তারা এটি বিবেচনায় নেবে এবং আমরা আশা করছি যে ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে এগুলো সমাধান করতে পারবো।
বেইজিং এর মনোভাব বিষয়ে তিনি বলেন, চীন মনে হলো আমাদের এই প্রস্তাবের কারণটা ধরতে পেরেছে। তিনি বলেন, চীনের আগ্রহ ছিল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মাধ্যমে প্রত্যাবাসন যেন এগিয়ে যায় এবং আমরা সরল বিশ্বাসে তাদের সঙ্গে গিয়েছি। আমার তো মনে হয় তাদের যথেষ্ট উদ্যোগ আছে। একটি শক্তিধর দেশ হিসাবে চীনের আত্মপ্রকাশ ঘটছে এবং সেক্ষেত্রে একটি ফলাফল দেখানোটা তাদের ক্রেডিবিলিটির জন্য দরকার। তাদের নিজেদের তাগিদে তারা চেষ্টা করবে এই সমস্যার সমাধান দ্রুত হয়ে যায়। এছাড়া অর্থনৈতিক ও অন্যান্য বিষয় তো আছেই।’
তবে তিনি বলেন, প্রত্যাবাসন একটি প্রক্রিয়া এবং এর প্রক্রিয়ায় অন্য দেশগুলো যদি অংশগ্রহণ করে তবে সেটিকে আমরা স্বাগত জানাবো।
তিনি বলেন, তাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে তারা আলোচনা করতে চায়। আন্তর্জাতিক চাপের কারণে মিয়ানমারের যদি ন্যূনতম রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে তবে প্রত্যাবাসন সম্ভব। তাছাড়া চীনেরও একটি ইচ্ছা আছে। কয়েকদিন আগে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমার ঘুরে গেলেন এবং তাদের মধ্যে নিশ্চয় বিষয়গুলো আলোচনা হচ্ছে। সুতরাং কিছুটা নমনীয়তা দেখাবে বলে মনে হয়।
দুই দেশের ডিজিদের মধ্যে একটা হটলাইন চালু হবে জানিয়ে তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব এটা হবে। যাতে করে যে কোনো ধরনের ছোটোখাটো চ্যালেঞ্জ থাকলে, তারা নিজেরা কথা বলে ঠিক করে নিতে পারবে।
অন্যান্য দেশকে এই প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত করাটাকে চীন ভালোভাবে নেবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অবস্থান চীনকে জানানো হয়েছে যাতে করে তারা বিব্রত না হয়। তিনি বলেন, প্রত্যাবাসন শুরু হলে চীন যেহেতু এই প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে সুতরাং তাদের শারীরিক উপস্থিতি থাকলে ভালো হবে। তবে আমরা চাইবো এটি যদি আরও বড় হয় অর্থাৎ চীনের পাশাপাশি জাপান, ভারত, আসিয়ান, জাতিসংঘ এই প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত হয় তাহলে তারাও সহযোগিতা করতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই গঠনমূলক অংশগ্রহণে তারা আপত্তি জানায়নি।





