চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর অবস্থান।
চালের বাজারের অস্থিরতা কমাতে আরো কঠোর হচ্ছে সরকার। বাজার নিয়ন্ত্রণে খাদ্য মন্ত্রণালয়, খাদ্য অধিদপ্তর, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে সারা দেশে অবৈধ মজুদবিরোধী অভিযান চালানো হচ্ছে। এবার অবৈধভাবে চাল মজুদকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, দেশে চালের অভাব নেই। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী চালের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অবৈধ মজুদবিরোধী অভিযানের কারণে রাজধানীর পাইকারি বাজারে চালের দাম বস্তাপ্রতি অন্তত ১০০ টাকা কমেছে।
খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার গতকাল বৃহস্পতিবার সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে বলেন, ফুড গ্রেইন লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নে জোর দিতে হবে। কেউ যেন লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা না করতে পারে, অবৈধ মজুদ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। অবৈধ মজুদদারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে বিশেষ ক্ষমতা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
বোরো ধান সংগ্রহ ও বাজার মনিটরিং-সংক্রান্ত বিষয়ে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনলাইন মতবিনিময়ের সময় তিনি এসব কথা বলেন। খাদ্যমন্ত্রী বলেন, একটি মহল খাদ্য ঘাটতির বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। তবে বাংলাদেশে খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা নেই। মজুদদারির বিরুদ্ধে অভিযান চলছে—এ অভিযান আরো জোরালো হবে। তিনি আরো বলেন, বড় বড় করপোরেট হাউস ধান-চাল সংগ্রহ করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মিল না থাকলে তারা যেন এ ব্যবসায় যুক্ত না হতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে বাজারে নজরদারি বাড়াতে প্রশাসনকে নির্দেশনা দেন তিনি।
খাদ্যমন্ত্রী বলেন, বাজার অস্থির করতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে শুল্ক কমিয়ে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করা হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, দেশে চালের অভাব নেই। অসাধু ব্যবসায়ীরা চালের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। গতকাল সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। আগামীকাল ৪ জুন জাতীয় চা দিবস উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
মন্ত্রী বলেন, অনেক বড় ব্যাবসায়িক গ্রুপ খোলা চাল প্যাকেট করে বিক্রি করে। এ জন্য চালের দাম বেড়ে গেছে। আইন করে তাদের এসব কাজ বন্ধ করা যায় কি না তা নিয়ে চিন্তা করা হচ্ছে। মানুষ কিনছে বলেই করপোরেট ওই কম্পানিগুলো প্যাকেট করে চাল বিক্রি করছে।
মন্ত্রী বলেন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আগের চেয়ে বেড়েছে। এটাকে জোর করে বন্ধ করার উপায় নেই। তিনি আরো বলেন, যত দিন পর্যন্ত পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তত দিনই স্বল্প দামে এক কোটি মানুষকে পণ্য দেওয়া হবে। আগামী ১৫ জুন থেকে এক কোটি মানুষকে কম দামে পণ্য দেওয়া শুরু হবে।
অভিযান শুরুর পর রাজধানীর পাইকারি বাজারে চালের দাম কমতে শুরু করেছে। গতকাল রাজধানীর চালের পাইকারি বড় বাজার বাবুবাজারে সব ধরনের চাল প্রতি বস্তায় (৫০ কেজি) গত সপ্তাহের তুলনায় ১০০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে।
গতকাল এই বাজারে মোটা চাল (হাইব্রিড) বস্তাপ্রতি বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৯৫০ টাকায়। মোটা চালের মধ্যে পাইজাম ও ব্রি-২৮ চাল দুই হাজার ৩৫০ থেকে আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মিনিকেট নামের চাল প্রতি বস্তা বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার ১০০ থেকে তিন হাজার ২০০ টাকায়। আর নাজিরশাইল প্রতি বস্তা তিন হাজার ২৫০ থেকে তিন হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
জানতে চাইলে এই বাজারের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী ছলিম উল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, অভিযান শুরু করায় ভয়ে ব্যবসায়ীরা চাল কিনছেন না। যার কারণে পাইকারি বাজারে চালের বিক্রি কমে গেছে। গত সপ্তাহের তুলনায় ৫০ কেজির বস্তায় ১০০ টাকা করে দাম কমেছে।
পাইকারি বাজারে চালের দাম কমলেও এর সুফল পাচ্ছে না সাধারণ ক্রেতারা। রাজধানীর জোয়ারসাহারা বাজারের মেসার্স সিয়াম স্টোরের ব্যবসায়ী রমিজ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খুচরা বাজারে চালের দাম এখনো কমেনি। তবে শুনেছি পাইকারি বাজারে কিছুটা কমেছে। এখন মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৫২-৫৫ টাকায়, মিনিকেট ৬৮-৭০ টাকায়, নাজিরশাইল ৭৫-৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বাগেরহাট, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, নওগাঁ, রংপুরসহ ১৭ জেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালান। অভিযান চালিয়ে লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ, নিম্নমানের চাল মজুদ, লাইসেন্স না থাকাসহ বিভিন্ন কারণে চালের আড়ত, মিল ও দোকানিকে ১০ লাখ ১৬ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন। অন্যদিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ২৯টি টিম সারা দেশে অভিযান চালায়। তারা ৫৯টি প্রতিষ্ঠানকে সাত লাখ ৫৯ হাজার টাকা জরিমানা করে। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেট গতকাল দুপুরে রাজধানীর বাবুবাজারের চালের পাইকারি আড়তে এবং নবাব ইউসুফ আলী মার্কেটের খুচরা চালের দোকানে অভিযান চালান। সেখানে ট্রেড লাইসেন্স না থাকায় পাঁচটি দোকানকে ২৮ হাজার টাকা জরিমানা করেন।
সব মিলে গতকালের অভিযানে মোট ১৮ লাখ তিন হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
তথ্যসূত্র : কালের কণ্ঠ।





