#দেশের খবর

দুদুকও প্রশ্ন করতে পারবেনা : এনবিআর চেয়ারম্যান।

সিনিয়র সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম গত ৬ জানুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।

কোনো ধরনের প্রশ্ন ছাড়াই অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুদকও প্রশ্ন করতে পারবে না। করোনা ভাইরাসে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সবকিছু বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে সম্প্রতি নিবন্ধিত কোম্পানির আয়কর ফাঁকি বন্ধে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।

গতকালও ভ্যাট ফাঁকি রোধে চালু করা হয়েছে ইলেক্ট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি)। এনবিআরের প্রধান কার্যালয়ে ডিজিটাল পদ্ধতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সারা দেশে ১০০টি মেশিনের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন এনবিআর চেয়ারম্যান। ভোক্তাদের আগ্রহী করার জন্য লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। করোনা মোকাবিলা করেই তিনি এগিয়ে যেতে চান।

তিনি বলেন, আগামী জুনে সারা দেশে এক লাখ মেশিন বসানো হবে। মুজিববর্ষের কর্মসূচির অংশ বিশেষ পাইলট বেসিসে তা চালু করা হলো। ভ্যাট আদায়ে অনিয়ম বন্ধ করার জন্যই এই উদ্যোগ। তাতে ব্যবসায়ী, ভোক্তা ও সরকার উপকৃত হবে।

অনিয়ম বন্ধে ইসিআর থেকে ইএফডির যুগে প্রবেশ : রাজস্ব আদায়ে আগে ম্যানুয়াল পদ্ধতির পরিবর্তে এনবিআর ২০১২ সালে ইলেক্ট্রনিক ক্যাশ রেজিস্ট্রারের (ইসিআর) ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এনবিআর। কিন্তু নানা কারণে এর সুফল পায়নি এনবিআর।

কারণ এটা প্রতিষ্ঠানের সার্ভারের সাথে যুক্ত ছিলো না। অটো মনিটরিংয়ের কোনো ব্যবস্থা ছিলো না। তাই উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগ করে বিভিন্নভাবে পর্যালোচনা করে ইসিআরের পরিবর্তে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গতকাল চালু করা হলো ইএফডি বলে জানান চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, নতুন আইনে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আদায়ের জন্য ইএফডি মেশিন আগে বসানোর কথা থাকলেও করোনার কারণে তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কারণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে নিয়েই এর কাজ।

করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ায় অবশেষে দোকানে দোকানে ইএফডি বসানোর কাজ উদ্বোধন করা হলো। ভ্যাটের অনিয়ম বন্ধ করতেই ইএফডি চালু করা হচ্ছে। এটা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে।

এর ফলে কথিত হয়রানি দূর হবে এবং রাজস্ব আহরণের ব্যয় ও ব্যবসায়িক খরচ কমবে। কর পরিহারের সুযোগ থাকবে না। রাজস্ব আদায়ে গতি আশার পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অটোমেশনের আওতায় আসবে।

এ মেশিনে ক্রেতাদের কাছ থেকে ব্যাপক সারা পাওয়া যাবে বলে জানান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম। তিনি বলেন, এই উদ্যোগের সুফল নিশ্চিত করবো। আস্থার জায়গা তৈরি করতে পারবো। এতে শুধু সরকারই লাভবান হবে তা না, ভোক্তারাও বুঝতে পারবেন তাদের প্রদান করা ভ্যাট সাথে সাথে সরকারের হিসাবে জমা হয়ে যাবে।

সেভাবেই সার্ভার যুক্ত করা হয়েছে। ভ্যাটে অনিয়ম বন্ধে তদারকি করার জন্য ভিজিলেন্স টিম গঠন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১০০ মেশিন বসানো হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে আগামী তিন মাসের মধ্যে এক হাজার এবং আগামী জুনের মধ্যে সারা দেশে এক লাখ ইএফডি মেশিন বসানো হবে। এক লাখ মেশিন কেনার নীতিগত অনুমোদনও দেয়া হয় ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার কমিটির বৈঠকে।

ভ্যাটদাতাদের (ভোক্তা) পুরস্কৃত করার বিষয়টি উল্লেখ করে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ভোক্তার টেলিফোন নম্বর আমাদের কাছে সংরক্ষিত থাকবে। নির্দিষ্ট সময় শেষে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত ভোক্তাকে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেয়া হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকায় ৮০টি এবং চট্টগ্রামে ২০টি ইএফডি মেশিন স্থাপন করা হয়েছে।

ইএফডি হলো আধুনিক হিসাবযন্ত্র। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দৈনিক লেনদেনের তথ্য তদারকিতে রাজস্ব বোর্ডের সার্ভারের সঙ্গে সফটওয়্যারের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকবে ইএফডি মেশিন। সার্ভার ইতোমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে।

মূলত হোটেল, রেস্তোরাঁ, ডিপার্টমেন্টাল স্টোরসহ সেবা খাতের লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে ভ্যাটের হালনাগাদ তথ্য পেতে ইএফডি মেশিন বসানো হচ্ছে। ২৫ সেবা খাতে ইএফডি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের এ মেশিন ব্যবহারে উৎসাহিত করতে প্রথম পর্যায়ে বিনামূল্যে দেয়া হবে। শুরুতে এটি ব্যবহারে তাদের অভ্যস্ত করার চেষ্টা করা হবে। পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফল হলে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে চালু করা হবে।

অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করা যাবে কিনা : দীর্ঘদিন থেকে আবাসন ব্যবসায়ীদের দাবি ছিলো অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগ করলে অর্থপাচার কমে যাবে। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সরকার বিনিয়োগের সুযোগ দিলেও প্রশ্ন করার সুযোগ ছিলো।

তাতে সাড়া মেলেনি। এনবিআরের কথা আমলে নিয়ে আইন করে প্রশ্ন করার সুযোগ বাতিল করেছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান প্রশ্ন করতে পারবে না।

তিনি বলেন, আমরা সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা কথা দিয়েছে এ বিষয়ে প্রশ্ন করবে না। এমনকি দুদকও প্রশ্ন করতে পারবে না। তাদের ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে, ভুলক্রমে হয়তো কেউ আয় দেখাতে পারেনি। তাই তাকে সুযোগ দিতে হবে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান এ ধরনের প্রশ্ন তোলে, সেটা অন্যায় হবে, অনুচিত হবে। তবে এক্ষেত্রে কেউ চাইলে আইনের আশ্রয় নিতে পারবে।

কারণ সরকার আইন করে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করতে বলেছে। তবে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নানাবিধ কারণে এ উদ্যোগ নেয়া হলেও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। তবে পুঁজিবাজারে এর প্রভাব পড়েছে। পুঁজিবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের ফলে ক্যাশ ফ্লো বেড়েছে বলে জানান সিরাজগঞ্জের এই কৃতি সন্তান।

করোনাভীতি অতিক্রম করা যাবে : চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে বাজেটে রাজস্ব আদায়ের টার্গেট তিন লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে আদায় তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে। তা অর্জন করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন চেয়ারম্যান।

এক প্রশ্নের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যাবে। কারণ রপ্তানি ও রেমিটেন্স বেড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যও শুরু হয়েছে। করের নেট বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যারা এখনো কর, ভ্যাট ও আয়করের আওতায় আসেনি তাদের আনা হবে। এ মুহূর্তে জনবল না বাড়িয়ে বিদ্যমান জনবল দিয়ে রাজস্ব বাড়ানো হবে।

কোম্পানি আয়কর ফাঁকি বন্ধে ইতোমধ্যে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এতে প্রতিনিয়ত রাজস্ব বাড়ছে। সব পরিস্থিতি মোকাবিলা করে করোনাভীতি অতিক্রম করা যাবে বলে অভিমত প্রকাশ করেন ৩৪ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রশাসন ক্যাডারের এই সিনিয়র সচিব।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *