#আন্তর্জাতিক

করোনায় দিল্লীতে এক হাসপাতালে ২৫ রোগীর মৃত্যু !

ভারতের রাজধানী দিল্লীর এক হাসপাতালে অক্সিজেন সংকটের কারণে ২৫ জন করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে। দিল্লীর জয়পুর গোল্ডেন হাসপাতালের এক কর্মকর্তা গতকাল শনিবার এই তথ্য জানিয়েছেন।

হাসপাতাল পরিচালকের এই তথ্য থেকেই ভারতের করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছে সম্প্রচারমাধ্যম। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে ভারতের করোনাভাইরাস পরিস্থিতি। দুনিয়ার যে কোনও দেশের চেয়ে ভারতে একদিনে সবচেয়ে বেশি করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে তিন লাখ ৪৬ হাজার নতুন রোগী শনাক্তের পাশাপাশি মৃত্যু হয়েছে দুই হাজার ৬২৪ জনের। দেশটির শীর্ষ হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন সংকট এরই মধ্যে মারাত্মক আকার নিয়েছে।

জয়পুর গোল্ডেন হাসপাতালের পরিচালক ডা. ডিকে বালুজা বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছ থেকে ৩.৫ মেট্রিক টন অক্সিজেন বরাদ্দ পেয়েছি। বিকেল পাঁচটার মধ্যে আমাদের কাছে এই সরবরাহ আসার কথা, কিন্তু তা পৌঁছায় মধ্যরাতে। কিন্তু ততক্ষণে ২৫ রোগী মারা গেছে।’ তিনি জানান হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে ২১৫ জনের অবস্থা গুরুতর আর তাদের প্রচুর অক্সিজেন প্রয়োজন।

সাহায্যের জন্য দিল্লী হাইকোর্টের শরণাপন্ন হয়েছে জয়পুর গোল্ডেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাদের আবেদনে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক মিনিটের মধ্যে আমাদের হাসপাতালে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে আমরা ২৫ জনকে হারিয়েছি। অক্সিজেনের জন্য আমরা হাঁসফাস করছি। আমাদের ডাক্তাররা আপনাদের সঙ্গে আছে। দয়া করে জীবন বাঁচান।’

জয়পুর গোল্ডেন হাসপাতাল ছাড়াও আরও একটি হাসপাতালও শনিবার অক্সিজেনের জন্য জরুরি আবেদন জানিয়েছে। শনিবার সকালে মুলচান্দ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অক্সিজেন সহায়তা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ট্যাগ করে টুইট করে। এছাড়া দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং লেফটেন্যান্ট গভর্নর অিনল বাইজালকেও ট্যাগ করা হয় ওই টুইটে। এতে বলা হয় ১৩০ জনের বেশি করোনা রোগী লাইফ সাপোর্টে রয়েছে। বলা হয়, ‘আমাদের আর মাত্র দুই ঘণ্টার অক্সিজেন সাপোর্ট রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সব কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি কিন্তু পারিনি।’ সমস্যার সমাধানের আগ পর্যন্ত নতুন রোগী ভর্তি নেওয়া বন্ধ রেখেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

গত তিন ধরে ভারতের বেশ কয়েকটি হাসপাতাল অক্সিজেন সহায়তা চেয়ে আহ্বান জানাচ্ছে। অক্সিজেন, হাসপাতালের বিছানা এবং ওষুধ চেয়ে অনেকেই হাইকোর্টের শরণাপন্ন হয়েছেন।

করোনা ভাইরাস মহামারির মধ্যে ভারতে অক্সিজেনের অভাব প্রকট রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যের হাসপাতালগুলোয় পাওয়া যাচ্ছে না অক্সিজেনের পর্যাপ্ত সরবরাহ। সাত মাস আগে ঠিক একই ধরনের সংকটে পড়েছিল ভারত। কিন্তু বারবার একই সমস্যায় কেন পড়ছে দেশটি?

ভারতে কয়েক দিন ধরে প্রতিদিনই করোনা ভাইরাসে এক দিনে মৃত্যু ও সংক্রমণে রেকর্ড হচ্ছে। দেশটিতে গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২ হাজার ৬২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এ খবর জানা গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় সংক্রমিত হয়েছে ৩ লাখ ৪৬ হাজার জন। এর আগের ২৪ ঘণ্টার তুলনায় সংক্রমণ ও মৃত্যু দুই-ই বেড়েছে। এদিকে দিল্লীতেও করোনাভাইরাসে এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সেখানে গত শুক্রবার ৩৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বৃটিশ সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সাধারণত ভারতে স্বাস্থ্য খাতে অক্সিজেনের মোট সরবরাহের ১৫ শতাংশ ব্যয় হয়। বাকিটা শিল্প খাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু করোনার এই দ্বিতীয় ঢেউয়ে দেশটির মোট অক্সিজেন সরবরাহের ৯০ শতাংশই স্বাস্থ্য খাতে দিতে হচ্ছে। প্রতিদিন এ খাতে সাড়ে ৭ হাজার মেট্রিক টন অক্সিজেন খরচ হচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছেন দেশটির জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা রাজেশ ভূষণ। গত বছরের সেপ্টেম্বরের চাহিদার তুলনায় এটি তিনগুণ বেশি।

গত বছরের অক্টোবরে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১৬২টি নতুন অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল। করোনার প্রথম ঢেউয়ের আট মাস পর এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এত দিনে মাত্র ৩৩টি স্থাপিত হয়েছে

ভারতের কিছু রাজ্য অবশ্য এর মধ্যেই অক্সিজেনের যথেষ্ট মজুত গড়ে তুলতে পেরেছে। যেমন কেরালায় প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত অক্সিজেনের মজুত আছে। সেখানে অক্সিজেনের উৎপাদন প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। কেরালা এখন অন্যান্য রাজ্যেও অক্সিজেন পাঠাচ্ছে। কিন্তু দিল্লীসহ কিছু রাজ্যে নিজেদের অক্সিজেন তৈরির প্ল্যান্ট নেই। ফলে, এই রাজ্যগুলো অক্সিজেনের জন্য আমদানির ওপর মূলত নির্ভরশীল। এসব রাজ্যেই অক্সিজেনের সংকট বেশি।

গত বছরের অক্টোবরে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১৬২টি নতুন অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল। করোনার প্রথম ঢেউয়ের আট মাস পর এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এত দিনে মাত্র ৩৩টি স্থাপিত হয়েছে। চলতি মাসের শেষ নাগাদ আরও ৫৯টি এবং মে মাসের শেষে আরও ৮০টি প্ল্যান্ট স্থাপনের কথা রয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, সঠিক ও জরুরি পরিকল্পনার অভাবেই ভারতে অক্সিজেনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

অন্যদিকে, ভারতে কারখানা থেকে অক্সিজেন ট্যাংকারে ভরা এবং তা হাসপাতালে সরবরাহ করতেও সময় লাগছে অনেক। এ প্রক্রিয়ায় কিছু প্রযুক্তিগত জটিলতা আছে। এ কারণে প্রয়োজনের সময়ে দ্রুত অক্সিজেন সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

ভারতের অক্সিজেন তৈরির কারখানাগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টাও চলছে। তবে এর জন্য সরকারি অর্থসহায়তা চাইছে কারখানাগুলো। এমনই এক প্ল্যান্টের কর্মকর্তা রাজাভাউ শিন্ডে বিবিসিকে বলেন, ‘আগে কেউ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এখন হুট করে অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে গেছে। কথায় আছে, তৃষ্ণার্ত হওয়ার আগে কুয়া খুঁড়তে হয়। কিন্তু আমরা তা করিনি।

তথ্যসূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *