সাধক শেখ ভানু – শামীমা এম রিতু।
বাংলাদেশের শুধু ধর্মীয় নয় সাহিত্য সংস্কৃতিতে ও হযরত শাহজালাল (রহ:) একটি অপরিহার্য নাম।শ্রী চৈতন্য যেমন বাংলা সাহিত্যে কোন পদ রচনা না করেও দিকপাল হিসাবে বাংলা সাহিত্য বিভাজিত হয়ে আছে। তার নামে তেমনি হযরত হযরত শাহ জালাল (রহ).ধর্ম প্রচারের সাথে সাথে তাঁর সাথে আসা সঙ্গী ও তাদের বংশধরেরা বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতিতে অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছেন।শেখ ভানু তেমনি একজন।
সুফি শেখ ভানু শাহ প্রখ্যাত আউলিয়া হযরত সৈয়দ শাহ নূর (রহ.) এর জন্মভূমি হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলাধীন বামৈ ইউনিয়নের অন্তর্গত ভাদিকারা গ্রামে ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহন করেন। পিতা মুন্সি নাছির উদ্দিন। মাতার নাম জানা যায়নি। তিনি ছিলেন পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান। (সূত্র: সুফি দার্শনিক কবি শেখ ভানু: তারফদার মুহাম্মদ ইসমাইল) মাত্র দশ বছর বয়সে সংসারের হাল ধরতে তিনি ফল-ফলাদি বিকি-কিনির কাজে আত্মনিয়োগ করেন। অত্যন্ত দক্ষতার দরুন ব্যবসা পরিচালনার ফলে তিনি ফল-ফলাদি বাদ দিয়ে ধানের ব্যবসা শুরু করে ‘ভানু বেপারী’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ঐ সময় নিজ গ্রামের কন্যা সার বানুকে বিবাহ করেন। সার বানুর কোলে কোন সন্তান না আসায় তিনি বামৈ গ্রামের জুলেখা বিবিকে বিবাহ করেন। কিন্তু স্রষ্টার লীলা বুঝার সাধ্য কার আছে! সন্তানের মুখ আর দেখা হলনা। তখনো শেখ ভানু শাহ নশ্বর পৃথিবীর ভোগ-বিলাসে মত্ত ছিলেন।
একদিনের ঘটনা- বড় একটি নৌকায় ধান বোঝাই করে ভৈরব বাজারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন ভানু শাহ। হঠাৎ দৃষ্টি পড়ল নদীর উপর। কয়েকটি কাক নদীতে একটি মৃত লাশের বুুকের উপর বসে চোখ টেনে টেনে খাচ্ছে। দৃশ্যটি দেখে শেখ ভানু শাহ কেঁদে ফেললেন। ভাবনার অন্তরালে হারিয়ে গেলেন শেখ ভানু:
সোনার বরণ দেহ কেন কাক টেনে টেনে ছিড়ে খায়?
‘হাউল’ দশার সৃষ্টি হল। গোমস্তাকে নৌকা ভিড়াতে নির্দেশ দিয়ে বললেন- ধানের হিসাব মহাজনকে বুঝিয়ে দিও। আমার আর ব্যবসার দরকার নেই। আপনমনে হাসতে শুরু করলেন।
একদিন সংবাদ এলো, গাওসুল আজম বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.) এর দরগাহের একজন খাদেম বেলায়তপ্রাপ্ত কামিল সাধক সৈয়দ নাছির উদ্দির ওরফে মিরান শাহ স্থানীয় বামৈ বাজারের কাছে নোঙ্গর ফেলে যাত্রা বিরতি করছেন। শেখ ভানু শাহ’র বন্ধুদের কাছে রোগীর হালত শুনে মিরান শাহ ছোট নৌকাযোগে ভানু শাহ’র বাড়িতে আসেন। সারারাত জিকির-বয়ান করে কাটালেন। শেখ ভানু তাঁর প্রশ্নের উত্তর পেলেন। কলব বা দম দেহ পিঞ্জিরা থেকে বেরিয়ে আল্লাহর আদেশে তার কাছে চলে যায়। শেখ ভানু শাহ মিরান শাহের কাছে বয়াত হলেন এবং ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। ধানের ব্যবসা তথা দুনিয়াদারীর সবকিছু ফেলে শেখ ভানু শাহ আধ্যাত্মিক সাধনায় নিয়োজিত হলেন। চল্লিশ বছর অতিবাহিত হলো। আধ্যাত্মিক সাধনায় শেখ ভানু শাহ হাল থেকে মাকামে পৌঁছে গেলেন। মুখের জবান বন্ধ হয়ে গেল। টানা তিন বছর একই অবস্থায় পড়ে রইলেন। হঠাৎ এশকে এলাহী প্রেমে উতলা ক্বলব থেকে বের হতে লাগল-
“কান্দিয়া না পাইলাম তোর দীদার-
বন্ধুয়া গো
রইল দুঃখ দীলেতে আমার”।
আপনমনে গান গাইতে লাগলেন শেখ ভানু শাহ। তখন বন্ধু-বান্ধব মিলে পরামর্শ করলেন লিখে রাখা দরকার। অনবরত ভানু শাহ বিছানায় শুয়ে শুয়ে পিয়ারীর রূপ লাবণ্যের গান গাইতে লাগলেন এবং বন্ধুগণ লিখতে লাগলেন। অসংখ্য মর্সিয়া গজল রচনা করেন শেখ ভানু শাহ। যা আজো সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জের মানুষদের মুখে মুখে ফোটে:
নিশিতে যাইও ফুলবনে রে ভ্রমরা
নিশিথে যাইও ফুলবনে
নয় দরজা করি বন্ধ লইও ফুলের গন্ধ
অন্তরে জপিও বন্ধের নাম রে ভ্রমরা
নিশিতে যাইও ফুলবনে
অধীন শেখ ভানু বলে
ঢেউ খেলাইও আপনদিলে
পদ্ম যেমন ভাসে গঙ্গার জলে রে ভ্রমরা
নিশিথে যাইও ফুলবনে।
পদ্ম কখনো গঙ্গার জলে ভাসেনা। পদ্ম ভাসে বিলে। কিন্তু শেখ ভানু শাহ’র মত সুফি দরবেশ পদ্মকে গঙ্গার জলে ভাসাতে সক্ষম। মহান পিয়ারীর প্রেমে কতজনা জঙ্গলায় বাস নিল। কিন্তু কারো দেখা হলনা প্রিয়ার সাথে।
শেখ ভানু শাহ’র বয়স ৭০ উত্তীর্ণ হওয়ার সন্নিকটে। বার্ধক্যে ভোগছিলেন তিনি। অবস্থার কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। হঠাৎ ভানু শাহ বললেন- ‘আমারে উঠাও।’ তায়াম্মুম করে ওযু করলেন। ফজরের আজানের বাকি আছে। ভানু বললেন- ‘আমারে মায়ের কাছে কবর দিও, হুজুর কেবলা জানাযা পড়াবেন, তোমরা সকলে মাফ কইরা দিও। সাথে সাথে কালেমা শাহাদাত পাঠ করে তাসাউফ সাধনার সফল পুরুষ প্রিয়ার সান্নিধ্যে চলে যান। নিজ গ্রামের মসজিদের উত্তর পাশে মা ও ছেলে শায়িত আছেন। দেওয়ালে রাস্তার দিকে খোদাই করে ছোট করে লেখা- হযরত শেখ ভানু শাহ (রহ.) মাজার।
মাজারে কোন উল্লেখযোগ্য ভবন নেই। তবে প্রতি বৎসর পৌষ মাসের ১৪ তারিখে উক্ত মাজারে ওরশ শরীফ ও মেলা অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মরমী সাধক সহ পর্যটকদের সমাবেশ ঘটে। মরমী সাধক শেখ ভানু সিলেটের লোক কবি ও মরমী সাধকদের মধ্যে অন্যতম। ১৯৩৩ সালে ‘‘ বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির’ উদ্যেগে কলকাতায় অনুষ্ঠিত সাহিত্য সম্মেলনে বাংলাদেশের মরমী কবিদের মধ্যে চারজনকে দার্শনিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল, চারজন হলেন লালন শাহ, শেখ ভানু শাহ, শেখ মদন শাহ ও হাসন রাজা। শেখ ভানু শাহের বিভিন্ন গান নিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনে শিল্পী মোস্তফা জামান আব্বাসীর উপস্থাপনায় অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়েছে। বর্তমানে শেখ ভানুশাহের ভাগ্নির পুত্র বাদশা মিয়া দরগা বাড়ীর খাদেম এবং প্রপৌত্র মোঃ আব্দুল মোতালিব শেখ ভানু শাহের ঘরে বসবাস করেন।
তথ্য সূত্র: শেখ ভানু, উইকিপিডিয়া।
দৈনিক সিলেটের ডাক।





