#সিলেট বিভাগ

প্রবীণ রাজনীতিবিদ লুৎফুর রহমান আর নেই।

সিলেট প্রতিনিধিঃ
বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, সিলেট জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট লুৎফুর রহমান আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না রাজিউন)। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে সিলেট নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গত বুধবার দিনগত রাত থেকে এ হাসপাতালে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিলো ৮১ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

পারিবারিক সূত্র জানা যায়, মৃত্যুর দুইদিন আগে ডায়রিয়ায় ও বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাঁকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হওয়ায় গত বুধবার রাতে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এডভোকেট লুৎফুর রহমানের জানাজার নামাজ আজ শুক্রবার বেলা আড়াইটায় নগরীর আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে অনুষ্ঠিত হবে এবং নগরীর মানিকপীর (রহ.) কবরস্থানে লাশ দাফন করা হবে। এর আগে এডভোকেট লুৎফুর রহমানের মরদেহ আজ শুক্রবার দুপুর ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত সিলেট জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে রাখা হবে। সেখানে আওয়ামীলীগসহ বিভিন্ন মহল মরদেহে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করবেন।

সাবেক গণপরিষদ সদস্য, সজ্জন রাজনীতিবিদ এডভোকেট লুৎফুর রহমানের মৃত্যুতে সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মৃত্যুর খবর পেয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা হাসপাতালে ও নগরীর আম্বরখানা বড়বাজারে তাঁর বাসভবনে ছুটে যান।

এডভোকেট মো: লুৎফুর রহমান সিলেট জেলার সাবেক বালাগঞ্জ থানা বর্তমানে ওসমানীগর উপজেলাধীন ৩ নম্বর পশ্চিম পৈলনপুর ইউনিয়নের বড়হাজীপুর গ্রামে ১৯৪০ সালের ৮ ডিসেম্বর জন্ম গ্রহণ করেন।

নিজ গ্রামের সরকারী প্রাথমিক স্কুলে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। পরে মৌলভীবাজার জেলার সরকারী হাইস্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে কৃতিত্বের সাথে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাশ করেন। ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে সিলেট এম.সি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন এবং একই কলেজ থেকে আই.এস.সি এবং বিএসসি পরীক্ষায় পাশ করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন এবং এল.এল.বি পাশ করে সিলেট জেলা কোর্টে আইন পেশায় যোগদান করেন।

তিনি ১৯৬২ সালে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে সিলেট জেলা ছাত্রলীগ পুনর্গঠন করেন। ওই বছর সিলেটে ছাত্রলীগ তাঁর নেতৃত্বে আইয়ূব খান বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলে। একই সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৩ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে সিলেট থেকে তাঁর নেতৃত্বে ১০ জন কাউন্সিলর যোগদান করেন।

তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন। সামরিক সরকারের দশটি বেত্রাঘাতের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে ছয় দফার পুস্তিকা বিতরণ করেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করেন ।

১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু তাঁকে প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেন এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে তিনি বালাগঞ্জ থানা এবং ফেঞ্চুগঞ্জ থানা নিয়ে গঠিত নির্বাচনী এলাকা থেকে বিপুল ভোটে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। এসময় তিনিসহ সিলেটের আরও কয়েকজন এমপিএ আসামের করিমগঞ্জ শহরে অবস্থান করে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে পুনর্বাসন কাজে তিনি যোগ দেন। ১৯৭২ সালে তিনি গণপরিষদের সদস্য হন এবং হাতে লেখা সংবিধানে একজন দস্তখতকারী এবং সংবিধান পাশ করায় অংশ গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পরে তাকে আটক করে অনেক নির্যাতন করা হয়। তিনি সিলেট জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যান। প্রথমে জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর সিনিয়র সহ-সভাপতি, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৬ সালের ২১ শে জুলাই তিনি সিলেট জেলা পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্বে নিয়োগ পান এবং ওই বছর ডিসেম্বরে জেলা পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে তিনি চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন।

মরহুমের জামাতা সাউথ ইস্ট ব্যাংকের কর্মকর্তা আহমদ কবির রাসেল জানান, হার্ট ফেইলিওর হওয়ায় বুধবার রাতে তার শ্বশুরকে মাউন্ট অ্যাডোরা হাসপাতালের আইসিইউতে নেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বৃহস্পতিবার তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সযোগে ঢাকায় নেয়ার প্রস্তুতি চলে কিন্তু অবস্থা স্থিতিশীল না হওয়ায় চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে ঢাকায় না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন স্বজনরা।

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী জানান, প্রবীণ রাজনীতিবিদ এডভোকেট লুৎফুর রহমানের জানাজাস্থল সিলেট সরকারি আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে মাটি ভরাটসহ অন্যান্য আনুষাঙ্গিক কাজ গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে শুরু করেছেন সিসিক কর্মীরা। সিসিকের কর্মীরা রাতে মাঠের সংস্কার কাজে নিয়োজিত ছিলেন বলে জানান মেয়র।
তথ্যসূত্রঃ সিলেটের ডাক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *