দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা ক্রমশই বাড়ছে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততার সমস্যাটি দীর্ঘ দিনের। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে। লবণাক্ততা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে এ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে সমগ্র কৃষি ব্যবস্থাপনা বিন্যাসে।
সূত্র মতে, দেশের কৃষি জমির শতকরা ৩০ ভাগ উপকূলীয় এলাকায়। উপকূলীয় ২ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ২৮দশমিক ৫ লাখ হেক্টর জমির মধ্যে ০দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ৮দশমিক ৩ লাখ হেক্টর জমিই লবণাক্ততায় নানাভাবে প্রভাবিত হয়। গত চার দশকে দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ততা বেড়েছে ২৬ শতাংশ। আর গত এক দশকে এর মাত্রা বেড়েছে ৩দশমিক ৫ শতাংশ। অপরদিকে, বরিশাল ও পটুয়াখালীতে লবণাক্ততার পরিমাণ ২ পিপিটি (লবণাক্ততা পরিমাপক মাত্রা) থেকে বেড়ে ৭ পিপিটি হয়ে গেছে। এ অঞ্চলের যশোরে শুষ্ক মওসুমে গঙ্গার পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নদ-নদীর পানি প্রবাহ শুষ্ক মওসুমে স্বাভাবিক মাত্রায় থাকে না। ফলে নদীর পানির বিপুল চাপের কারণে সমুদ্রের লোনাপানি যতটুকু এলাকাজুড়ে আটকে থাকার কথা ততটুকু থাকে না, পানির প্রবাহ কম থাকার কারণে সমুদ্রের লোনাপানি স্থলভাগের কাছাকাছি চলে আসে। ফলে লবণাক্ততা বেড়ে যায় দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুল এলাকায়। কম বৃষ্টিপাতের কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার সমস্যা দিনে দিনে আরও প্রকট হয়ে উঠবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্র ভূভাগের অনেক ভেতর পর্যন্ত লোনাপানি ইতোমধ্যেই ঢুকে পড়েছে। এই সমস্যা উপকূলীয় অঞ্চল থেকে যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর ও কুমিল্লা পর্যন্ত উত্তর দিকে বিস্তৃত হয়েছে, আরও উত্তরে বিস্তৃত হতে পারে। এছাড়া সুন্দরবনের অবস্থান এমন একটা জায়গায়, যা ত্রিভূজাকৃতির বঙ্গোপসাগরের শীর্ষ বিন্দুতে গাঙ্গেয় মোহনায় অবস্থিত। এই গাঙ্গেয় মোহনার মহীঢাল সমুদ্রে নেমে গেছে। ফলে আন্দামান সাগরে উৎপন্ন ঘূর্ণিঝড়গুলোর উত্তরমুখী যাত্রায় মহীঢালের অগভীরতার কারণে জলোচ্ছ্বাস অত্যন্ত উঁচু হয়ে আসে। সাগরের জোয়ারও অপেক্ষাকৃত উঁচু হয়। তাই সাগরের লোনাপানি ঢুকে পড়ে উপকূলভাগে, লবণাক্ত করে তোলে ভূ-অভ্যন্তরের পানিও।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যেই সুন্দরবনের সুন্দরী গাছে ব্যাপক মাত্রায় আগামরা রোগ দেখা দিয়েছে। অনেকে একে মানবসৃষ্ট কারণ হিসেবে উল্লেখ করতে চাইলেও গবেষকরা একে প্রাকৃতিক কারণ হিসেবেই শনাক্ত করেছেন। সুন্দরবনের অন্যান্য গাছও আগামরা ও পাতা কঙ্কালকরণ পোকার আক্রমণের শিকার হচ্ছে। আক্রান্ত হচ্ছে বাইনের বাগানও। সুন্দরবনের বুড়িগোয়ালিনী রেঞ্জ ইতোমধ্যেই পানির উচ্চতাজনিত কারণে লবণাক্ততার শিকার। লনিয়ান রেঞ্জ আক্রান্ত হওয়ার মুখে। এই অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ যে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে, জমির উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে এবং অনেকের জীবিকা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।





