‘শাহ দ্বীন ভবানন্দ- অন্তরালের প্রদীপ ’ – শামীমা এম রিতু।
পূণ্যশীলা সুরমা বিধৌত এই বৃহত্তর শ্রীহট্ট ভূমিতে যুগে যুগে জন্ম নিয়েছেন অসংখ্য গুনী-সাধক, বাউল ,মনীষী, যাদের সমৃদ্ধ সাধনার দানে ধন্য সিলেট মাতা।বৃহত্তর সিলেটের সমৃদ্ধ লোকসাহিত্যের বিশাল একটি অংশ আলোকিত করে আছে মরমী গান। যে সকল মরমী সাধক সিলেট মাতার ভান্ডার কে মরমী গানে ভরিয়ে তুলেছেন তার মধ্যে অন্যতম হলেন শাহ দ্বীন ভবানন্দ।
পরিচয় : শাহ দ্বীন ভবানন্দ সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় নি। তাই তাঁর সঠিক জন্ম সন জানা না গেলেও ধারণা করা হয় তিনি দ্বাদশ শতাব্দীর লোক এবং প্রায় সোয়া ‘শ বছর বেঁচে ছিলেন। তিনি বর্তমান মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার লংলা পরগণার নর্তন গ্রামে এক কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন।তার জন্মগত নাম ছিল ভবানন্দ ভট্টাচার্য্য। কারো করো মতে, ভবানন্দ ঠাকুর। তিনি একজন পন্ডিত এবং বিভিন্ন শাস্ত্রে তাঁর বিশেষ জ্ঞান ছিল। তাঁর এই দীর্ঘ জীবন ছিল বৈচিত্রময়। প্রথম জীবনে তিনি অন্য দশজনের মত সংসারী হলেও বিবাহিত জীবনের একটি ঘটনা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। লোকশ্রুতি আছে যে-
ভবানন্দ ৪০ বছর বয়সে বরমচাল পরগণায় বিয়ে করেন। তিনি স্বভাবত খুবই স্ত্রৈণ ছিলেন। অর্থাৎ কখনই স্ত্রীকে চোখের আড়াল করতেন না , এমনকি স্ত্রীকে একা শ্বশুরবাড়িও যেতে দিতেন না। কোন একদিন তাঁর মা তাঁর অজান্তে বৌকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেন। সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে বৌকে না পেয়ে তিনি অস্থির হয়ে উঠেন এবং গভীর রাত্রে জুড়ী নদী সাঁতরিয়ে ভেজা কাপড়ে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে উপস্থিত হন। স্বামীর এই অবস্থা দেখে তাঁর স্ত্রী বাপের বাড়ির সকলের সামনে লজ্জিত বোধ করে বলেন- ‘আপনি আমার মত নগন্য দাসীর প্রতি যেভাবে আসক্ত হয়েছেন,যদি স্রষ্টার প্রতি এরূপ আসক্ত হতেন তাহলে পরকালের জন্য কোন চিন্তা করতে হতো না ‘।
স্ত্রীর মুখে এ কথা শুনে তিনি বললেন- ‘মাগো কি বললেন, আবার বলুন’- স্ত্রী সহজভাবে পুনরায় এ কথা বলতেই তিনি ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেলেন। কয়েকদিন পর তাকে কদলী গাছের আশ্রয়ে(কলা গাছের ভেলায়) জুড়ী নদীতে ভেসে ভেসে গান গাইতে দেখা যায়, তার গানে কদলী গাছ (কলা গাছের ভেলা) উজানে বয়ে চলেছিল। সেই থেকে তিনি পুরোদমে নিখোঁজ হয়ে যান।
একজন ঘোর সংসারী স্ত্রৈণ পুরুষ মুহুর্তেই বদলে গেলেন। সংসার ছেড়ে তিনি স্রষ্টা প্রেমে উন্মুখ হয়ে উঠলেন। এক পলকে বদলে গেল এক ব্রাহ্মণের জীবনযাত্রা। হয়ে গেলেন সাগ্নিক সাধুপুরুষ।
এর প্রায় ৪০/৫০ বছর পরে তিনি সিলেটের গোলাপগঞ্জ বাজারে উপস্থিত হন এবং একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন।ভবানন্দ বৈরাগ্য ভাব নিয়ে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, বৈষ্ণব মতে তাঁর গুরু প্রদত্ত নাম ছিল ‘রাজীবংশ দাস’। তিনি যখন চোখ মুজে গান গাইতের তখন হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যেতেন। লোকমুখে ভবানন্দের আত্মপ্রকাশের খবর পেয়ে তাঁর পাগলিনী স্ত্রী সেখানে উপিস্থিত হন এবং মা সন্তানের মত কিছুদিন সেখানে বসবাস শুরু করেন।তাঁর ধর্মমাতা (পূর্বেকার স্ত্রী) মারা যাবার পর তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং শাহ দ্বীন ভবানন্দ নামে পরিচিত হন। উদাস হয়ে তিনি স্থান পরিভ্রমণ করতেন। একাগ্রচিত্তে তিনি বিধাতার আরাধনায় ব্রতী হয়ে একজন কামেল দরবেশ হিসাবে লোকমুখে পরিচিত হতে থাকেন। শেষ বয়সে তিনি ত্রিপুরা স্টেটের ধর্মনগর মহকুমার কছিমনগর পরগণায় (অবিভক্ত ভারত) একটি বাড়ি নির্মাণ ও দিঘী খনন করে সেখানেই বসত শুরু করেন। আনুমানিক সোয়া’শ বছর বয়সে সেখানেই তিনি ইন্তিকাল করেন। কাছিম নগরেই তাঁর মাজার রয়েছে । তিনি তাঁর গানে আকুতি জানিয়েছেন-
‘দ্বীন ভবানন্দে বলে জাতে ছিলাম হীন
বন্দে কি করিবা দআ কিআমতের দিন।”
সঙ্গীত সাধনা : শাহ দ্বীন ভবানন্দ স্রষ্টা প্রেমে আকুল হয়ে প্রায় ২৫০ টির মত আধ্যাত্মিক তথ্যপূর্ণ রূপক গানে দুইখন্ডে ‘মুজমা-রাগ-হরিবংশ’ নামে একটি গ্রন্থ রচন করেন। তৎকালীন সময়ে এই অঞ্চলে বাংলার প্রচলন ছিল কম এবং নাগরি ছিল সর্বাধিক প্রচলিত। যেহেতু ভবানন্দ পন্ডিত ব্যক্তি ছিলেন এবং নিরুদ্দেশ অবস্থায় বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করেন তাই স্বাভাবিক ভাবেই বাংলায় গান রচনা তাঁর জন্য কঠিন কিছু ছিল না । সিলেট তথা বাংলা সাহিত্যে এই গ্রন্থটির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব ছিল সুদূপ্রসারী। এককালে ভবানন্তের ‘হরিবংশ’ পুঁথি এই অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে ফিরত। ১৯০৬ সালে এই গ্রন্থটি সিলেটী নাগরি লিপিতে লিপ্যান্তর করে প্রকাশ করেন প্রকাশত মহম্মদ আফজল। এ প্রসঙ্গে প্রকাশক মহম্মদ আঢজল বলেছেন –
“এগারশ ছাপ্পান্ন আটাইশ পৌষেতে
লেখেছিল এক হিন্তু পুঁথি বাংলাতে ।
অনেক মেহনতে আমি সে পুঁথি পাইনু
লেখেছিল যে মতে সে মতে উঠাইনু ।
আর এক দুশতমর মহম্মদ জকি নাম ,
তিনির নাগরি এক পুঁথি পাইলাম।
আর আর পুঁথি শব একাত্তর করিয়া
লেখিলাম ভাল মতে দুরশত করিয়া।’
শাহ ভবানন্দের অনেক গানই অপ্রচলিত রয়ে গেছে। সিলেটের লোক সাহিত্যের এই অমূ্ল্য সম্পদের প্রচার অত্যন্ত জরুরী। অন্যান্য মহাজনদের চাইতে শাহ ভবানন্দের গানের প্রচার অনেক কমই বলা যায়। ‘আমি ভাবছিলাম কি এই রঙ্গে দিন যাবেরে সুজনও নাইয়া,
নাইয়া হায়রে পার কর সকাল রাধারে।’- ভবানন্দের এই গানের মত অসংখ্য হৃদয় ছোঁয়া ভাব গাম্ভীর্য পূর্ণ গান ছড়িয়ে পড়ুক নবীন প্রজন্মের মধ্যে। আমাদের লোকসাহিত্য,আমাদের গৌরব।
তথ্যসূত্র : মৌলভীবাজার জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য,রব্বানী চৌধুরী।





