#সাহিত্য ও সংস্কৃতি

এক জননীর গল্প – তানকিউল হাসান

গভীর রাতে খুট খুট শব্দে আছিয়া বেগমের ঘুম ভেঙে গেলো। রাতে ইদানীং তার ভালো ঘুম হয় না । কিছুদিন ধরে কাশি হয়েছে। ভয়ঙ্কর কাশি। একবার শুরু হলে বন্ধ হতে চায় না । কাশির ঔষধ , আদা দিয়ে চা , মেডিক্যাল কলেজের থার্ড ইয়ারে পড়ুয়া তাঁর বড় ছেলের চিকিৎসা সবকিছুই একতালে চলছে । লাভের লাভ কিছু হচ্ছে না । কাশি কমছে না ।

খুট খুট শব্দ শুনে তিনি ভাবলেন , “নিশ্চয়ই ইঁদুরের উপদ্রব !” ঝিকাতলার এই বাড়িতে আগে ইঁদুর ছিল না। ইদানীং হয়েছে। হঠাৎ করে ইঁদুরের উপদ্রব কেন বেড়ে গেলো সেটা তিনি ভেবে পাননি। আছিয়া পাশ ফিরে তিনি তার স্বামীর দিকে তাকালেন। বেচারা অঘোরে ঘুমাচ্ছে। তিনি পা টিপে টিপে নিঃশব্দে বিছানা থেকে নামলেন। স্যান্ডেল পায়ে দিতে যাবেন ঠিক তখনই আবারও খুট খুট করে শব্দ হল । বাতি জ্বেলে তিনি রান্নাঘরের দিকে গেলেন। শব্দটা রান্নাঘর থেকেই আসছে বলে মনে হচ্ছে ! এ বাড়ির রান্নাঘরটা তার শোবার ঘরের কাছেই। সেখানে কাজের মহিলা আনুফা শোয়। সারাদিন কাজকর্মে ব্যস্ত থাকে বলেই আনুফা মরার মতন ঘুমায়।আসিয়া বেগমের বিয়ের সময় এই মহিলাটিকে তার মা সাথে দিয়েছিলেন। এরপর দীর্ঘ সাতাশটি বছর কেটে গেছে। আনুফা এখন তার সংসারেরই একজন। রান্নার হাত চমৎকার। মেয়েটিকে তিনি বিয়েও দিয়েছিলেন কিন্তু বিয়ের ছ ‘মাসের মাথায় তাঁর রিক্সা-ওলা স্বামী মারা টাইফয়েডে মারা গেলো। এরপর অনুফা আর বিয়ে করেনি। তিনিও জোর করেননি। তার তিন ছেলেমেয়ের সবাই এই মহিলার হাতেই বড় হয়েছে।

রান্নাঘরে পৌঁছে তিনি দেখলেন অনুফা ঘুমিয়ে আছে । বিশ্রী নাক ডাকার শব্দ কানে আসছে।তিনি মোটামুটি নিশ্চিত হলেন শব্দের উৎস রান্নাঘরে না। বাসায় কি চোর ঢুকেছে ? কিংবা মিলিটারি ? নাহ: মিলিটারি ঢুকলে খুট খুট শব্দ হবে না। এসেই নিশ্চয়ই দড়াম দড়াম করে দরজায় লাথি মারবে কিংবা উচ্চস্বরে উর্দু ভাষায় ডাকাডাকি করবে ।

দেশের বর্তমান অবস্থা চরম খারাপ। মার্চ মাসে যখন অসহযোগ আন্দোলন শুরু হল তখন তাঁর বড় ছেলে শিহাব সিলেট মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলে আর মেয়ে ফাহমিদা রাজশাহী ইউনিভার্সিটির হোস্টেলে। ভাগ্য ভালো ইউনিভার্সিটি ফার্স্ট ইয়ারে পড়ুয়া তাঁর তাদের ছোট ছেলেটা অবশ্য সাথেই ছিল। সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছিল। আজ হরতাল , কাল কারফিউ ! দুশ্চিন্তায় কিছুদিন তার মাথা খারাপের মতন হয়ে গিয়েছিল। সারাক্ষণ জায়নামাজের বসে থাকতেন। তার স্বামী শামসুর রহমান সাহেবও সারাক্ষণ চিন্তায় অস্থির থাকতেন , কারো সাথে কোন কথা বলতেন না। হাসিখুশি সদালাপী মানুষটা কিছুদিনে যেন অনেকখানি বদলে গেলেন ।

আল্লাহর রহমতে ছেলে মেয়ে দুজনেই ফিরে এসেছে। এঁরা দুজন বাসায় ফেরার পর তিনি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। দেশের অবস্থা থমথমে হলেও বাচ্চারা ফেরার পর বাসায় বেশ একটা উৎসবের পরিবেশ গড়ে ওঠলো । সবাই একসাথে ভোরবেলা নাশতা খেতে বসেন । দুপুরে রান্না করার সময় মেয়েটি তাঁর সাথে রান্নাঘরে বসে থাকে । কুটুর কুটুর নানান বিষয়ে কথা বলে । আনুফা প্রায়ই বলে , আফাগো আপনে অন্দর ঘরে গিয়া বসেন তো । আপনার মতন সুন্দরী মেয়েছেলের চুলার সামনে বসাটা ঠিক না , শইলের রং কালা হইয়া যাইব । তাঁর কথা শুনে তাঁর মেয়ে ফাহমিদা হাসে , তিনি হাসেন । নামাজ শেষে দোয়া করার সময় তিনি প্রতিবার মহান আল্লাহতালার কাছে শুকুর গুজার করেন ,ইয়া আল্লাহ তোমার অনেক দয়া , ভয়ংকর এই সময়ে তুমি আমাদের পুরো পরিবারটাকে এখনও সহি সালামতে রেখেছ ! তবে কতদিন এভাবে থাকা যাবে সেটা বলা যাচ্ছে না । ঢাকার বেশিরভাগ মানুষজন শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে , তিনি প্রায়ই ভাবেন তাঁর ছেলেমেয়ের ফেরার পথে কোন ধরণের কোন সমস্যা হয়নি । এই পুরো ব্যাপারটা তাঁকে খুব অবাক করেছে । ইদানীং রাস্তাঘাটে বাস থামিয়ে মিলিটারিরা কোন কারণ ছাড়াই লোকজনকে মেরে ফেলে ।

খুট খুট করে আবার শব্দ হল । আছিয়া বেগম মোটামুটি নিশ্চিত হলেন শব্দটা আসছে বাড়ির দক্ষিণের কামরা থেকে । এই ঘরটাতে তাঁর ছোট ছেলে রিয়াজ থাকে । চোখ পড়তেই তিনি দেখলেন কামরায় বাতি জ্বলছে , এতো রাতে বাতি জ্বালানো কেন ? রিয়াজ কি বাতি জ্বালিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে ,ঘুমানোর আগে বাতি নেভাতে ভুলে গেছে ? এই ছেলের রাত জাগার বিশ্রী অভ্যাস আছে। রাত জেগে গল্পের বই পড়ে , লো ভলিউমে গান শোনে । রাত জেগে বই এ অভ্যাসটা একসময় তার নিজেরও ছিল।হারিকেনের আলোয় কত রাত গল্পের বই পড়ে কাঁটিয়ে দিয়েছেন ।

ছোট ছেলের ঘরে ঢুকে আছিয়া বেগম খুব অবাক হলেন , রিয়াজ ট্রাঙ্কে কাপড়চোপড় গোছাচ্ছে । তিনি বিস্মিত হয়ে ছেলেকে জিগ্যেস করলেন , কিরে এই ভোররাতে কাপড় গোছাচ্ছিস কেন ?

দেশেই এই অবস্থায় কোথায় যাবি তুই ?

রিয়াজ মায়ের দিকে তাকিয়ে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাসল । এই অবেলায় মা এসে হাজির হবেন সে স্বপ্নেও ভাবেনি ! সে তাঁর মায়ের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল , “মা বস “ ওই চেয়ারটায় বসো ।

আছিয়া বেগম রাগে চেঁচিয়ে উঠলেন , “চেয়ার ফেয়ারে আমি বসবো না ,আগে বল তুই কাপড় গোছাচ্ছিস কেন ? ট্রাঙ্ক বের করেছিস কেন ? “

আহহা , মা চিৎকার করছ কেন ? শান্ত হও ।

-শান্ত হবো মানে ? আছিয়া বেগম চিৎকার করে উঠলেন ।

-মা , বাসার সবার তুমি ঘুম ভাঙ্গাবে । বাবা প্রেশারের রুগী । শান্ত হয়ে আমার সামনে বসো-তো। কেন কাপড় গোছাচ্ছি সেটা বলছি

-আছিয়া ভীত গলায় বললেন , বল !

-আমি মুক্তিযুদ্ধে যাব বলে ঠিক করেছি !

ছেলের মুখে এই কথা শুনে আছিয়া বেগমের কান ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগলো । কি বলছে এই ছেলে ? সে মুক্তিযুদ্ধে যাবে এর মানে কি ?
তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন , “ তুই মুক্তিযুদ্ধে যাবি মানে ? “ তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে ? তুই কি আর্মির লোক ?

চিৎকার , চ্যাঁচামেচি শুনে বাসার সবার ঘুম ভেঙ্গে গেছে । ঢুলু ঢুলু ঘুম ভাঙ্গা চোখে সবাই রিয়াজের ঘরে এসেছেন । বিস্ময়ে হতবাক হয়ে মা ছেলের কাণ্ডকারখানা দেখছেন । আছিয়া বেগমের স্বামী শামসুর রাহমান সাহেব এই প্রথম কথা বললেন । ছেলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন , তুই কার সাথে মুক্তিযুদ্ধে যাবি ? বলতো ?

রিয়াজ নির্জীব গলায় বলল , আমাদের ক্লাসের আরও দুটা ছেলে যাচ্ছে ? বাবাকে সে প্রচণ্ড ভয় পায় !

-ওঁরা কারা ? আমি কি ওঁদেরকে চিনি ?

-নাহ

-আচ্ছা , বুঝতে পারলাম তুই ওঁদের সাথে যাচ্ছিস । কোথায় যাবি তোরা ?

-আপাতত সেগুনবাগিচার এক বড় ভাইয়ের বাড়িতে । সেখান থেকে কোথায় যাব জানি না ।

-বড় ভাইটা কে ?

-তুমি চিনবে না ।

শামসুর রাহমান সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন , পাকিস্তান আর্মি সম্পর্কে তোর কোন ধারণা আছে ? গেরিলা যুদ্ধ , ওয়ার টেকটিক্স এসব সম্পর্কে তোর কোন ধারণা আছে ?

-রিয়াজ মাথা নেড়ে বলল , না

এবার শামসুর রাহমান সাহেব ইংরেজিতে বললেন , “ইউ আর নট ফিট ফর ওয়ার মাই চাইল্ড । তুমি এমনই এক ছেলে যে এখনও তেলাপোকা , মাকড়শা দেখলে ভয় পাও । মাত্র এক বছর হল তুমি এই ঘরটাতে একা থাকো । আর সেই তুমিই না বলছ , দেশের জন্য যুদ্ধ করতে যাবে । ওয়ার ইজ নট এ চাইল্ডস প্লে মাই সন । যাও ঘুমুতে যাও ।

বাবার কথা শুনে রিয়াজ কিছু বলল না ।

শামসুর রাহমান সাহেব তাঁর বড় ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন , বাবা শিহাব তুমি এখন থেকে তোমার ভাইয়ের সাথে এই কামরায় শোবে । একে চোখে চোখে রাখা উচিৎ । আছিয়া তুমি এই ছেলের ট্রাঙ্ক , কাপড়চোপড় সবকিছু আমাদের শোবার ঘরের এনে রাখো ।

প্রিয় পাঠক , রিয়াজ নামের একুশ বছর বয়সী ছেলেটি বাড়ী থেকে পালায় এর ঠিক দুই দিন পর এক দুপুরবেলায় । বাসার কেউ তা টের পেলেন না । ছেলেটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো !

পরিশেষ ঃ

একানুব্বুই বছর বয়সী আছিয়া বেগমের দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে তাঁর ঝিকাতলার বাড়ীর জানালার দিকে তাকিয়ে । বিগত সাতচল্লিশ বছরের বেশিরভাগ সময় তিনি এভাবেই কাঁটিয়ে দিয়েছেন যদিও পুরনো বাড়িটি এখন আর নেই , সেখানে নতুন বহুতল ফ্ল্যাট উঠেছে । তিনি প্রায়ই ভাবেন এই বুঝি তার ছেলেটা ফিরল । বাড়ির সামনের সরু গলিতে যখনি ফর্সা , লম্বা চুল ওলা কমবয়সী কোন ছেলেকে দেখেন তখন তাঁর বুকের ভেতরটায় “ধ্বক” করে ওঠে। আশার প্রদীপ জ্বলে ওঠে তাঁর মনে ।

ছেলের বউ নাতি , নাতনিকে চিৎকার করে ডেকে বলেন । দৌড়ে নিচে যা , দৌড়ে নিচে যা !

আমার রিয়াজ এসেছে , আমার রিয়াজ এসেছে !!!!!

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *