পর্যটকদের আনাগোনা কম থাকায় হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান প্রাণ ফিরে পেয়েছে!
এম হায়দার চৌধুরী, হবিগঞ্জ:: বৈশ্বিক আতঙ্ক কেভিড-১৯ মহামারির প্রভাবে এক সঙ্কটকাল অতিক্রম করছে গোটা বিশ্ব। দেশে এ ভাইরাসটির সংক্রমণ ও বিস্তার প্রতিরোধের প্রয়োজনে সরকার কর্তৃক সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। জারীকৃত বিধান বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সকল গণপরিবহনসহ দোকানপাট মার্কেট ইত্যাদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালু রয়েছে। এর প্রভাবে হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে পর্যটকের পদচারণা না থাকায় বন্যপ্রাণী ও বৃক্ষরাজির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। পর্যটকের আনাগোনা না থাকায় এখন উদ্যানময় প্রণিদের নির্র্ভয়ে বিচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও বিস্তার প্রতিরোধের লক্ষ্যে আরোপিত লকডাউনে দুই দফায় প্রায় দেড় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান। লকডাউনের ফলে সাতছড়ি বনে নেই কোনো কোলাহল, নেই মানুষের কোনো আনাগোনা। নীরব নিস্তব্ধ বনময় নির্ভয়ে নির্বিঘ্নে প্রাণ খুলে ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রাণিকুল। প্রাণিকুলের মতোই উদ্ভিদজগৎও দীর্ঘ বিরতি পেয়ে আপন গতিতে বেড়ে উঠছে। তাই নানান জাতের বৃক্ষরাজি আর লতাগুল্মে এখন ভরে উঠছে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান। গাছগুলোর যেমনি বেড়েছে ডালপালা, তেমনি প্রকৃতিতে প্রাণ ফিরে পেয়েছে বিপন্ন বনভূমি ও বন্যপ্রাণী।
পর্যটক ও ভ্রমণ পিপাসুদের আকৃষ্ট জন্য করার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে নির্মিত স্থাপনাগুলো এখন দৃষ্টিনন্দন পশু-পাখির দখলে চলে গেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় এ উদ্যানে বসবাসরত পশু-পাখিরা এমন একটি সুসময়ের অপেক্ষা করছিল যুগযুগ ধরে। কোন ধরণের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই তারা বিচরণ করছে নিরবে নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে।
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানটি হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার পাইকপাড়া ইউনিয়নের রঘুনন্দন পাহাড়ে অবস্থিত। সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের প্রাকৃতিক উদ্যানের একটি। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ/সংশোধন আইনের বলে ২৪৩ হেক্টর এলাকা নিয়ে ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে “সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান” প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই উদ্যান অভ্যান্তরে সাতটি পাহাড়ি ছড়া আছে, বিধায় এর নামকরণ হয় সাতছড়ি। (যার অর্থ: সাতটি ছড়াবিশিষ্ট)। সাতছড়ি অরণ্যের পূর্ব নাম ছিলো “রঘুনন্দন হিল রিজার্ভ ফরেস্ট”। এ উদ্যানের কাছাকাছি ৯টি চা বাগান রয়েছে। এর পশ্চিম দিকে সাতছড়ি চা বাগান এবং পূর্ব দিকে চাকলাপুঞ্জি চা বাগানসহ মোট নয়টি চা-বাগান রয়েছে এর আশপাশে।
তথ্যে জানা যায়, এ উদ্যানের অভ্যন্তরে টিপরা পাড়ায় একটি পাহাড়ী উপজাতির ২৪টি পরিবার বসবাস করে। ২শটিরও বেশি প্রজাতির গাছপালা রয়েছে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে। এর মধ্যে শাল, সেগুন, আগর, গর্জন, চাপালিশ, পাম, মেহগনি, কৃষ্ণচূড়া, ডুমুর, জাম, জামরুল, সিধাজারুল, আওয়াল, মালেকাস, ইউক্যালিপটাস, আকাশমনি, বাঁশ, বেত-গাছ ইত্যাদির পাশাপাশি নাম না জানা অসংখ্য বৃক্ষরাজী রয়েছে এ অরণ্যে। ১৯৭ প্রজাতির জীব-জন্তুর মধ্যে প্রায় ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ৬ প্রজাতির উভচর প্রানি রয়েছে। আরো আছে প্রায় ১৫০-২০০ প্রজাতির পাখি। এ অরন্যটি বাংলাদেশের একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং পাখিদের একটি অভয়াশ্রম। এ বনে লজ্জাবতী বানর, উল্লুক, চশমাপরা হনুমান, শিয়াল, কুলু বানর (Macaque), মেছোবাঘ, মায়া হরিণ ইত্যাদি উল্লেখ যোগ্য।
সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মুনতাসির আকাশ ঘুরে গেছেন এ অরণ্য। তিনি জানালেন, সাতছড়ি উদ্যানে ফিরে আসছে বিপন্ন প্রজাতির প্রাণীগুলো। বৃদ্ধি পাচ্ছে নানান প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও পাখির সংখ্যা। তিনি বলেন, দেশের আর কোনো বনে এমন প্রাণীর দেখা মিলছে না। প্রকৃতি স্বরূপে ফিরে গেছে এখন সাতছড়ি উদ্যানে। সেখানে গেলে মনে হয় এদেশের পরিবেশ প্রতিবেশ যেমন থাকার কথা, তার শতভাগই আছে সাতছড়িতে। চলতি বছরে সাতছড়ি বনে দু’জন ফটোগ্রাফারের তোলা দু’টি ছবি আলাদাভাবে আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছে।
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের রেঞ্জ কর্মকর্তা মাহমুদ হোসেন বলেন, উদ্যানে এখন মানুষের পদচারণা না থাকায় পশুপাখির কলতান বেড়েছে। বেড়েছে নানা প্রজাতির প্রাণীর অবাধ বিচরণ। এছাড়া সবুজ বন এখন প্রকৃতরূপে ফিরে পেয়েছে তার আসল চেহারা। বনে নানা উদ্ভিদকুলের পাশাপাশি বেড়েছে নানান ধরনের প্রাণীও।
বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের যতগুলো বন আছে, তার মধ্যে বন্যপ্রাণীর জন্য সাতছড়ি ঘণ অরণ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি বন। মাত্র ২৪৩ হেক্টর বন নিয়ে গঠিত এ উদ্যানে দেশের বিপন্ন ও বিলুপ্ত নানান প্রাণীর দেখা মিলছে এখন। আমাদের এ বনকে রক্ষা করতে হবে, রক্ষা করতে হবে প্রাণীদের। তবেই প্রাণ ফিরে পাবে আমাদের বনবনানী ও সবুজ পরিবেশ।





