#ইতিহাস ও ঐতিহ্য

শমশেরনগরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য – সৈয়দ ইরমানুল হক

ঐতিহাসিকভাবে এক ঐতিহ্যবাহী এলাকার নাম হলো “শমশেরনগর”
নামটি শুনতে এবং উচ্চারণ করতে আলাদা একটা অনুভূতি কাজ করে।
শমশেরনগর গ্রাম, শমশেরনগর ইউনিয়ন, শমশেরনগর চা বাগান, শমশেরনগর রেল স্টেশন,
শমশেরনগর ঐতিহাসিক বিমান বন্দর।
আরও কত কিছু।


শমশেরনগর গিয়ে ঢুকলে মনে হয় এ যেন ছোট্ট এক গোছানো জেলা শহর কিংবা বড় মানের এক উপজেলা শহর অথচ এটা একটা ইউনিয়নের এলাকা।

মৌলভীবাজার জেলা সদর থেকে ২০ কি:মি: পূর্বে শ্রীমঙ্গল শহর হতে ২১ কি:মি: উত্তর-পূর্বে, কুলাউড়া শহর থেকে ২৭ কি:মি: দক্ষিণে ও ভারতের উত্তর ত্রিপুরার জেলা কৈলাসহর থেকে মাত্র ১৩ কি: মি: পশ্চিমে শমশেরনগরের অবস্থান।
কথিত আছে প্রায় ৩০০ এর অধিক বছর আগে এই অঞ্চলটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

পাঠান বীর শমশের গাজীর নামে শমশেরনগরের নামকরন করা হয়। বঙ্গবীর শমসের গাজী ছিলেন একজন ব্রিটিশ বিরোধী এবং ত্রিপুরার রৌশনাবাদ পরগনার কৃষক বিদ্রোহের নায়ক। ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির আগ্রাসন প্রতিহত করতে গিয়ে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। নবাব সিরাজুদ্দোলার পর তিনিই ঔপনিবেশিক শক্তির হাতে প্রথম নিহত হন। ব্রিটিশ শাসনামলে এই শমশেরনগর ছিল এশিয়ার বৃহত্তর গ্রাম্য বাজার।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে (১৯৪৩-৪৫) ব্রিটিশরা কলকাতা দমদম বিমানবন্দরের সঙ্গে শমশেরনগরে একটি বিমানবন্দর স্থাপন করেছিল। দমদমের সঙ্গে মিল রেখে তার নাম রেখেছিল দিলজান্দ বিমানবন্দর।

ডানকান ব্রাদার্সের প্রধান চা-বাগান শমশেরনগরসহ আরও দুটি চা-বাগান চাতলাপুর ও আলীনগর পাশাপাশি অবস্থান করছে। ফলে ব্রিটিশরা সে সময় শমশেরনগরে ইন্ডিয়ান টি অ্যাসোসিয়েশনের (আইটিএ) সদর দপ্তর স্থাপন করেছিল। পাকিস্তান আমলে এর নাম পরিবর্তন করে হয়েছিল পিটিএ।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর পিটিএ চা বোর্ডে রূপান্তরিত হয়ে তার সদর দপ্তর করা হয় চট্টগ্রামে। আজও আইটিএ বা পিটিএ ভবন লংলা হাউস শমশেরনগরে সেদিনের সাক্ষ্য বহন করে চলছে।
শমসেরনগর চা বাগানের Golf course এবং Camelia হাসপাতালটি দেখার মতো।
Fortunately আমার দেখার সুযোগ হয়েছিল।

আমার মরহুম বাবা (১৯৬৭-১৯৭২) অবধি পেশাগত জীবনের তাগিদে বৃটিশ মালিকানাধীন লস্করপুর ভেলী মেডিকেল এসোসিয়েশনের (C.M.O) হিসাবে কাজ করেন এবং আমৃত্যু Duncan brother’s সহ বিভিন্ন British মালিকানাধীন চা কোম্পানির Medical Adviser থাকার দরুন সাথে আবার আপন বড় মামা মরহুম আহমেদ মোস্তফা কামাল পাকিস্তান আমল হতে ৮০ এর দশকের মাঝামাঝি সময় অবধি পযন্ত Duncan brother’s এ Planter হিসাবে কাজ করার সুবাদে চা বাগানের সাথে আমাদের একটি সুদৃঢ় বন্ধন ছিল।

আমার ছোট্ট বেলায় বেশ কয়েক বার শমশেরনগর এবং আলীনগর চা বাগান বেড়ানোর সৃতি এখনও চোখে ভাসে।
আব্বার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যুক্ত বন্ধু আমার প্রিয় Respected জনাব আজিম Uncle তখন শমশেরনগর এর Planter ছিলেন।
তখন বড় মামা ছিলেন Duncan brother’s এর আরেক প্রান্তে অবস্থিত আমু বাগানের Planter।
কত যাওয়া আসা ছিল আমাদের।
পরবর্তীতে যখন আলীনগরে যেতাম তখন Planter ছিলেন আব্বার আরেক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যুক্ত বন্ধু আমার প্রিয় Respected জনাব শাহ আলম Uncle।

মনু Valley Club এ প্রতি বছর Duncan brother’s এর সকল Medical Officerদের নিয়ে একটি Conference হতো এবং আব্বা তখন ঐ Conference এ সকল Doctorsকে দিক নির্দেশনা মুলক লেকচার দিতেন।
আমাদের বাড়ীতে বেড়াতে আসা এক মামা এবং আমি আব্বার সাথে ঐ Conference এ Guest হিসাবে গিয়েছিলাম।


আমার এখনও মনে আছে Conference এর Official speech এবং Conversations এর মধ্যে আব্বা এবং অন্যান্য Doctors আর আলোচকরা একটি বাংলা Word use করেননি।
পুরো Meeting হয়েছিলো Very much realistic useful English conversations এর মাধ্যমে যার এজেন্ডা সমূহ সত্যিকার ভাবেই কার্যকরী হতো।
এসব কিছুই এখন নেই।
সবকিছুতেই যেন এখন ধান্দা বাজি, গোড়ামিল আর জগাখিচুড়িতে পরিপূর্ণ।

৯০ এর দশকে শমশেরনগরে অবস্থিত নয়ন জুড়ানো ক্যামেলিয়া হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সময় পাকিস্তান আমল এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর Duncan Brothers এর অতি গুরুত্বপূর্ণ পদবীধারী Familiar personality Late Mr. Murdock এর সুযোগ্য কন্যা (নাম মনে করতে পারছিনা) আব্বার সাথে শলাপরামর্শের জন্য নিজে গাড়ি চালিয়ে কত দিন যে আমাদের বাড়ীতে এসেছিলেন তা হিসাব ছাড়া।
আমরা চা বাগানের Life এর যে Pride/Dignity দেখেছি তার কিছুই এখন নেই।

বড় মামা সহ ঐ Uncleরা আমাদের ভাই-বোনকে কি যে আদর করতেন তা এখনও মনে পড়ে এবং অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সে যাই হোক চা বাগানের সাথে আমার পরিবারের সৃতি বিজড়িত কাহিনী লিখতে গেলে এখন বই হয়ে যাবে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাক বাহিনীর ক্যাম্প ছিল জেলা পরিষদ ডাক বাংলোয়, সেখানে বহু মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে নির্যাতন চালানো হতো দিনের পর দিন, পরে মেরে ফেলে দিয়ে বদ্ধভুমিতে মাটি চাপা দেওয়া হতো।
এই স্মৃতি বিজরিত বদ্ধভুমিটিও রক্ষা করা একান্ত প্রয়োজন। অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ স্মরন করে সম্মান প্রদর্শনের জন্য এখানে একটি যুদ্ধ ভিত্তিক জাদুঘর করা হোক নতুন প্রজন্মের জন্য অথবা চোখে পড়ার মতো কিছু একটা করার জন্য সরকারের প্রতি দাবি রইলো।

১৯৫২ সালে ইরানের শাহেনশাহ রেজা পাহলবি ঢাকা থেকে রেলভ্রমণের মাধ্যমে শমশেরনগর স্টেশনে অবতরণ করে কুলাউড়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী পৃথিমপাশার নওয়াব আলী আমজাদের নবাব বাড়ীতে বেড়াতে গিয়েছিলেন।
তাঁর সম্মানে শমশেরনগর প্লাটফরম সংলগ্ন রেলগেটে বড় দুটি পাকা তোরণ নির্মাণ করা হয়েছিল।
আজও সে তোরণগুলো নীরব সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

পাকিস্তান আমলে শমশেরনগর বিমানবন্দরে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ার লাইনসের (পিআইএ) অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট সার্ভিস চালু ছিল। ১৯৭০ সালে সিলেট বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের পর পিআইয়ের একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের ইঞ্জিনে আগুন ধরে গেলে শমশেরনগর বিমানবন্দরের রানওয়েতে জরুরি অবতরণকালে বিমানটি দুর্ঘটনায় কবলিত হয়ে অধিকাংশ যাত্রী মারা যান। সেই থেকে শমশেরনগর বিমানবন্দরে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেলে বিমানবন্দরটি অচল হয়ে পড়ে।

১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী (বিএএফ) শমশেরনগর বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিএএফ এমটি ইউনিট ও সার্ভইভ্যাল স্কুল স্থাপন করে এবং সেখানে বিমান সেনাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
পরবর্তীতে বিএএফ রিক্রুটস অ্যান্ড ট্রেনিং স্কুল ও বিএএফ শাহীন কলেজ স্থাপন করা হয় শমশেরনগরে।

চা বাগানের মাঝে ব্রিটিশ প্লান্টরাসদের একটি কবরস্থান রয়েছে যেটি ১৮ শতাব্দীর।
স্থানীয়রা সেটাকে গীর্জা নামেই জানে।
যদিও গীর্জার কোন চিহ্নই নেই।
কিছু এপিটাফহীন কবর পরে আছে অবহেলিত ভাবে।

অদুরেই রানওয়ে আর কিছু দুর আঁকা বাঁকা পিচ ঢালা পথে এগুলেই দেখা যায় ৩০০ বছর পুরানো শ্বশানঘাট ও মন্দির।
এটি পুনরায় স্থাপন করা হয়েছিল ১৯ শতকে।
এরকম আরো অগনিত স্থাপনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। স্থানীয়দের বহুদিনের দাবী এখানে একটি জাদুঘর করা হোক আর বিমান বন্দরটির কিছু অংশ উন্মোচিত করে দেওয়া সমীচীন হবে উৎসুক Visitorদের জন্য।
ভুমি দস্যুদের হাত থেকে ঐতিহাসিক এ জায়গাটি রক্ষা করাও অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

ভালো থাকুন সবাই।
ধন্যবাদ।

Syed Irmanul Haque
Houston
Texas
U.S.A.
February 6th 2021

মূল তথ্য সূত্র: এম, কায়সার হোসেন।
(ছবি সমূহের মূল সুত্র এম, কায়সার হোসেন এবং কয়েকটি ছবি আমি ইন্টারনেট হতে সংগ্রহ করে সংযোজন করেছি মাত্র)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *