ওমিক্রনে ছেয়ে যাচ্ছে বিশ্ব।
করোনা ভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের দেশগুলোতে অতি দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। স্বস্থিতে নেই বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোও। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও ধীরে ধীরে জাল বিস্তার করছে ওমিক্রন। ইতোমধ্যেই করোনা ভাইরাসের এই নতুন ভ্যারিয়্যান্টের জেরে লকডাউন জারি হয়েছে মুম্বাইয়ে। এবার অন্ধ্রপ্রদেশেও ধরা পড়ল প্রথম ওমিক্রন সংক্রমণ। শঙ্কার কথা হলো যে, বাংলাদেশেও ইতিমধ্যে ওমিক্রণ পৌঁছে গেছে। যদিও দুইজনের পর ওমিক্রণে আক্রান্ত হওয়ার আর কোন খবর পাওয়া যায়নি।
করোনা ভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন গোটা বিশ্বেই অপ্রত্যাশিত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা (ডব্লিউএইচও)। ইতোমধ্যে ৭৭টি দেশে ওমিক্রনের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেলেও এর চেয়ে বেশি দেশে তা ছড়িয়েছে বলে মনে করেন ডব্লিউএইচওর প্রধান তেদ্রোস আধানম গ্যাব্রিয়েসুস। নতুন করোনা ভাইরাস মানবদেহে সংক্রমণের পর অসংখ্যবার রূপবদল করলেও এক বছরের বেশি সময় পর ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টই মহামারীর মাত্রা ভয়াবহ করে তোলে। এরপর কোভিড টিকা যখন মহামারী নিয়ন্ত্রণের আশা দেখাচ্ছে, তখন গত নবেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকায় ধরা পড়ে ভাইরাসটির নতুন রূপ ওমিক্রন।
করোনা ভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রনে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে ভারতে। এরই মধ্যে দেশটিতে ওমিক্রন রোগীর সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে। এতে ভারতের ১৯টি জেলাকে ‘সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে আবারও সতর্কতা জারি করেছে দেশটি।
গতকাল শুক্রবার ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটিতে করোনার নতুন ধরন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সেখানে এ পর্যন্ত ১০১ জনের শরীরে ওমিক্রনের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। এ অবস্থায় সবাইকে করোনা সম্পর্কিত স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে তারা। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলেছে, ভিড়ের মধ্যে গেলে সবাইকে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে, সামাজিক দূরত্বের বিধি মেনে চলতে হবে এবং অনাবশ্যক ভ্রমণ থেকে বিরত থাকতে হবে। অতিরিক্ত জনসমাগমের মধ্যে না যাওয়াই ভালো।
রাজধানী দিল্লীতে নতুন করে ১০ জনের ওমিক্রন শনাক্তের পরপরই এই নির্দেশনা দিয়েছে ভারতীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। দেশটিতে করোনার আগের ঢেউগুলোতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্য মহারাষ্ট্র ওমিক্রন সংক্রমণের দিক থেকেও এগিয়ে। সেখানে এ পর্যন্ত ৩২ জনের ওমিক্রন শনাক্ত হয়েছে। এর বাইরে কর্ণাটক, গুজরাট, কেরালা, তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গ এবং অন্ধ্র প্রদেশে ওমিক্রন রোগী পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ওমিক্রনের দুজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। নতুন এই ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে যুক্তরাজ্য।
হংকংয়ের একটি বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, সংক্রমণের ২৪ ঘণ্টা পরে মানব ব্রঙ্কাসে ওমিক্রনের বিস্তারের সুপারচার্জড গতি পাওয়া গেছে। মাইকেল চ্যান চি-ওয়াইয়ের নেতৃত্বে ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের একদল গবেষক এই গবেষণায় অংশ নেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের ফুসফুসের টিস্যুতে সংক্রমণের মাধ্যমে মূল করোনা ভাইরাস যে ধরনের গুরুতর ক্ষতি করতে পারে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে গুরুতর অসুস্থতার সম্ভাবনা তার চেয়ে ‘১০ গুণেরও অধিক’ কম। এতে আরও বলা হয়েছে, একজনের কাছ থেকে অন্যজন সহজে সংক্রমিত হলেও ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আক্রান্ত ব্যক্তির ফুসফুসের ততটা ক্ষতি করে না যতটা ভাইরাসের পূর্ববর্তী স্ট্রেনগুলো করতে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম শনাক্ত হওয়ার পর গত তিন সপ্তাহের বেশি সময়ে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বিশ্বের ৭৭টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে ওমিক্রন। তবে ভাইরাসের এই ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্তদের কেবল হালকা উপসর্গ দেখা দিচ্ছে এবং তাদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন পড়ছে না। ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের গবেষণায়ও মূলত এই বিষয়টিই উঠে এসেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওমিক্রন সুপার-স্প্রেডার, দ্রুতগতিতে ছড়াতে পারে। তবে এর গুরুতর অসুস্থতা সৃষ্টির ক্ষমতা ভাইরাসের ডেল্টা ধরনের চেয়ে অনেক কম। ওমিক্রনের কারণে কোনো জটিল রোগও হতে দেখা যায়নি।
এছাড়া ডেল্টার চেয়ে ওমিক্রনে সংক্রমণের উপসর্গও কিছুটা আলাদা। ওমিক্রনে সংক্রমিতদের সাধারণ কিছু উপসর্গ হচ্ছে- প্রচন্ড মাথা ব্যথা, হাত-পাসহ শরীর ব্যথা, গলা ব্যথা, ক্লান্তি ও গলা শুকিয়ে যাওয়া। এছাড়া ওমিক্রনে আক্রান্ত হলে পালস রেট এবং শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এর পাশাপাশি সংক্রমণ বেশি হলে প্রচন্ড ক্লান্তি, শরীর ব্যথা ও মাথা ব্যথা শুরু হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বৃহস্পতিবার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, করোনা ভাইরাসের ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট যুক্তরাষ্ট্রে অতি দ্রুতগতিতে ছড়ানো শুরু করবে। তিনি মার্কিন নাগরিকদের টিকা বা বুস্টার ডোজ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যারা এখনো টিকা নেননি এই শীতে তাদের মারাত্মকভাবে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আপনারা টিকা নিলে এই মারাত্মক ঝুঁকির হাত থেকে রক্ষা পেতে পারেন।
জো বাইডেন বলেন, মহামারি করোনাসভাইরাস দুঃস্বপ্নের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আমেরিকার স্নায়ুবিক চাপ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গত ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নতুন করে দৈনিক গড় আক্রান্তের হার ছিল ৮৬ হাজার। সেখানে ১৪ ডিসেম্বর এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৭ হাজারে। এ সময়ের ব্যবধানে আক্রান্তের হার ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাইডেন বলেন, যারা ইতোমধ্যেই ভ্যাকসিনের দুই ডোজ নিয়েছেন তাদের বুস্টার ডোজ এবং যারা এখনো টিকা নেননি তাদের টিকা নিতে হবে। এদিকে জি-৭ এর স্বাস্থ্যমন্ত্রীরা করোনাবাইরাসের ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। এ ভ্যারিয়েন্টকে তারা বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবে অভিহিত করেন।





