গল্পঃ দূহিতা —- রিফাত মুনীর ইতি
সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে ফোন দিল ছেলে। আমি অফিস থেকে বেরিয়েছি কেবল। শ্রাবণের আকাশে ঘন মেঘ, শীতল হাওয়া বইছে, যদি ও একপশলা বৃষ্টি হয়ে যাবার পর, এখন বৃষ্টিহীন।
হ্যা, বাবা বলো, আমি সাধারন গলায় জানতে চাইলাম।
পাপা, তুমি কোথায়?
ছেলে আমাকে বাবা বলেই ডাকে, মাঝে মাঝে আব্বু, কিন্তু যখন পাপা ডাকে, তখন ধরে নিতে হবে কোন সিরিয়াস কথা বলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। আতংক কিছুটা ভর করলো আমার ওপর।
আমি যতদূর সম্ভব গলা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি
এইতো বেরিয়েছি, কেন?
সীমানা এখনো ফেরেনি পাপা।
আসবে চলে, কারো বাসায় গিয়ে আটকা পড়েছে হয়তো।
পাপা, ওর ফোনেও পাচ্ছি না।
আমি আসছি।
আমি বাসায় এসে যা শুনলাম, তাতে আমার মতো সাহসী মানুষও ঘাবড়ে গেলাম।
মেয়ে বেরিয়েছে একটার দিকে সম্ভবত, অন্তত, বাসার গৃহকর্মীর তেমনটাই ধারনা। তার এত বছরের জীবনে, কখনো বিকেল চারটার বেশি বাইরে থাকেনি। একটু ঘরকুনোই বলা যায়। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া সে ঘরের বাইরেও পা দেয় না।
সেই মেয়ে আমার দীর্ঘ সাড়ে ছয় ঘন্টার বেশি বাইরে এটা ভাবতে অবাক লাগছে।
আমার ছেলেটা ড্রইংরুমে গম্ভীর মুখে বসেছিল।
পাপা, মুখ খুললো সে, আমি সবগুলো সম্ভাব্য স্হানে খোঁজ নিয়েছি।
খোঁজ বলতে ওর বন্ধুদের নম্বর। যেখানেই যাক্, রিং করে জানাবে না?
আমি সত্যি সত্যি টেনশনে পড়ে গেলাম। ছেলে বুঝলো সম্ভবত। বললো, তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও দেখি।
নিজের রুমে এসে, আমি কখনো যা করিনা সেটা করলাম। লাইটার বের করে সিগারেট ধরালাম।
উৎকন্ঠায় আমার শরীর হিম হয়ে আসছে। কোথায় গেল আমার মা মরা মেয়েটা। স্ত্রী চলে যাবার পর, দুটো ছেলে মেয়েকে নিয়ে দীর্ঘ একটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। মেয়ে ম্যাডিকেলে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী শেষ বর্ষে। ছোট থেকেই খুব একটা জ্বালায়নি। বুঝতে পারতো, মা নেই, বাবার কষ্ট হবে। কোনদিন বিশেষত লেখা পড়ার ব্যাপারে তাদের কিছু বলতে হয়নি। খাওয়া নিয়ে জ্বালাতো। ছোট বেলায় নিজেদের কাপড় বা অন্যান্য জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখতে পারত না। ছেলে সাহায্য করত। ছেলে আমার খুব গোছানো। নানান আবোল তাবোল চিন্তা মাথায় আসছে। নিজেকে বোঝাচ্ছি, ইনশাআল্লাহ ফিরবে এখনই, শুধু শুধু ভাবছি।
মেয়ে ফিরলো রাত সাড়ে আটটার দিকে। ছেলে তড়াক করে, উঠে বোনের কাছাকাছি চলে যাবার আগেই আমি তার হাত টেনে ধরে, নিজেই একটা চড় বসিয়ে দিলাম। একটা কথাও বলিনি। রুমে এসে দরজা আটকে বসে রইলাম। আমার সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগলো।
আমি ঘর থেকে বের৷ হলাম রাত সাড়ে দশটার পরে, তাও মেয়ের ডাকে। বাবা, খেতে এসো। বেশির ভাগ সময় আমি খাবার গরম করে ওদের ডাকি। মেয়ে মাঝে মাঝে করে। আজ এই পরিবর্তন চোখে পড়লো হঠাৎই। আমি দরজা খুলে দেখি মেয়ের ফর্সা মুখ লাল হয়ে আছে, চোখ ফোলা, কেঁদেছে হয়তো। হঠাৎ করে মনে হচ্ছে, মেয়েটা অনেক বড় হয়ে গেছে।
আসছি, খুব ছোট্ট একটা উত্তর দিলাম। মেয়ে দাঁড়ালনা।
খাবার টেবিলে দেখি ছেলেটা ও বসে আছে। বোনের অপমানে তার চোখ ও ভেজা মনে হচ্ছে। হয়তো নিজে মারলে ও এতটা কষ্ট পেতো না।
ভাইয়া, মেয়ের গলা স্বাভাবিক, ওই করল্লা ভাজির বাটিটা একটু দেতো। ছেলে নিঃশব্দে এগিয়ে দিলো। টেবিলের নিস্তব্ধতা ভাঙা উচিত। কিন্তু, আমার কথা আটকে আসছে, খেতে ও ইচ্ছে করছে না, শুধু পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য বসা।
মেয়ের রুমের দরজা খোলা দেখলাম, রাত দেড়টার দিকে। আমার নিজের ইনসমনিয়া আছে, মাঝে মাঝে রাতে উঠে আমি হাঁটি। মেয়ে কিন্তু কখনো এত রাত জাগেনা। অনেক অনেক রাত আমি ওর রুমে এসে দেখেছি, বিড়ালের মত গুটিশুটি মেরে পড়ে আছে। ওর অবিন্যস্ত চুল মুখে, গলায়। কতদিন বলেছি, চুল বেঁধে শুতে, শোনেনি।
মেয়ের খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে উঁকি দিতেই দেখি, সে জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার দীঘল চুল ছড়িয়ে আছে পিঠে।
ঘুমাসনি? আমি গলা শান্ত রাখার চেষ্টা করছি।
বাবা সরি, মেয়ে হঠাৎ বলে উঠলো।
তারপর, আমাকে কিছু না বলেই শুরু করলো, ফোনে চার্জ ছিলনা,বাবা। আমি মুন্সিগঞ্জ গিয়েছিলাম। আমাদের এক বন্ধুর বাড়িতে পানি উঠেছে, নীচু এলাকা।খুব বিপদে পড়েছে বেচারা। আমরা সেকেন্ড ইয়ারের কয়েকজন মিলে ওকে সাহায্য করতে গিয়েছিলাম। হঠাৎই সিদ্ধান্ত। একবার তোমার কথা মনে পড়ছিল, চিন্তা করবে হয়ত। কিন্তু উপায় ছিলনা। ওদের সবকিছু ভেসে গেছে বাবা, ওর বইপত্র সব…
এত দেরি হতোনা। মাঝখানে রোডে একটা এক্সিডেন্ট হওয়ায় আমাদের গাড়ি আটকে ছিল অনেকক্ষন…
আমি মেয়ে টার মাথায় হাত রাখলাম, হঠাৎই মেয়েটা এত বড় হয়ে গেল কখন বুঝতে পারছি না।
মা, আসলে. …
মেয়ে আমার কথা কেড়ে নিলো।
থাক্ বাবা। তুমি কখনো আমাকে মারোনি তো, তাই ভাবছিলাম, তোমার হয়তো বেশি কষ্ট হচ্ছে।
আমি মেয়েকে কাছে টেনে নিলাম। আমার কাঁধে মুখ রেখে ফুঁপিয়ে উঠলো মেয়ে। দেয়ালে টানানো আমার স্ত্রী ঠিক সেই ভাবে হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে আছে।
চশমা খুলে ফেলতে হলো আমার। ঝাপসা চোখে কি কিছু দেখা যায়?
রিফাত মুনীর ইতি।
ঢাকা।





