#সাহিত্য ও সংস্কৃতি

রঙে কি বা আসে যায় – আমিনা তাবাস্সুম।

(১)
আমি কালো ছিলাম বলে ছোট বেলায় আমার আদরের নাম ছিল “বেগুনী” আর “সবুজ”। “আমার বেগুনী মেয়েটা কোথায়?” অথবা “আমার সবুজ মেয়েটা কোথায়?” – অফিস থেকে ফিরেই আদর করে আমার বাবা আমাকে ডাকাডাকি শুরু করে দিতো। বাবার কাছ থেকেই আমার এই কালো গায়ের রং পাওয়া, সেকারণে তাঁর একটু মনোকষ্ট ছিল। “বেগুনী” আর “সবুজ” ছিল তাই নিছক আদরের ডাক। বাকিদের কাছে আমি ছিলাম শুধু “কালো” অথবা আমার গায়ের রং “ময়লা”। আমার এই “ময়লা” গায়ের রংটা বিশেষ লক্ষ্যণীয় হবার অবশ্য একটা কারণ ছিল। সেসময় আমার বড় ভাই এবং বাবা-মায়ের দিকের আমার সব কাজিনদের গায়ের রং ছিল একেবারে দুধে আলতায়। সবাই যেখানে যেকোনো রং এর কাপড় পরতে পারতো, সেখানে আমাকে পরানো হতো হালকা রং এর কাপড়। তার মধ্যে হালকা গোলাপি আর ঘিয়া রংটাই আমার জন্য বেশি বেছে নেওয়া হতো। এই হালকা গোলাপি আর ঘিয়া এখনো আমার মাথায় এমনভাবে চেপে বসে আছে যে এই দুটো রং এর বাইরে যেতে আমাকে রীতিমত বেগ পেতে হয়। কালো হবার কারণে মনে মনে আমার অনেক দুঃখ ছিল। মনে হতো সৃষ্টিকর্তার এ কেমন পক্ষপাতিত্ব? তবে সেই ছোটোবেলার দুঃখটা অবশ্য একেবারে বিফলে যায়নি। আমি লেখালেখি শুরু করার পর “সৌন্দর্য্য” নিয়ে একটা গল্পও লিখে ফেলেছিলাম। সেই গল্পটা আবার এবছরের “পেন্সিল সংকলনে” প্রকাশিতও হয়েছে। যদিও সেটা ছিল নিছক গল্প, কিন্তু ছোটবেলায় আমার মধ্যে যদি সেই সৌন্দর্য্য বোধটা ঢুকিয়ে না দেওয়া হতো তাহলে কি আর গল্প লিখতে পারতাম?

(২)
সেই “ময়লা” গায়ের রং এর সময় আমি পার করে এসেছি। অথবা জয় করে এসেছি বললেই ঠিক হবে। আমার গায়ের রং আমার কাছে এখন আর কোন ব্যাপারনা। সত্যি কথা বলতে কি আমার নিজেকে আর কালোও মনে হয়না। এটা এক সময় আমার কাছে বিশাল ব্যাপার ছিল মনে করলেই অবাক লাগে। ভেবেছিলাম শুধু আমার কাছে কেন, এই যুগে কারও কাছেই এটা আর কোনো ব্যাপার না। আজ আমার চৌদ্দ বছরের একটা মেয়ে আছে। আমার মেয়েটা ব্রিটেনে প্রথম স্কুল শুরু করার কয়েকমাস আগে, তাদের নতুন ক্লাসের সব বাচ্চাদের সাথে স্কুলে “সেটলিং ইন সেশন” হয়েছিল। নতুন বাচ্চাদের পরিচিত করার জন্য এই “সেটলিং ইন সেশন” এদেশে বেশ প্রচলিত। সেইদিন ক্লাসের তিরিশটা ছোট বাচ্চাদের একসাথে একটা ছবি তুলে সবার কাছে এক কপি করে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্যারেন্টদের বলে দেওয়া হয়েছিল ছবিটা এমন কোথাও রেখে দিতে যাতে করে বাচ্চারা সামারে ছবিটা দেখে দেখে সব মুখগুলো তাদের পরিচিত হয়ে যায়। আমার চার বছরের মেয়েটা দেখলাম সেই ছবিটা কোথাও রাখতে চায়না এবং দেখতেও চায়না। সেই ছবিটা দেখলেই সে কেমন মন খারাপ করে ফেলতো। অনেক তদন্তের পড়ে জানতে পারলাম কেন মেয়ের সেই ছবিটার উপর এতো অনীহা। তিরিশটা বাচ্চার মধ্যে একমাত্র এশিয়ান চামড়ার আমার চার বছরের ফুটফুটে সুন্দর মেয়েটার মনে হয়েছে সে এতো কালো কেন? আমিতো অবাক, কোথা থেকে সে এই ধারণা পেলো? এর পর আর মেয়ের কাছে “কালো” নিয়ে কোনো অভিযোগ শুনিনি। তবে গল্পচ্ছলে ছোটোখাটো ঘটনা দুই একবার বলেছে। যেমন, ছোট মেয়েরা মিলে খেলার সময় সে লিটল মারমেইড হতে চাইলে তাকে বলা হয়েছে; “মারমেইড ক্যাননট বি সামওয়ান উইথ ডার্কার স্কিন”। ছোট ছোট বাচ্চারা কোথা থেকে এই ধারণাগুলো পায়?
আশাকরি এতদিনে আমার মেয়েটাও আমার মতো সেই চামড়ার রঙের তুচ্ছতা উপলব্ধি করতে পেরেছে। তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদী ঘটনা এবং এই “ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার” মুভমেন্ট আমাদের বাড়িতে তাঁকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে। পুরো ব্যাপারটা নিয়ে সে খুবই ব্যথিত। ছোট বেলার কোনো অভিজ্ঞতার কারণেই কি তার এই উপলব্ধি?

(৩)
গতবছর অফিসে, আমার টিমে এক বছরের একটা ফিক্সড টার্ম পজিশনের জন্য প্রার্থী নিয়োগ করতে হয়েছিল। একজন প্রার্থী ছিল শিক্ষা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতায় সবার থেকে স্বতন্ত্র, সবার থেকে ঊর্ধ্বে। সে অনুসারে তাকেই চাকরিটা প্রদান করা হয়। আমারও সেসময় নতুন চাকরী। নতুন টিমটাকে দাঁড়া করানোর জন্যই তাকে নিয়োগ করা হয়েছে। আমার অধীনে তাঁর চাকরী হলেও দেখলাম সব দিক থেকে আমার থেকে সে অভিজ্ঞ এবং পারদর্শী। সে ছিল নাইজেরিয়ান মধ্যবয়সী কালো একজন ভদ্রলোক। অনেক বড় বড় কোম্পানিতে বড় পজিশনে চাকরী করার পর এখন সে একটু পরিবারের দিকে মনোযোগ দিতে চায় বলেই কিছুটা পদাবনতি মেনে নেওয়া। আমি প্রথমে তাঁকে দিয়ে কাজ করানোর ব্যাপারে একটু অস্বস্থি বোধ করলেও তাঁর অমায়িক ব্যবহার, অসাধারণ ব্যক্তিত্ব এবং কাজের প্রতি একনিষ্ঠতার কারণে অল্পসময়ের মধ্যেই জড়তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হই। তারপর এই একবছরে সে আমার সবচেয়ে আস্থাভাজন সহকর্মীতে পরিণত হয়। তাঁকে দিয়ে আমি যতটা না কাজ করিয়েছি, তার চেয়ে বেশি তার কাছ থেকে কাজ শিখেছি। সে আবার কিছুটা ট্র্যাডিশনাল মানসিকতার মানুষও ছিল। কর্মক্ষেত্রে একজন মহিলাকে কিভাবে সম্মান করতে হয়, সে দৃষ্টান্ত আমি তাঁর কাছ থেকে পেয়েছি। এতো সম্মান মনে হয় আমি আর কারও কাছ থেকে কোনোদিন পাইনি। তবে কাজের সম্পর্কের বাইরেও আমরা ভালো বন্ধু ছিলাম। চার সন্তাদের এই বাবার সর্বজ্যেষ্ঠ এবং সর্বকনিষ্ঠ দুইজন সন্তানই মানসিক এবং শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। তাদের কাজে সে অনেক ব্যস্ত থাকে। আমার ছেলে আর তাঁর মেজ মেয়ে একই বয়সী। দুজনই এবছরের জিসিএসই পরীক্ষার্থী ছিল। অনেক আড্ডার মাঝে ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা নিয়েও অনেক গল্প হতো। আমি এতদিন ভাবতাম যে শুধু সাউথ এশিয়ান বাবা মায়েরাই বাচ্চাদের ব্যাপারে অতিরিক্ত কড়াকড়ি করে। কিন্তু কড়াকড়ি কাকে বলে, কত প্রকার এবং কি কি তা আমি তাঁর কাছ থেকে শিখেছি। মেয়েকে সে ডাক্তার বানাবে। তার তোড়জোড় এখন থেকেই একদম পুরোদমে চলছে। আমি একবার মজা করে বলেছিলাম, আহারে ছোট্ট মেয়েটাকে দিয়ে আর কত কি করাবে? একটু তো ছাড় দিতে পারো। সে আমাকে উত্তর দিয়েছিলো; “শী ইজ এ ব্ল্যাক গার্ল আমিনা। লাইফ উইল বি ভেরি টাফ ফর হার। তার জীবনে একটু ভুল, একটু এদিক ওদিক হবার উপায় নাই। সবার থেকে ভালো করতে পারলেই সে সামনে এগুতে পারবে।” আমি সেই বাবার চোঁখে দেখেছিলাম একধরণের অসহায়ত্ব। দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।

(৪)
কেন যে হঠাৎ এই নিরবিচ্ছিন্ন তিনটি ঘটনার মতো আরো কত ঘটনা, স্মৃতি মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। বর্ণবাদীতার প্রতিবাদে সারা পৃথিবী আজ যেন তোলপাড়। গায়ের রং নিয়ে এই ভেদাভেদ চলে এসেছে যুগ যুগান্ত ধরে,আজ তা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। “ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার” জাতীয় মুভমেন্ট প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত বর্ণবাদীতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু শুধু সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে না, গায়ের রং নিয়ে এই ভেদাভেদ আমাদের মনের শিরায় উপশিরায় প্রবাহিত। হয়তো বা আমাদের নিজের অজান্তেই। “ব্ল্যাক লাইভ ম্যাটার্স” জাতীয় মুভমেন্টের ব্যাপারে আমরা না হয় সহমর্মী । কিন্তু আমাদের নিজেদের মনের আনাচে কানাচেতে যুগ যুগান্ত ধরে পুষে রাখা বর্ণবাদীতার বিরুদ্ধে নিজেরা কিছু না করলে আদৌ কি এর কোনো শেষ আছে?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *