#দেশের খবর

চলে গেলেন আল্লামা শফী।

দেশের শীর্ষ আলেমে দ্বীন, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর, চট্টগ্রামের হাটহাজারীর দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর (বড় মাদরাসা) সদ্য সাবেক মহাপরিচালক আল্লামা আহমদ শফী আর নেই।
(ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন )

শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে তাকে ঢাকার আজগর আলী হাসপাতালে আনা হলে সেখানে ৬ টা ২০ মিনিটে তিনি ইন্তিকাল করেন। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও তিন মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন রেখে গেছেন। তার দুই ছেলের মধ্যে আনাস মাদানি হেফাজতে ইসলামের প্রচার সম্পাদক। অন্যজন মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ পাখিয়ারটিলা কওমি মাদরাসার পরিচালক।

আল্লামা শফির ইন্তিকালে সারাদেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের এমপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা: শফিকুর রহমানসহ দেশের শীর্ষ উলামায়ে কেরাম গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

শতবর্ষী আল্লামা আহমদ শফী দীর্ঘদিন যাবৎ বার্ধক্যজনিত দুর্বলতার পাশাপাশি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। প্রবীণ আলেম ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। ফলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। গত কয়েক মাসে শরীরে নানা জটিলতা দেখা দিলে একাধিকবার চট্টগ্রাম ও ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয় বড় হুজুরখ্যাত আল্লামা শফীকে।
তার ইন্তিকালের খবর শুনার সাথে সাথে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মাদরাসার ছাত্র, শিক্ষকরা ছুটে আসেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম, বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এ সময় হাসপাতালে আসেন। রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে ভিড় বাড়তে থাকে। প্রিয় অভিভাবকের লাশ দেখার জন্য এ সময় অনেকে বিক্ষোভ করেন।

এর আগে হাটহাজারি মাদরাসায় ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে বৃহস্পতিবার রাতে মহাপরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। পরে বৃহস্পতিবার রাত ১টার দিকে হেফাজত আমীরকে অ্যাম্বুল্যান্সে করে হাটহাজারী মাদরাসা থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। সেখানে তিনি ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন। গতকাল শুক্রবার বিকালে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় আল্লামা আহমদ শফীকে হেলিকাপ্টারে করে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছিল। তাকে পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়ার ধূপখোলা মাঠের পাশে অবস্থিত আজগর আলী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ভর্তির কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

দেশের কওমি মাদরাসাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো এবং বড় মাদরাসা হিসেবে পরিচিত হাটহাজারী দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদরাসা। এই মাদরাসার মহাপরিচালক হিসেবে কওমি মাদরাসাগুলোর নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী। তিনি হেফজাতে ইসলামের আমীর ছাড়াও কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাক ও কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ছিলেন।

আল্লামা শফির ইন্তিকালে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মৃত্যুর সংবাদ মাদরাসায় পৌঁছালে ছাত্রশিক্ষকরা শোকাহত হয়ে পড়ে। অনেককে কান্না করতে দেখা যায় বলে প্রতক্ষ্যদর্শীরা জানান।
আল্লামা শাহ আহমদ শফি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও আমীর। তিনি একইসাথে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান। তিনি দারুল উলুম মুঈনুল ইসলামের হাটহাজারীর মহাপরিচালক ছিলেন। আল্লামা শাহ আহমদ শফি ১৯৩০ সালে চট্টগ্রামের রাংগুনিয়া উপজেলার পাখিয়ারটিলা গ্রামে জম্ম গ্রহণ করেন।তার পিতার নাম বরকম আলী ও মাতার নাম মেহেরুন্নেসা বেগম। তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় রাংগুনিয়ার সরফভাটা মাদরাসায়। এরপর পটিয়ায়র আল জামিয়াতুল আরাবিয়া মাদরাসায় (জিরি মাদরাসা) লেখাপড়া করেন। ১৯৪০ সালে তিনি হাটহাজারীর দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদরাসায় ভর্তি হন। ১৯৫০ সালে তিনি ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসায় যান, সেখানে চার বছর লেখাপড়া করেন। ১৯৮৬ সালে হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক পদে যোগ দেন আহমদ শফী।

অনৈসলামিক কর্মকান্ডবন্ধ ও ইসলামী প্রচারণার জন্য আল্লামা আহমদ শফি (দা.বা.) ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’ সংগঠনটি গঠন করেন। ইসলাম বিরোধী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের ১৩ দফা দাবীতে আন্দোলন করে হেফাজতে ইসলাম। সারাদেশের গণমানুষ এই আন্দোলনে অভুতপূর্ব সাড়া দেয়। ওই বছর ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্তরে হেফাজতের অবস্থান কর্মসূচিতে ব্যাপক হামলার ঘটনা ঘটে। রক্তাক্ত হয় শাপলা চত্তর।

সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম আহমদ শফী বাংলায় ১৩টি এবং উদুর্তে নয়টি বইয়ের রচয়িতা। উর্দু বই এর মধ্যে রয়েছে, ফয়জুল জারী (বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা), আল-বায়ানুল ফাসিল বাইয়ানুল হক্ব ওয়াল বাতিল, ইসলাম ও ছিয়াছাত, ইজহারে হাকিকাত। বাংলা বই এর মধ্যে রয়েছে, হক ও বাতিলের চিরন্তন দ্বন্দ্ব, ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা, ইসলাম ও রাজনীতি, সত্যের দিকে করুন আহ্বান, সুন্নাত ও বিদ’আতের সঠিক পরিচয়।

আল্লামা আহমদ শফীর জানাযা আজ শনিবার দুপুর দুইটায় চট্টগ্রামের আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসায় অনুষ্ঠিত হবে।
শুক্রবার রাতে গণমাধ্যমকে বিষয়টি জানিয়েছেন আল্লামা শফীর ছেলে ও হেফাজতের প্রচার সম্পাদক মাওলানা আনাস মাদানী। শুক্রবার রাত ৯টায় এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানিয়েছে হাটহাজারী মাদরাসার শূরা কমিটি।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *