সমীকরণ এতো সহজ নয়।
অনেকে মনে করেন ট্রাম্প ভেনিজুয়েলাকে দখল করতে চায় তেল বা মাদকের কারণে। কিন্তু বাস্তবতা আরও কৌশলগত। ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য ভেনিজুয়েলার তেল নয়, বরং সেই তেল যেন চীনের হাতে না যায়। ভেনিজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরেই চীনের ঋণনির্ভর অর্থনীতির অংশ, এবং তেলের মাধ্যমে চীন সেখানে প্রভাব বিস্তার করছে। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এটি শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়—এটি শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্ন। তাই ভেনিজুয়েলা নিয়ে আমেরিকার আগ্রাসী নীতি আসলে চীনকে ঠেকানোর একটি উপায়।
একই যুক্তি গ্রীনল্যান্ড প্রসঙ্গেও খাটে। অনেকেই ট্রাম্পের গ্রীনল্যান্ড কেনার প্রস্তাবকে হাস্যকর মনে করলেও এর পেছনে রয়েছে গভীর ভূরাজনৈতিক হিসাব। আর্কটিক অঞ্চলে বরফ গলে যাওয়ায় নতুন সামরিক ও বাণিজ্যিক রুট তৈরি হচ্ছে। রাশিয়া সেখানে নিজেদের উপস্থিতি শক্তিশালী করছে। গ্রীনল্যান্ডে প্রভাব বজায় রাখা মানে আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার আগ্রাসন, এমনকি ভবিষ্যতে আলাস্কা ঘিরে সম্ভাব্য হুমকি ঠেকানোর একটি কৌশলগত দেয়াল তৈরি করা।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে ইসরাইল ও আমেরিকার অবস্থানও একই সূত্রে বাঁধা। ইরান শুধু একটি রাষ্ট্র নয়; এটি একটি আদর্শিক ও সামরিক প্রভাবক, যা হিজবুল্লাহ, হামাস এবং অন্যান্য প্রক্সি শক্তির মাধ্যমে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার করছে। ইরানকে দুর্বল বা ধ্বংস না করতে পারলে মধ্যপ্রাচ্য কখনোই পুরোপুরি ইসরাইল-আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে আসবে না। তাই পারমাণবিক ইস্যু হোক বা মানবাধিকার—সবই আসলে কৌশলগত লক্ষ্য পূরণের হাতিয়ার।
এই প্রেক্ষাপটে অনেকেই ভাবছেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য। কিন্তু আমার ধারণা, বিশ্ব সেই পথে হাঁটবে না। কারণ সরাসরি মহাযুদ্ধ মানে সবাই হারবে—বিশেষ করে পরাশক্তিরা। তার বদলে আমরা দেখছি খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ, প্রক্সি যুদ্ধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সাইবার যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বিস্তার। ইউক্রেন, গাজা, ইয়েমেন, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল—সবই সেই বৃহত্তর অঘোষিত যুদ্ধের অংশ।
বিশ্বযুদ্ধ নয়, বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী অস্থির বিশ্বব্যবস্থার দিকেই আমরা এগোচ্ছি, যেখানে যুদ্ধ হবে সীমিত, কিন্তু চাপ থাকবে সার্বক্ষণিক। শান্তি থাকবে কাগজে-কলমে, আর যুদ্ধ চলবে নীরবে, বিভিন্ন প্রান্তে, ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে।




