#সাহিত্য ও সংস্কৃতি

আজ কিংবদন্তি সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ, প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুর্তজা আলীর প্রয়াণ দিবস – শামীমা রিতু !

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ সৈয়দ মুর্তজা আলী। অনেকে চিনে সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাই বলে। অথচ এই ক্ষণজন্মা মানুষটি যে কতোখানি প্রতিভাবান ছিলেন তা কল্পনার বাইরে।

তৎকালীন আইসিএস পরীক্ষায় বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম হয়েছিলেন তিনি অথচ তাঁকেই চাকরি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিলো। পরে ১৯২৬ সালে আসাম প্রভিন্সিয়াল সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঐ বছরই তিনি মৌলভীবাজার মহকুমার ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে এলেন। তারপর পরবর্তীতে সৈয়দ মুর্তজা আলী ছিলেন রাজশাহী বিভাগের কমিশনার। পরবর্তীতে তিনি বাংলা একাডেমির সভাপতিও ছিলেন। চল্লিশের দশকে মুর্তজা আলী ছিলেন সুনামগঞ্জ মহকুমার এসডিও। সুনামগঞ্জের ছাতক উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি।

নিজের জীবনের স্মৃতিকথা “আমাদের কালের কথা” গ্রন্থে সৈয়দ মুর্তজা আলীর লেখার মুন্সিয়ানার অনবদ্য। যেখানে সবিস্তারে এসেছে ভারতবর্ষের নানান আলোচনা, শিক্ষা সংস্কৃতি সহ নানা বিষয়।
লিখেছেন চট্টগ্রামের ইতিহাস, শাহজালাল ও সিলেটের ইতিহাস, মুজতবা কথা ও অরণ্য প্রসঙ্গ,প্রবন্ধ বিচিত্রা সহ বেশ কয়েকটি বই।

মুজতবা আলী তখনো সংসার শুরু করেননি। কোথাও থিতু হওয়ার মানুষই তিনি ছিলেন না। পায়ের তলায় সরষে ছিল তাঁর। পৃথিবীর পাঠশালায় ঘুরে ঘুরে জীবনের ধারাপাত পড়তে চেয়েছিলেন ভীষণ। কিন্তু শেষে মত বদলান। কলকাতা থেকে চলে আসেন আধশহুরে বগুড়ায়।

তখন তাঁর বড় ভাই সৈয়দ মুর্তাজা আলী ছিলেন বগুড়ার ম্যাজিস্ট্রেট (সে সময় ম্যাজিস্ট্রেটই ছিলেন প্রশাসনিক প্রধান)। বড় ভাই মুর্তাজার প্রতি অন্য রকম টান ছিল। জার্মানিতে পড়ার সময় এই বড় ভাই প্রতি মাসে ১০০ টাকা করে পাঠিয়েছিলেন। সেই সময়ের হিসাবে টাকাটা অনেক বড়। ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা তো ছিলই, বগুড়ার মানুষের ভালোবাসাও ভুলতে পারেননি।

কিন্তু শুরু থেকেই বিপত্তি। কলেজের অধ্যক্ষ হওয়ার পর প্রথম যে নিয়মটা তিনি করেন, শিক্ষকদের নিয়ম অনুযায়ী কলেজে আসতে ও যেতে হবে। যে অধ্যাপকেরা খেয়াল–খুশিমতো যাওয়া আসা করতেন, শুরুতেই তাঁরা পড়লেন বিপদে। আরেকটা ঝামেলা বাধল। ছাত্রসংসদ নির্বাচনে হেরে গিয়েছিল মুসলিম লিগের অনুসারী ছাত্রসংগঠন। তারা অধ্যক্ষের ওপরে চাপ তৈরি করল নির্বাচন বাতিলের। না হলে মুজতবা আলী বিপদে পড়বেন বলেও শাসিয়ে গেল। কিছুতেই লাভ হচ্ছে না দেখে পরাজিত ছাত্রনেতারা ঢাকায় গিয়ে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে দেনদরবার করল।

মুজতবা আলী আগে থেকেই তাঁর লেখার কারণে প্রতিক্রিয়াশীলদের চক্ষুশূল ছিলেন। এদের অনেকে বগুড়ায় তাঁকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগে নাখোশ হন। এর মধ্যে ১৯৪৮ সালের আগস্টে বিশদ আকারে প্রকাশিত হয় পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা নিয়ে সিলেটে দেওয়া তাঁর বক্তব্য। এবার মুজতবাকে কোণঠাসা করতে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় আজিজুল হক কলেজের সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত একটি নিবন্ধকে। যেখানে মন্ত্রীদের কটাক্ষ করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। সরকারি চাকরি করে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় মুজতবাকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

সৈয়দ মুজতবা আলী সে সময় ছিলেন ভাইয়ের সরকারি বাসভবনে। কলেজ অধ্যক্ষের জন্য কোনো বাসভবনও ছিল না। তাঁর বড় ভাই মুর্জাতাকেও জড়ানো হয়। পরিস্থিতিকে সুবিধাবাদীরা নানাভাবে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে দেখে মুর্তাজা ঢাকায় এসে মুখ্য সচিব আজিদ আহমেদকে বলেন, ‘দেখুন, আমার ভাই ১৭ বছর আগে জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেছে।

বগুড়ার মতো ছোট শহরে চাকরির জন্য সে আর মুখিয়ে নেই।’ তাঁর ভাইয়ের যে মেধা ও প্রজ্ঞা, সে সময় খুব কম মানুষেরই তা ছিল। নবগঠিত একটা দেশ যে মুজতবা আলীর মেধা কাজে লাগাচ্ছে না, উল্টো ষড়যন্ত্র করছে, এ নিয়ে হতাশার শেষ ছিল না মুর্তাজা আলীর।
সরকার মুর্তাজা আলীর কথাও শোনেনি। উল্টো তাঁকেও একপদ নিচে নামিয়ে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট করে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিল চট্টগ্রামে। নিজের পরিবারকে এই বিপদ থেকে মুক্ত করতে মুজতবা আলী আবার ভারতে চলে যান।

আজ কিংবদন্তি সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ, প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুর্তজা আলীর প্রয়াণ দিবস। বিনম্র শ্রদ্ধা তাঁর প্রতি।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *