সোনালী আঁশের, স্বর্ণালী দিন আর নাই !
সোনালী আঁশের, স্বর্ণালী দিন আর নাই !
(সেই স্বর্ণালী দিন ফিরিয়ে আনতে প্রবাসীদের প্রচেষ্টা প্রয়োজন)
এম হায়দার চৌধুরী, হবিগঞ্জ থেকে :: বাংলাদেশে সোনালী আঁশ বা পাটের স্বর্ণালী দিন আর নাই। সেই স্বর্ণালী দিন ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহনের পাশাপাশি প্রবাসীদের প্রচেষ্টাও প্রয়োজন। বর্তমানে দেশে সোনালী আঁশ বা পা্টের স্বর্ণালী দিন কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। ১৯৪৭ পূর্ব সময়কালে বিশ্ববাজারে এদেশ থেকে প্রায় ৮০ ভাগ পাট রপ্তানি হতো। ১৯৭৫-৭৬ সালের দিকে হঠাৎ করে এ অবস্থার অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটে। এক সময় দেশের অন্যতম রপ্তানী পণ্য ছিল পাট ও পাটজাত দ্রব্য তাই মানুষ পাটের গুরুত্বকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে আগ্রহ ভরে পাটকে সোনালী আঁশ বা স্বর্ণসূত্র আখ্যা দিয়েছিল। পাট ছিল দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্থকরী পণ্য এবং বৈদেশিক মূদ্রা আয়ের একমাত্র উৎস। এখন আগের মতো পাটের গুরুত্ব নাই, তাই সোনালী আঁশ নামটিও প্রায় বিলুপ্তির পথে। কৃত্রিম তন্তুর তান্ডবে দেশে-বিদেশে পাটজাত দ্রব্যের বাজারে মহামারির আবির্ভাব ঘটেছে।
পাট গ্রামবাংলার একটি শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী বর্ষাকালীন ফসল। মূলত দুই ধরনের পাট বাংলাদেশে দেখতে পাওয়া যায় সাদা পাট ও তোষা পাট। এটি Tiliaceae পরিবারের অন্তর্গভূক্ত একটি উদ্ভিদ। মনে করা হয় সংস্কৃত শব্দ পট্ট থেকে পাট শব্দের উদ্ভব হয়েছে। পাটের ইংরেজি নাম জুট (Jute)।
পাটের আবাদ বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, মায়ানমার, চীন, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ক্যাম্বোডিয়া, ব্রাজিলসহ আরও কয়েকটি দেশে হয়। বাণিজ্যিক দিক বিবেচনায় বাংলাদেশ এক সময়ে একচেটিয়া পাটজাত পণ্য রপ্তানী সুবিধাপ্রাপ্ত দেশ ছিল। ১৯৪৭-৪৮ সাল পর্যন্ত বিশ্ববাজারে ৮০ভাগ পাট রপ্তানি হতো এদেশ থেকে। ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে বিশ্ব বাজারে চাহিদার মাত্র ২৫ ভাগ পাট বাংলাদেশ থেকে বাহিরে যায়। এ অবস্থার করুণ অবনতির অন্যতম কারণ কয়েকটি পাট রপ্তানীকারক দেশের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং সে সঙ্গে বিশ্ববাজারে কৃত্রিম তন্তুর উপস্থিতি।
দেশে ক্রমান্বয়ে পাট এবং পাটজাত দ্রব্যের ব্যবহার কমতে থাকায় ধীরে ধীরে এর অস্তিত্ব হূমকির মুখে এসে পড়েছে। অপর দিকে পাটের উৎপাদন খরচ বেশি এবং পাট পঁচানোর জন্য জলাশয়ের অভাবে পাট চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন চাষীরা। ফলে প্রতি বছর আনুপাতিক হারে হ্রাস পাচ্ছে পাটের আবাদ। এইরূপ নানাবিধ প্রতিকূলতার জন্য পাটের চাষাবাদ ছেড়ে সবজি চাষের দিকে ঝুঁকছেন কৃষকরা। বাস্তবে দেখাযায় পাটজাত পণ্য ব্যবহারের জায়গা অনেকটাই দখলে নিয়েছে প্লাস্টিক ও কৃত্রিম তন্তু।
প্লাস্টিকে তৈরী নিত্যব্যবহার্য্য ও গৃহস্থালীপণ্য সহজলভ্য হওয়ার কারনে এর ব্যবহার যত্রতত্র দেখাযায়। সাশ্রয়ী মূল্য ও বারবার ব্যবহার যোগ্য বিধায় এটির জনপ্রিয়তাও গগনচুম্বী। কৃত্রিম তন্তু থেকে উদ্ভাবিত পণ্যের ব্যবহার পাটজাত পণ্যের জনপ্রিয়তা হ্রাস পাওয়ার এটি একটি অন্যতম কারণ।
আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহরে পাটের তৈরী রশির ব্যবহার বলাই বাহুল্য। প্রাচীনকাল থেকেই প্যাকেজিংয়ের কাঁচামাল হিসেবে পাট ব্যাপক হারে ব্যবহার হয়ে আসছে। এ সোনালীআঁশ বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পূর্বে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে পাটের রশি, হাতে তৈরি কাপড়, শিকা ও গৃহসজ্জার সামগ্রীসহ নিত্য ব্যবহার্য গৃহস্থালি কাজে ব্যবহারের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হতো।
একদা পাটজাত দ্রব্যের মধ্যে ঘানিবস্তা ও পাটের শাড়ির বহুল ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। পাটজাত দ্রব্যের ঐতিহ্যগত ব্যবহার প্রধানত পাটে তৈরী সুতা, মোটা কাপড়, চটের ব্যাগ, টুইল কাপড়, কার্পেট, মাদুর, গালিচা ও বিভিন্ন ধরনের গৃহসজ্জার সামগ্রী প্রভৃতি। উল্লেখিত পাটজাত সামগ্রী মোটামুটি সবগুলোই এখন প্লাস্টিক ও কৃত্রিম তন্তু থেকে তৈরী হচ্ছে। এগুলো বহু ব্যবহারেও নষ্ট হয়না এবং সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী মূল্যে হাতের কাছেই পাওয়া যায়।
দেশের পাট বা সোনালীআঁশের হারিয়ে যাওয়া সোনালী দিন পুণরুদ্ধারে রাষ্ট্রিয় পর্যায়ে দেশের সর্বস্তরে পাটজাত দ্রব্যের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নিমিত্তে পাট ও পাটজাত দ্রব্য রপ্তানী বৃদ্ধিতে সচেষ্ট হতে হবে। পাশাপাশি ইউরোপসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী এ দেশের নাগরিকরা পাটের তৈরী গৃহস্থালী সামগ্রীর নান্দনিক ব্যবহার তুলে ধরে বিদেশিদের আকৃষ্ট করতে চেষ্টা করা প্রয়োজন। তবেই এ প্রক্রিয়া সোনালী আঁশের হারিয়ে যাওয়া সোনালী দিন পুণরুদ্ধারে সহায়ক ভুমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
এম হায়দার চৌধুরী ::
শায়েস্তাগঞ্জ (হবিগঞ্জ)
মোবাইল নং ০১৭১১৮৫৯৫৮১
তারিখ: ১৭ জুলাই ২০২০ খ্রি:





