দেশের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি !
বেড়েই চলেছে যমুনা নদীর পানি। এই নদীর ৯ পয়েন্টের পানি এখন বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। এছাড়া আগামী ৪৮ ঘণ্টায় এই নদীসহ বাড়তে পারে ব্রহ্মপুত্র নদ ও গঙ্গা নদীর পানিও। এতে করে আরও কিছু এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় ১১ জেলার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, আগামী ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, পাবনা মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী , ফরিদপুর ও শরীয়তপুর জেলার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হতে পারে। বাড়তে পারে ব্রহ্মপুত্র নদ, যমুনা ও পদ্মা নদীর পানি। পদ্মা নদীর ভাগ্যকুল ও মাওয়া পয়েন্টের পানি আগামী ২৪ ঘণ্টায় বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। তবে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদীগুলোর পানি কমছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র আরও জানায়, যমুনা নদীর নয় পয়েন্টের পানি এখন বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এই নদীর মথুরা পয়েন্টের পানি ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই নদীর আরিচা পয়েন্টের পানি ১৬, বাহাদুরাবাদ পয়েন্টের পানি ৪৪, সারিয়াকান্দি পয়েন্টে ৫২, কাজিপুর পয়েন্টে ৫২, ফুলছড়ি পয়েন্টে ৩৯, সিরাজগঞ্জ পয়েন্টের পানি ৫১, পোড়াবাড়ি পয়েন্টে ১৫, সাঘাটা পয়েন্টে ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। এদিকে পদ্মা নদীর গোয়ালন্দ পয়েন্টের পানি বিপৎসীমার ৫২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে আত্রাণ নদীর বাঘাবাড়ি পয়েন্টের পানি এখন বিপৎসীমার ৪৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। ধলেশ্বরী নদীর এলাসিন পয়েন্টের পানি বিপৎসীমার ৫৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে ধরলা নদীর কুড়িগ্রাম পয়েন্টের পানি ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে এখন। নতুন করে ঘাগট নদীর গাইবান্ধা পয়েন্টে সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের স্টেশনগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে ছাতক স্টেশনে ১০০ মিলিমিটার। এছাড়া চট্টগ্রামে ৫০, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৬৫ এবং বান্দরবনে ৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে উজানে ভারতের স্টেশনগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে আইজলে ৭৭ মিলিমিটার। এছাড়া কৈলাশহরে ৫৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।
এদিকে দেশের বিভিন্নস্থানে পানিবন্দী মানুষ অর্ধাহারে অনাহারে দিনাতিপাত করছেন। নদী ভাঙনে বাস্তুভিটা হারানোর ভয়ে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।
রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিস্তা নদীতে সরকারের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই তীব্র ভাঙনের শিকার হয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে কয়েকশত পরিবারের মানুষ। গত ৩ মাস ধরে অব্যাহত তীব্র নদী ভাঙনে কুড়িগ্রামের রাজারহাটের ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের গতিয়াশাম, চরগতিয়াশাম ও বগুড়াপাড়া গ্রামে সহস্রাাধিক সহ দুই ইউনিয়নের ১০ গ্রামে সহস্রাধিক পরিবারের মানুষ বাস্তুভিটা হারিয়েছেন। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড(পাউবো) ওই ভাঙন কবলিত এলাকায় দায়সাড়া কাজ করায় এলাকাবাসীরা পাউবোর কর্মকর্তাদের মারধরের হুমকী দেয়ায় অভিযোগ এনে ভাঙন প্রতিরোধে গতিয়াশাম এলাকায় কাজ বন্ধ রেখেছে পাউবো কর্তৃপক্ষ।
নদী ভাঙন প্রবণ এলাকা ঘড়িয়ালডাঙ্গা ও বিদ্যানন্দ ইউনিয়নে নদী ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের খিতাবখাঁ, বুড়িরহাট, গতিয়াশাম, চরগতিয়াশাম, শরিষাবাড়ি বগুড়াপাড়া এবং বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের রামহরি, কালির মেলা, চতুরা, গাবুর হেলান, রতি, তৈয়বখাঁ, চর বিদানন্দসহ ১০টি গ্রামের বিভিন্ন স্থানে সহস্রাধিক মানুষ বাস্তুভিটা হারিয়েছেন। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে গতিয়াশাম, চরগতিয়াশাম ও বগুড়াপাড়া গ্রামে নদী গর্ভে ৫শতাধিক মানুষের বসত ভিটা, দুই শতাধিক একর ফসলি জমি, আড়াই কিলোমিটার রাস্তা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অব্যাহত ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটছে নদী পাড়ের মানুষজন। তারা নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।
এছাড়া তীব্র ভাঙনের কারণে হুমকীর সম্মুখীন হয়ে পড়েছে তৈয়বখাঁ বাজার, কালিরহাট বাজার, বুড়িরহাট বাজার, তৈয়বখাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ২০টি প্রতিষ্ঠান ও ফসলী জমি। দিনের পর দিন ভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে জনশুন্য দু’টি ইউনিয়নের মানচিত্র। বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চতুরা এলাকার হরিপদ, বাসন্তি, আঃ সালাম, আলফাজ উদ্দিনসহ অনেকে বলেন, দ্রুত ব্যবস্থা না হলে যেকোন মুহূর্তে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে এসব প্রতিষ্ঠান। ভাঙন আতঙ্কে অনেকে গ্রাম ছেড়েও চলে যাচ্ছেন অন্যত্র।
এদিকে ভাঙনের শিকার পরিবারগুলো খোলা আকাশের নীচে মানবেতর দিনাতিপাত করলেও এখন পর্যন্ত তারা স্থায়ী বসবাসের জন্য সরকারি কিংবা বেসরকারি কোন সাহায্য-সহযোগিতা পাননি। চরগতিয়াশাম বগুড়াপাড়া গ্রামে দেখা যায়, ওই গ্রামের মানিক মিয়া (৬৫) এর আধাপাকা বিল্ডিং বাড়িটি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। মানিক মিয়া বলেন, মনে করছিলাম সরকার নদী ভাঙনে বিশাল পদক্ষেপ নিয়েছে। নদী আর এদিকে আসবে না। তাই কয়েক লাখ টাকা ব্যয়ে বাড়ি করছিলাম, তাও চলে গেল। আমাদের আর কোথাও যাওয়ার পথ নেই।
এলাকার মানুষ জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড নদী থেকে বালু তুলে ভর্তি করে কোন রকমে কাজ করে প্রজেক্ট দেখে সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। মানসম্মত কাজ করলে এতো মানুষ আজ ভিটে মাটি হারা হতো না। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তাদের হুমকীর বিষয়টি ভিত্তিহীন।
এব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরে তাসনিম জানান, ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ১ লক্ষ টাকা ও ১ মেট্রিক টন চাউল বরাদ্দ পেয়েছি, তালিকা হচ্ছে, দু-একদিনের মধ্যে দেয়া হবে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড(পাউবো) এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান বলেন, গতিয়াশাম, চরগতিয়াশাম গ্রামে গত জুলাই মাসে টানা ৫দিন ভাঙন প্রতিরোধে কাজ করার পর ওই এলাকার লোকজন পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকদের বেঁধে মারধরের হুমকী দেয়ায় পড়ে কাজ বন্ধ রয়েছে।
টাঙ্গাইলের বাসাইলে কাঞ্চনপুর কর্মকার পাড়া হাট খোলা ব্রিজ পানি স্রোতে ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ব্রিজটি ভেঙে নতুন করে বাসাইল উপজেলার দক্ষিণাঞ্চলের অন্তত ১০ গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে ফসলি জমি ও মাছের ঘের। বুধবার সকালে বাসাইল-কাঞ্চনপুর ইউনিয়ন পরিষদের যাওয়ার সড়কের কাঞ্চনপুর হাটখোলা ব্রিজ পড়ে যায়।
এই সড়ক দিয়ে বাসাইল উপজেলার কাঞ্চনপুর, দক্ষিণ পাড়া, হাবলা, মির্জপুর উপজেলার কুর্নী, ফতেপুর, পাটখাগুড়ী, মহেড়া, ভাতকুড়া, আদাবাড়ি এবং দেলদুয়ার উপজেলার নাটিয়াপাড়া, বর্নীসহ বিভিন্ন গ্রামের মানুষ বাসাইল উপজেলার যোগাযোগ করে। ব্রিজটি ভেঙে যাওয়ায় এসব এলাকার মানুষের বাসাইল সদরের যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেছে। এই ব্রিজটি ভেঙে উপজেলার কাঞ্চনপুর তারবাড়ি সহ অন্তত ১০টি গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় এক শত পরিবার।
এ বিষয়ে সিএনজি চালক রাসেল বলেন, এই সড়ক ব্যবহার করে আমরা গাড়ি চালাই। ব্রিজটি ভেঙে যাওয়ায় সড়ক পথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় আমরাও গাড়ি চালাতে পারছি না।
পথচারী হালিম মিয়া বলেন, ব্রিজটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই স্থানে দ্রুত একটি বেইলি সেতু স্থাপন করলে সড়কটি ব্যবহারকারীদের জন্য মঙ্গল হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর হোসেন বলেন, খবর পেয়ে দ্রুত ভাঙ্গন কবলিত সড়কটি পরিদর্শন শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢল আর ভারি বৃষ্টিতে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সিরাজগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি শাহজাদপুরের কৈজুরী ও জামিরতা পয়েন্টে ১২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে যমুনা, করতোয়া, বড়াল নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় প্লাবিত হয়েছে শাহজাদপুরের বিস্তীর্ণ জনপদ। এতে পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট। তলিয়ে গেছে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ, রাস্তাঘাট, বিস্তীর্ণ রোপা আমনের খেত।
ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষ। শাহজাদপুর উপজেলার পাকুরতলা, ভেকা ও পাচিল গ্রামে যমুনা নদী ভয়াবহ ভাঙন শুরু করেছে। ভাঙনে ইতিমধ্যেই বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে হাট-বাজার, স্কুল-মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ভাঙন কবলিত এলাকায় ঘরবাড়ি, গাছপালা সরিয়ে নিচ্ছে ক্ষতিগ্রস্তরা। ভাঙন রোধে কাজ শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সব হারানো মানুষেরা। ফলে ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে যমুনা তীরবর্তী পাকুরতলা, ব্রাক্ষনগ্রাম, ভেকা ও পাচিল গ্রামের হাজারও মানুষ।
চলতি বছর বন্যার শুরু থেকেই ভাঙন শুরু করে যমুনা। মাঝখানে কিছুদিন বিরতি দিয়ে গত কয়েকদিন ধরে যমুনা নদীতে বন্যার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় প্রবল স্রোতের তোপে এ ভাঙন নতুন করে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বন্যার পানিতে টিউবওয়েল ডুবে যাওয়ায় অনেক স্থানে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় সরকারি ত্রাণ সহায়াতা পৌঁছলেও উপজেলার সিংহভাগ বন্যা কবলিত গ্রামের পানিবন্দী অসহায় মানুষদের কাছে এখনো কোন ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছায়নি। গো-চারণভূমি পানিতে ডুবে যাওয়ায় অনেক জায়গায় গবাদিপশুর খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে।
এ ব্যাপারে শাহজাদপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ইতোমধ্যেই বন্যার্তদের মাঝে জি আর চাউল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া আমাদের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণের চাল মজুত রয়েছে। পর্যায়ক্রমে মজুতকৃত চাল পানিবন্দীদের মাঝে বিতরণ করা হবে।
তথ্যসূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম।





