সর্বত মঙ্গল রাধে/ বিনোদিনী রাই — মাহিন চৌধুরী
সর্বত মঙ্গল রাধে/ বিনোদিনী রাই
মনে পড়ে আজাদ স্যার ক্লাসে একবার বলেছিলেন, এখন মৌলিক সাহিত্য হিসাবে যা কিছু রচিত হচ্ছে, এগুলো মূলত ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে সেই পূর্ব যুগের রচনারই ভিন্ন উপস্থাপনা। অর্থাৎ নতুন কিছু এখন সৃষ্টি হচ্ছে না।
আধুনিক বাংলা গানকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে এগুলো মূলত মধ্যযুগীয় পদাবলীর চরণাশ্রয় গ্রহণ করেই আবেদন লাভ করেছে। (যাদের মধ্যযুগীয় বাংলা পদাবলীর সাথে পরিচয় আছে তাঁরা বিষয়টি সহজে অনুধাবন করতে পারবেন)
অতি সম্প্রতি শিল্পী মেহের আফরোজ শাওন ও চঞ্চল চৌধুরীর কভার করা ‘বিনোদিনী রাই’ গানটি গায়কী, সংগীতায়োজন ও নির্মাণশৈলীর বিবেচনায় একটি শৈল্পিক উপস্থাপনা। গানটিকে কপিরাইট জটিলতার কারণে এই মুহূর্তে ইউটিউব থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, এই বলে যে গানটি ‘সরলপুর’ নামক একটি ব্যান্ডের গান, কিন্তু এক্ষেত্রে একে ‘সংগৃহিত’ বলে চালানো হচ্ছিল। এটা অবশ্যই স্বীকারযোগ্য একটি ভূল। আশাকরি কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে গানটিকে আবার শ্রোতাদের কাছে ফিরিয়ে দেবেন।
কিন্তু যেটা উহ্য থেকে যাচ্ছে তা হলো, যে গানটির মালিকানা নিয়ে এই মুহূর্তে এতো কাদা ছোড়াছুড়ি হচ্ছে এর মূল ভাবনাটি কিন্তু আমাদের চারশ বছরের পুরোনো ময়মনসিংহ গীতিকায় দ্বিজ কানাই রচিত ‘গীতিকা’র- (যাকে মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় সাহিত্যে ballad- narrative folk song বলে) ‘মহুয়া’ এবং শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন ও বৈষ্ণব পদাবলীর থেকে ধার করা। এমন কি গানটির বেশ কিছু চরণ প্রায় সরাসরিই ‘মহুয়া’ গীতিকার থেকে ব্যবহার করা হয়েছে।
কথিত আছে যে, প্রায় চারশত বছর আগে দ্বিজ কানাই নামে খ্যাত এক নমশূদ্র ব্রাহ্মণ সমাজের হীনকূল প্রান্তবাসী এক সুন্দরী কন্যার প্রেমে পড়ে পরিণতিতে অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে ‘নদের চাঁদ’ আর ‘মহুয়া’র প্রেম নিয়ে অসাধারণ এই গীতিকা ‘মহুয়া’ রচনা করেন।
এ যুগে দাঁড়িয়ে ব্যান্ড ‘সরলপুর’ না হয় নিজেদের গানের কপিরাইটের জন্য নালিশ করেছেন; প্রত্যাশাও করি যাতে তাঁরা তাঁদের প্রাপ্যটুকু বুঝে পান। কিন্তু চারশ বছর আগের বিস্মৃতির গর্ভে হারিয়ে যাওয়া খাঁটি সোনা দ্বিজ কানাই এর কী হবে; তাঁর কপিরাইটের জন্য কে লড়বেন; হৃদয়ের আগুনে পুড়ে যিনি লিখেছিলেন-
মহুয়া–‘লজজা নাই নির্লজজ ঠাকুর লজজা নাইরে তর।
গলায় কলসী বাইন্দা জলে ডুব্যা মর।।’
নদের চাঁদ — ‘কোথায় পাব কলসী কইন্যা কোথায় পাব দড়ী।
তুমি হও গহীন গাঙ্গ আমি ডুব্যা মরি।।’
ইদানীং মানুষ কপিরাইটের বিষয়ে সচেতন হচ্ছে, এটা একটা পজিটিভ পরিবর্তন। কিন্তু সেই সাথে জ্ঞানের পরিধি প্রসারের ক্ষেত্রেও সচেতন হতে হবে। আধ-খ্যাঁচড়াভাবে কোনোকিছু জেনে পরিবর্তন আনতে গেলে সেখানে নিজেদের মূর্খতাটাই প্রকাশ পায়।
বিতর্কিত গানটির লিরিক ও সুর কোনোটাই ধরতে গেলে ‘সরলপুর’ ব্যান্ডের মৌলিক সৃষ্টি নয়। সবকিছুই এখান থেকে -ওখান থেকে ধার করা। তবে হ্যাঁ, প্রকাশনার দিক থেকে এটা তাঁদের নির্মিত একটি পরিবেশনা ছিল। পরবর্তীতে যতবারই যে কেউ গানটি গেয়েছেন সবাই যার যার সংগীতায়োজনে পরিবেশন করেছেন। কিন্তু পরিবেশনের সময় কেউই ময়মনসিংহ গীতিকা কিংবা মহুয়ার কথা উল্লেখ করেন নি।
যদি সত্যিই কপিরাইট মূল্যায়ন করতে হয় তাহলে মৌলিক জনের যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের মানসিকতা তৈরি করতে হবে। বাংলা গানের বিষয়ে অনেক কিছু জানার আছে। শেকড়কে এড়িয়ে গিয়ে আধুনিকতার চর্চা করা বাতুলতা।





