#দেশের খবর

ইউনিয়ন ব্যাংকের ভল্ট থেকে ১৯ কোটি টাকা উধাও !

ইউনিয়ন ব্যাংকের ভল্ট থেকে ১৯ কেটি টাকা উধাও হওয়ার আর্থিক খাতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। এর আগে ভল্ট থেকে টাকা উধাও হলেও কোন বিচার হয়নি। কিন্তু ইউনিয়ন ব্যাংকের গুলশান শাখায় ভল্টের ১৯ কোটি টাকার গরমিলের ঘটনায় তার দায় স্বীকার করেছে কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় শাখার তিন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করেছে ব্যাংকটি। পাশাপাশি এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া এ ঘটনায় তাদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এর আগেও একাধিকবার ভল্ট থেকে টাকা উধাও হলেও কোন বিচার হয়নি। আর বিচার না হওয়ার কারণেই বার বার একই ঘটনা ঘটেছে। যতবারই এ ঘটনা ঘটেছে ততবারই তা ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। আর এবাবের ইউনিয়ন ব্যাকের ঘটনায় দায় স্বীকার করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ভেদ করে ব্যাংকের গুলশান শাখার ভল্ট থেকে টাকা উধাওয়ের ঘটনা তোলপাড় তৈরি করেছে। গত সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল এমন তথ্য উদঘাটন করার পর চাঞ্চল্য তৈরি হয়। জানা যায়, কাগজে-কলমে ওই শাখার ভল্টে ৩১ কোটি টাকা দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে ছিল ১২ কোটি টাকা। বাকি ১৯ কোটি টাকার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে শাখা কর্তৃপক্ষ কোনো জবাব দিতে পারেনি। এরপর বিষয়টি ধামাচাপা দিতে নানা তৎপরতা শুরু হয়।

এ নিয়ে ব্যাংকটির ডিএমডি হাসান ইকবাল বলেন, ব্যাংকিং আওয়ারের পর একজন ভিভিআইপি গ্রাহক আসেন, তাকে ভল্টের ওই টাকা দেয়া হয়েছিল। পরে সেই টাকা আবার সমন্বয় করা হয়। এ ঘটনায় গুলশান শাখার তিনজন কর্মকর্তাকে সাময়িক প্রত্যাহার করা হয়েছে। হাসান ইকবাল বলেন, সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দলের উপস্থিতিতে ১৯ কোটি টাকা সমন্বয় করা হয়। মূলত ব্যাংকিং সময়ের পর একজন ভিভিআইপি গ্রাহককে ওই টাকা দেয়া হয়েছিল। এটা ব্যাংকিং নিয়মবহির্ভূত হলেও এমন ঘটনা নতুন নয়। গ্রাহক-ব্যাংক সম্পর্কের ভিত্তিতে বিভিন্ন ব্যাংকে এমন লেনদেন হয়ে থাকে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি জানান, এই তিনজনের কাছে ভল্টের চাবি থাকে। এ ঘটনায় তিন থেকে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দলের উপস্থিতিতেই পরদিন ১৯ কোটি টাকার হিসাব সমন্বয় করা হয়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, একজন ভিআইপি গ্রাহক ব্যাংকিং আওয়ারের পর গেলে তার লেনদেন করতে ওই টাকা নেয়া হয়েছে। পরদিন সেই টাকা সমন্বয় করে ব্যাংকটি। তবে তাদের সান্ধ্যকালীন ব্যাংকিং না থাকার পরও ব্যাংকিং আওয়ারের পর লেনদেন আইনবহির্ভূত। এ বিষয়ে আমরা তাদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছি। পরে এ ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়া হবে বলে জানান তিনি।

ভল্টের ১৯ কোটি টাকা উধাওয়ের ঘটনায় ইউনিয়ন ব্যাংকের গুলশান শাখার তিন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া এই ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এই কমিটি বাংলাদেশ ব্যাংককে রিপোর্ট দেবে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির ডিএমডি হাসান ইকবাল। গতকাল বৃহস্পতিবার গুলশানে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের তিনি এ তথ্য জানান।

জানা গেছে, ওইদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি পরিদর্শক দল ইউনিয়ন ব্যাংকের গুলশান শাখা পরিদর্শনে যায়। সকাল ১০টার আগেই তারা শাখায় গিয়ে উপস্থিত হন। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী শুরুতেই ওই দল শাখাটির ভল্ট পরিদর্শন করে। কাগজে-কলমে শাখার ভল্টে ৩১ কোটি টাকা দেখানো হলেও সেখানে ১২ কোটি টাকা পায় পরিদর্শক দল। বাকি টাকার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা কোনো জবাব দিতে পারেননি। উল্টো বিষয়টি ধামাচাপা দিতে বিভিন্ন তৎপরতা শুরু করে শাখা কর্তৃপক্ষ। একপর্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি পক্ষও এ ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা না নেয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়।

প্রতিদিন লেনদেনের শেষ ও শুরুতে ভল্টের টাকা মিলিয়ে রাখার দায়িত্ব শাখা ব্যবস্থাপক, সেকেন্ড অফিসার ও ক্যাশ ইনচার্জের। ভল্টে টাকার হিসাবে কোনো গরমিল হলে তা মিলিয়ে নেয়ার দায়িত্ব এসব কর্মকর্তার। অনেক সময় হিসাবের ভুলে সামান্য টাকার গরমিল হতে পারে। তবে বড় অঙ্কের টাকার গরমিল হলে তা ফৌজদারি অপরাধ। এক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। তবে অদৃশ্য কারণে এক্ষেত্রে কাউকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়নি। এমনকি থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরিও করেনি ব্যাংকটি। উল্টো মঙ্গলবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাত পর্যন্ত পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার তৎপরতা চলে। শুধু তাই নয়, পরিদর্শনে গিয়ে যারা এ তথ্য উদঘাটন করেছেন, তাদের চাপে রাখা হয় বলে জানা গেছে।

এর আগেও ঢাকা ব্যাংকের বংশাল শাখার ভল্টে ৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকার উধাও হয়ে যায়। ঢাকা ব্যাংকের বংশাল শাখার ভল্ট থেকে ৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ঢাকা ব্যাংক বংশাল শাখার সিনিয়র ক্যাশ ইনচার্জ রিফাতুল হক ও ম্যানাজার অপারেশন এমরান আহমেদের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।

দুদকের মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ঢাকা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের আইসিসি ডিভিশনের ইন্টারন্যাল অডিট অ্যান্ড ইন্সপেকশন ইউনিটের একটি দল বার্ষিক নিরীক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গত ১৭ জুন ব্যাংকটির বংশাল শাখা পরিদর্শনে যায়। এ সময় ভল্টে থাকা নগদ টাকার মধ্যে ৩ কোটি ৭৭ লাখ ৬৬ হাজার টাকা ঘাটতি পাওয়া যায়।

মামলার এজাহারে আরও বলা হয়েছে, রিফাতুল হক ২০১৮ সালের ১ অক্টোবর ক্যাশ ইনচার্জ হিসেবে যোগ দেন ওই ব্যাংকে। সিনিয়র অফিসার (ক্যাশ ইনচার্জ) রিফাতুল হক এবং এফভিপি ও ম্যানেজার (অপারেশন) এমরান আহম্মেদের কাছে ভোল্টের একটি চাবি থাকতো। তারা যৌথভাবে ভল্টের রক্ষক। তারা পরস্পর যোগসাজশে এ টাকা আত্মসাৎ করেন।

আশ্চর্যজনক, বিশ্বাসযোগ্য না হলেও স্বীকারোক্তিতে এটিই প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। ঢাকা ব্যাংকের ভল্ট থেকে টাকা নিয়ে খেলা হয়েছে জুয়া। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে বংশাল শাখার ক্যাশ-ইনচার্জ রিফাতুল হক জিজ্ঞাসাবাদে এমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন পুলিশ।

এর আগে সোনালী ব্যাংক কিশোরগঞ্জ প্রধান শাখায় একের পর এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেই চলছে। ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি সুড়ঙ্গ পথে ব্যাংকের ভোল্ট থেকে ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা লুটে নেয়ার ঘটনা আজো ভুলেনি কিশোরগঞ্জবাসী।

এর আগে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভোল্ট থেকে স্বর্ণ উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায় সংসদীয় কমিটিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোনোভাবেই ভোল্টের সোনা গায়েব হওয়ার সুযোগ নেই। কেননা সেখানে ৪২টি সিসি ক্যামেরা আছে। তাছাড়া ১৮ ইঞ্চির দুটি চাবি আছে। সেই চাবি দিয়ে ছয় জায়গায় খুলে তারপর ভোল্টে যেতে হয়। কাজেই কোনোভাবেই এটা সম্ভব না। তাদের দাবি, আধুনিক মেশিনের কারণে কষ্টি পাথরের হিসেবের সঙ্গে ৪ শতাংশের পার্থক্য হয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক কাস্টমারদের এনে দেখিয়েছে, কাষ্টমাররা নাকি বলেছেন, তারা যেটা রেখেছিল সেটা ঠিক আছে।

তথ্যসূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *