#সাহিত্য ও সংস্কৃতি

ডাকের কথার কথা – শামীমা এম রিতু

“ডেকা গরুয়ে বাঘ মারে না।
ভালা মানুষ গাছো ধরে না।
পুড়া কপাল জোড়া লাগে না।
হাতো না অইলে হাতাশিত অয় না।
ময়মুরব্বির কথা বিয়াল অইলে লাগে।”
– সিলেটি ভাষায় ডাকের কথা।

আমরা বিভিন্ন সময় কথার কথা বলি,কেউ কেউ বলি এটাতো ডাকের কথা। প্রচলিত প্রবাদকে প্রবচনকেও ডাকের কথা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। তবে অামরা কতজন জানি যে “ডাক”” নামে কেউ ছিল।অাসুন সে ডাকের কথাই অল্প জেনে নেই।

বাংলাদেশে বিশেষত বরাক উপত্যাকায় ডাকের কথা – বহুল প্রচলিত।অনেকের মতে ডাকের কথা দিয়েই অহমিয়া/অসমিয়া ভাষার যাত্রা।প্রাচীন বাংলার ইতিহাস মতে, ৬০০-৮০০ খ্রিস্টাব্দে অলিখিত অবস্থায় ঘুম পাড়ানী গান,রাখালিয়া/গোষ্টের গান,গীতিকা,বিহুগান, হুলি/উড়িগান ও ডাকের কথা নিয়েই অহমিয়া সাহিত্যের প্রাথমিক যুগের শুরু।অহমিয়া ও বাংলা ভাষার অাদি উপাদানও এগুলোই। এই অহমিয়া/অসমিয়া ভাষাই হলো বৃহত্তর বরাক উপত্যাকা বা সিলেটি ভাষার মূল। তবে ডাকের কথার সাথে খনার বচনের ভাষা ও বিষয়গত মিল থাকায় কালের বিবর্তনে খনার বচন/ডাকের কথা /প্রবাদ-প্রবচন সভ্যতার একই রেখায় অবতরণ করেছে। বাংলা ডাকের কথায় ও খনার বচনের চাইতেও প্রাচীনত্ব বিদ্যমান।

অসমিয়া সাহিত্যের ‘চানেকী’ গ্রন্থের তেত্রিশ পৃষ্ঠায় ‘ডাক ভনিতা’ শিরোনামে অনধিক এক হাজার ‘ডাকের কথা’ সংকলিত আছে। ডাকের কথায় নীতিমূলক কথা অধিক ছিল। খনার বচন, ঘাঘের বচন মূলত কৃষি কেন্দ্রিক এবং ডাকের কথা নীতিমূলক। যা থেকে বোঝা যায় যে প্রচলিত নীতি মূলক প্রবাদ-প্রবচনে মিশে অাছে প্রাচীন ডাকের কথা। বাংলাপিডিয়ার মতে, অসমিয়া ডাকভণিতায় ডাকের কথার ১১টি প্রকরণের কথা বলা হয়েছে, যথা: জন্মপ্রকরণ, রন্ধনপ্রকরণ, নীতিপ্রকরণ, বৃষলক্ষণ, গৃহিণীলক্ষণ, কৃষিলক্ষণ, জ্যোতিষপ্রকরণ, বর্ষালক্ষণ ইত্যাদি। বাংলা বচনগুলির বিষয় হলো আবহাওয়াবার্তা, কৃষি, ফল ও ফসল, পশুপালন, গণস্বাস্থ্য, জ্যোতিষ ও হোরাশাস্ত্র, বর্ষফল, যাত্রালগ্ন, বিধিনিষেধ, পরমায়ুগণনা, নারীর লক্ষণ, গর্ভস্থ সন্তান, প্রশ্নগণনা ইত্যাদি। ডাকের জন্ম প্রকরণ আত্মকথামূলক।

আসামবাসীদের মতে-
“লেহিতাংপদ্মা ডাকের গাঁও
তিনি শটি পুঁখুরীর নাও
সেই গাঁওত উপজিল ডাক।”
যা থেকে বোঝা যায় – আসামের বড়পেটা হতে ছয় সাত মাইল দক্ষিণে বাউসী পরগণার অন্তর্গত লেহিডাংগারা গ্রামের অধিবাসী ছিলেন ‘ডাক’। এই লোহগ্রামকে অাসামের লোকেরা “ডাকের গ্রাম” বলেই অভিহিত করে। অনেকের মতে লোহগ্রাম প্রাচীন ‘লোহিভাংরা’ নামেরই রূপান্তর। ডাকের পিতা ছিলেন জাতিতে একজন কুম্ভকার কিন্তু বাংলা ও বিহারী ডাকের কথার ভনিতায় বলা হয়েছে,
“বলে গেছে ডাক গোয়ালে /
কহি গেয়ে ডাক গোয়াল।”

এছাড়াও উপাখ্যান রয়েছে যে বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ মিহির কামাখ্যা- কামরূপের দর্শনের সময় ডাকের বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেন এবং ডাকের মাতা শ্বাশুরীর আদেশে পুত্রকামনায় মিহিরের সেবাযত্ন করেন এবং মিহিরও সন্তুষ্ট হয়ে বর প্রদান করেন। উল্লেখ্য যুগে তখন বৌদ্ধ যুগে অনেক জ্ঞানী-পন্ডিত ‘মিহির’ অভিধায় ভূষিত হতেন তাই এই মিহির ‘বরাহ মিহির’ কি না সে বিষয়ে দ্বিমত বিদ্যমান। এর কিছুদিন পরেই ডাকের জন্ম হয় এবং ভূমিষ্ট হয়েই তিনি মাকে ডাক দিয়ে বিভিন্ন কথা বলেন,যার ফলে তার নাম হয় ‘ডাক’ । ডাকের কথায় পাওয়া যায় –

“উপজিয়ে মায়কো দিলা যাক
সে সেই কারনে তার নাম থৈলা ডাক।”

বিভিন্ন যুগে ও ভাষাগত প্রভেদে বিভিন্ন ভাবে প্রচলিত থাকলেও ডাকের কথার মূলনীতি একই অাছে। ভাষা সময়ে নদীতে প্রবাহিত হয়,ডাকের কথার বেলাতেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। প্রাচীন বঙ্গ সাহিত্যের লেখকদের মতে এটি ছিল বৌদ্ধ যুগ বা ৮ম শতাব্দী। কথিত অাছে যে মিহির অারো একবার লোহগ্রামে উপনীত হন এবং ডাকের প্রতিভার জ্ঞানে মুগ্ধ হন। কিন্তু ডাক অল্প বয়সেই জলে ডুবে মারা যান। তিনি অমর হয়ে অাছেন তার কথায়।

কথিত ডাকের গ্রামে এখনো ছোট ছোট অনেক পুকুর পাড়ে প্রাচীন বসতির ধ্বংসাবশেষ পরিলক্ষিত হয় এবং স্থানটি যে এক সময় সমৃদ্ধ ছিল তা বোঝা যায়। এ জায়গা থেকে একটি বড় রাস্তা কোচবিহার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। উল্লেখ্য যে নেপালের “ডাকার্ণব তত্ত্ব” এবং ‘বজ্রডাক তন্ত্রে’র সাথে ডাকের কথার বিশেষ মিল পাওয়া যায়। তাছাড়া, ডাক-ডাকিনী তত্ত্ব যে বৌদ্ধ ধর্মের তান্ত্রিক শ্রেণির রচনার সাক্ষ্য বহন করে সেটি ঐতিহাসিকভাবে অকাট্য। সেইসূত্রে তৎকালীন প্রাচীন উপমহাদেশের সীমানা বিশ্লেষণে ‘ডাকে’র জন্ম আসামের বড়পেটার প্রমাণ দেয়।প্রাচীন আমলে আসাম – কামরূপ পাল শাসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং সেখানে প্রাপ্ত তাম্রলিপি/ তাম্রশাসন, এখনো অাসামের বহুগ্রামে প্রচলিত প্রবচন ,ডাকের জন্মভূমি সংক্রান্ত প্রবাদ ‘ডাকে’র কথার ই সাক্ষ্য দিয়ে যায়।

সর্বোপরি ডাকের কথা অহমিয়া, বাংলা ভাষা তথা বাংলাদেশের সাহিত্য সংস্কৃতির অপরিহার্য গৌরব এবং অমূল্য রত্ন। খনা নিয়ে যতটা আলোচনা গবেষনা হয়েছে ‘ডাক’ নিয়ে সে তুলনায় কম কথাবার্তাই হয়েছে।তাই খনার মতই ডাকের কথা নিয়ে বিশেষ ভাবে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা করলে আরো অনেক তথ্য বর্তমান প্রজন্ম জানতে পারবে।নিজেদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ,শিকর নিয়ে আমাদের জানার চেষ্টা অব্যাহত রাখা উচিত। আসুন প্রাচীন এই সম্পদ সংরক্ষণ করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারা আমরা অব্যাহত রাখি।

তথ্যসূত্র : বঙ্গ-সাহিত্য-পরিচয় (প্রথম খন্ড)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *