#সাহিত্য ও সংস্কৃতি

কোরবানির হাটে একদিন – তানকিউল হাসান।

আমার সুদীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছরের জীবনে একবারই কোরবানির হাটে গিয়েছিলাম এবং এরপর প্রতিজ্ঞা করেছি এ জীবনে আমি আর কখনো কোরবানির হাটে যাব না। একবার গিয়েই আমার শখ মিটে গেছে।

১৯৯০ সালের কথা। কোরবানির ঈদের তখনও দিন দুই বাকি। আমার মা , বাবা তখন সৌদিআরবে । থাকি নানার বাসায় । নানী এক বিকেলে মামাদের ডেকে বললেন , ” এই নে বিশ হাজার টাকা ভালোমতো একটা গরু কিনে আনবি ” উত্তেজনায় আমার চোখ চক চক করে ওঠলো । জীবনে কখনো গরুর হাটে যাওয়া হয়নি সেবারই প্রথম । কোরবানির হাট ব্যাপারটা কি কে জানে ?

ঠিক হলো বিকেল আমরা সবাই মিলে গরু কিনতে যাব। আমরা সবাই বলতে প্রায় বিশ জনের বিশাল এক দল। এই দলে আমার সমবয়সী দুই মামা আছে ,বুদ্দিন নামের ছাগলা দাঁড়িওলা উলুম্বুসের মতন চেহারার অতি বিচিত্র চরিত্রের এক লোক আছে যে কিনা আমার নানার বাসায় কাজ করে আর আছে একদল বন্ধুবান্ধব।

বিকালবেলা ঝুম বৃষ্টির মধ্যে সবাই মিলে কাজীর বাজারে রওনা হলাম।সিলেট শহরে কোরবানির হাট সেখানেই বসে। বাজারে ঢুকে আমার চক্ষু চড়কগাছ ! কি ঘটছে কিছুই বুঝতে পারছি না । দেখলাম লোকজন দিগ্বিদিক ছুটছে , কেউ কেউ চিৎকার করে বলছে ” ওই বিছাল , বিছাল “ সিলেটি ভাষায় বিছাল শব্দের অর্থ হচ্ছে ষাঁড় । কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হতভম্ব হয়ে লক্ষ্য করলাম বিশাল আকারের এক কালো রঙের ষাঁড় তীব্র গতিতে আমাদের দিকে ছুটে আসছে। তাঁর চোখের দৃষ্টিতে উন্মাদনা , গলায় ঘণ্টা ঝোলানো। সেই ঘণ্টা স্কুলের ছুটির ঘনটার মতন অবিরাম বাজছে। গরুটিকে ধরার জন্য একদল মানুষ তাঁর পেছন পেছন দৌড়াচ্ছে তাঁদের কারো হাতে দড়ি , কারো হাতে বাঁশের কঞ্চি তবে কোন এক বিচিত্র কারণে তাঁদের সবার মুখই হাসি হাসি। দেখে মনে হল , তাঁরা এক কাজটি করে খুব আনন্দ পাচ্ছে ! ততোক্ষণে ঘটনা কি ঘটছে আমরা বুঝে গেছি । আমরাও দৌড় দিলাম । গরু আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে গেলো যাইহোক , গরুর শিঙয়ের গোঁতা খাওয়ার দুর্ভাগ্য আমাদের সেদিন হয়নি তবে কার হয়েছিল কে জানে ?

আমরা বাজারে ঢুকে পড়লাম । নানা বাড়ীর গরুর বাজেট পনেরো /বিশ হাজার । ওই যুগে এই টাকায় ভালো গরু কেনা যেতো । বাজারে এদিক ওদিক হাঁটছি । গরুর গোবরের কিট কিট গন্ধে নিঃশ্বাস নেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বৃষ্টির কারণে পুরো রাস্তা জুড়ে গোবরের ছড়াছড়ি । আমার পায়ে স্যান্ডেল , পুরো পা সবুজ রঙের গোবরে মাখামাখি এককথায় বিশ্রী এক অবস্থা ।

গরু কিনতে গিয়েও নানান সমস্যার উদয় হলো । কোন গরুই মনে ধরছে না । আমার দুই মামার পছন্দের গরু দুই ধরণের। বড় জনের পছন্দ খাটো গরু তবে শরীরে মাংস বেশী থাকতে হবে আবার ছোটজনের পছন্দ গায়ে গতরে বিশাল সাইজের গরু এবং সেই গরু কঙ্কালসার হলেও সমস্যা নেই ! উচ্চতাই মুখ্য বিষয় ! বুদ্দিন নামের ছাগলা দাঁড়িওলা কে দেখা গেল সবার চেয়ে এক কাঠি উপরে । সে লাখ /দেড় লাখ টাকা দামের সব গরু দামাদামি করছে । সে কিভাবে দামাদামি করছে তা গল্পের খাতিরে বর্ণনা করা যেতে পারে ।

বুদ্দিন নিজের চেহারায় সিরিয়াস একটা ভাব ফুটিয়ে গরু বিক্রেতার কাছে গিয়ে গম্ভীর গলায় জিগ্যেস করছে ,

‘ কিতা মিয়া তুমার গরুর দাম খত ? ‘

গরু বিক্রেতার মুখে পান , ঠোঁটে বিড়ি আঙ্গুলের ডগায় পানের ডাটা তাতে চুন লাগানো । সে অল্প একটুখানি চুন জিহ্বায় ঘষে বুদ্দিনের দিয়ে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল

‘ দামাদামি বাদে করবানে সাব আগে গরু দেখউকা ‘

বুদ্দিন গরুর গায়ে হাত বুলিয়ে কিছুটা হতাশ গলায় বলল , ‘ গরু ইলা মরা খেনে ঠিকমতো খাওয়াও নানি ?

গরু বিক্রেতা অবাক হয়ে বলল , ‘ ইতা কিতা খইলা ? ইটা বাজারর সবচে দামী গরু এর চেয়ে বড় গরু ই বাজারো আর নাই !

বুদ্দিন বলল , ‘ বুজলাম অখন দাম খতো ওখান খও ?’

গরু বিক্রেতা বলল , ‘ এখ লাখ বাইশ হাজার ! ‘

বুদ্দিন অবাক হওয়ার ভান করে বলল , ‘ অউ গরুর দাম “এখ লাখ বাইশ হাজার” মাথা ঠিক আছে নি ? আমি গত বছর এরছে বড় গরু কিনছি বিশ হাজার টেখা দি !!

গরু বিক্রেতা হতভম্ব গলায় বলল , ইতা কি কইলা ? বিশ হাজার টেখা দি ওলা গরু কিনছইন ? আফনে বিশ হাজার টেখা দি ইজাত গরু জুদি অউ বাজারে ফাইন তে আমি আফনারে ই গরু ফিরি দিয়াইমু !

আমরা সবাই এক কোনায় দাঁড়িয়ে মজা দেখছি । অবশেষে আমার মামারা তাঁদের কাঙ্ক্ষিত গরু পেলেন । দুজনেরই পছন্দ হল । গরুর দাম চেয়েছে তেইশ হাজার । আমরা অনেকক্ষণ মুলামুলি করে বিশ হাজারে গরুটি কিনে ফেললাম ।

গরু নিয়ে সবাই হেঁটে বাসায় রওনা হয়েছি । গরুর গলায় বাঁধা দড়িখানা বুদ্দিনের হাতে । লোকজন বুদ্দিনকে গরুর দাম জিগ্যেস করছে । বুদ্দিন অবলীলায় লোকজনকে যা তা দাম বলছে । কাউকে পঞ্চাশ হাজার , কাউকে তিরিশ হাজার আবার কাউকে চল্লিশ হাজার । তাঁর এই মিথ্যা বলাটা গরুর হয়তোবা পছন্দ হয়নি । হঠাৎ করেই গরুটি তাঁর পেছনের পা দিয়ে বুদ্দিনের শরীরের বিশেষ অঙ্গে দডাম করে এক লাথি বসিয়ে দিল । বুদ্দিন ‘ ও আল্লারে বলে দুই হাতে তলপেট চেপে ধরে রাস্তায় শুয়ে কোঁকাতে শুরু করলো । গরু এই মোক্ষম সুযোগটি কাজে লাগাল । কষে একটা দৌড় লাগাল ।

আমরা সবাই গরুর পেছন পেছন দৌড়াচ্ছি , গরু আমাদের আগে আগে । আমাদের সবার মুখ হাসি হাসি । খুব আনন্দ হচ্ছে ।

পরিশেষ ঃ গরুকে অবশ্য পরে পাকড়াও করা হয়েছিল এবং ঈদের দিন কোরবানির ঠিক পূর্ব মুহূর্তে বুদ্দিন আবারও তাঁর বিশেষ অঙ্গে গরুর লাথি খেয়েছিল ।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *