#সাহিত্য ও সংস্কৃতি

‘আড়াল নন্দী ‘ – শামীমা এম রিতু

“হে বরাক – তরঙ্গিনী-
তোমারী বক্ষ ছিড়িয়া বহে অবিরল বরিষণ
প্রজ্ঞা-জ্ঞান ভাসিয়া চলিতেছে ;
করিনাহি তাহা অন্বেষণ!”

পূণ্যশীলা এই বৃহত্তর শ্রীহট্টে কত যে পূণ্যাত্মা জন্ম নিয়েছিলেন তার হিসাব নেই। তিনদিকে বিশাল অরণ্যরাজি,একদিকে দিগন্ত বিস্তৃত হাওরের অপার্থিব সৌন্দর্য যুগে যুগে গড়ে তুলেছে অসংখ্য শিল্পী,সাধক- ভাবুকদের। চা-বাগানের শীতল ছায়ায় লালিত হয়েছে গৌরবময় নাগরী সংস্কৃতি। তাদের সাহিত্য ধ্যানে অার সাধনায় মঞ্জুশ্রীত হয়েছিলো বরাক উপত্যাকা। কেউ কেউ হয়েছেন জগদ্বিখ্যাত আবার কেউ কেউ রয়ে গেছেন ইতিহাসের পাতার অভ্যন্তরে।পথের ধারের বুনোফুলের মত তারা একান্তে সুশোভিত করে গেছেন ধরণীকে। সংস্কৃতিতে দিয়েছেন প্রাণের ছোঁয়া ।সেই সব অমরপ্রাণের কয়জনকেই বা চিনি আমরা? না কি জানার চেষ্টাও করিনা। নামহীন সেই পুষ্পমঞ্জুরীর একজন হলেন সাধক কবি রামকুমার নন্দী।

বৃহত্তর সিলেটের রত্নগর্ভা চারকন্যার একটি হলো ‘তরফ’ বা বর্তমান হবিগঞ্জ জেলা। খোয়াই-গোপলা বিধৌত এই পলিমাটিতে যেমন সোনাফলে তেমনি এখানে উদয় হয়েছে সংস্কৃতির অসংখ্য নক্ষত্ররাজি।

১৮৩১ সালে তরফ/ হবিগঞ্জের বেজুড়া পরগণার বিখ্যাত নন্দী বংশে দরিদ্র্য রমাকান্ত নন্দী মজুমদারের গৃহে ভূমিষ্ট হন অাঠারো শতকের অখ্যাত এক সাধক প্রাণ – রামকুমার নন্দী। পারিবারিক অার্থিক টানাপোড়নের কারনে প্রাতিষ্টানিক ভাবে পড়ালেখার সুযোগ না পেলেও বিদ্যানুরাগ ছিল প্রবল। বাংলা প্রমিত রীতির প্রবর্তক প্রমথ চৌধুরীর বিখ্যাত কথা ” স্বশিক্ষিত লোক মাত্রই সুশিক্ষিত” – যার বেলাতে খাঁটি প্রয়োগ হয়। সঙ্গীতের প্রতি প্রগাঢ় অনুরাগ থেকেই জনৈক সঞ্জীতজ্ঞ ব্রাহ্মণের কাছে সঙ্গীত শিক্ষা নেন। জীবন সংসারে অভাব অনটনে হৃদয়ের ভাব-অনুরাগে অভাব ছিলনা তার; তাইতো ইতিহাস তাকে ঠাঁই দিয়েছে বুকের গহীনে।

জগতে প্রতিনিয়ত কতো ফুল ফোটে অাবার কত ফুল ঝরে পড়ে নীরবে। কেউ জানেনা, কেউ খোজ নেয়না। কিন্তু কর্মগুণে মালার ফুলের মতই কিছু ফুল রয়ে যায় ইতিহাসের মালায়। কর্মই মানুষ কে মহামান্বিত করে- এই কথার সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়ে দারিদ্র্য রাম জীবিকার তাগিদে ভারতের শিলচরে গমন করেন এবং তিনটাকা বেতনে ডেপুটি কমিশনারের অফিসে চাকুরি গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে নিজ প্রচেষ্টায় ইংরেজি ভাষা অায়ত্ব করে “Earn While You Learn” নীতি অনুসরণ করে প্রথমে ডিসি অফিসের একাউন্টেন্ট এবং তিনটাকার কর্মচারী থেকে আশি টাকা বেতনের ক্যাশিয়ার পদেও আসীন হন। দীনতা কে তিনি জয় করেছিলেন কর্মবলে। আর অন্যদিকে নিজের মনকে উৎসর্গ করেছিলেন স্রষ্টার অধীন হওয়ার জন্য।

এই স্বভাবকবির কবিতার ধারা তার কলমে অনবরত প্রবাহিত হতো,যেনো খরস্রোতা নদীর তীব্র স্রোত। মাত্র পনের বছর বয়সে রচনা করেছিলেন পালাগান ‘দাতাকর্ণ’। সেই সময়ে বাংলা সনেটের প্রবর্তক মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বীরাঙ্গনা’ কাব্যের জবাবে তিনি লিখেছিলেন ‘বীরাঙ্গনা পত্রোত্তর কাব্য’। যা তৎকালীন সাহিত্য মহলে উচ্চ প্রশংসার আসনে তাকে অধিষ্টিত করে। ক্রমেই “পরমার্থ সঙ্গীত”, ঊষোদ্বাহ (চারখন্ড) সাহিত্যের দ্যুতি ছড়ালেও অর্থাভাব অভাবে প্রকাশকের অভাবে রামকুমারের কোন গ্রন্থ আলোর মুখ দেখেনি।

খোয়াই তীরের এই উর্বর মস্তিষ্কে কাব্য, নাটক, পালা, সঙ্গীত মিলিয়ে অনেক জ্ঞানপুস্তকেরই চাষ করেছিলেন, কিন্তু সব অজানায় রয়ে গেছে অনাদরে পরে আছে ইতিহাসের পাতায়। যার কয়েকটি হলো-
১. দশ মহাবিদ্যা (খন্ডকাব্য)
২. নব পত্রিকা (পৌরাণিক)
৩. কলঙ্ক ভঞ্জন (পাঁচালী)
৪. রামলীলা (নাটক)
৫. ঊষা অাগমন (নাটক)
৬. কংস বধ (নাটক)
৭. বলদ মহিমা (প্রহসন)
৮. চন্ডীর পালা (নাটক)
৯. ঝুলনযাত্রা ( সঙ্গীত)
১০. দোল যাত্রা (সঙ্গীত)
১১. লক্ষী-স্বরস্বতীর দ্বন্দ্ব (সঙ্গীত)
১২. দেবী বোধন সঙ্গীত
১৩. ভগবতীর জন্ম ও শিবের বিবাহ
১৪. বিবিধ প্রবন্ধ মালা
১৫. জীবনশক্তি ও গণিতাঙ্ক।
১৬. মালিনী (উপন্যাস)

সাহিত্যের এমন রত্ন না জানি কোথায় পড়ে রয়েছে অবহেলায়! আজকাল কতজন কবি হওয়ার জন্য মরীয়া! টাকা জলে দিয়ে হলেও স্বঘোষিত কবি হতে কতো যজ্ঞ দেখা যায়! অথচ রামকুমারের মত কবিদের অমূল্য সৃষ্টি পড়ে থাকে নিথর হয়ে। যদি এই অপ্রকাশিত গ্রন্থ গুলো প্রকাশ হতো তাহলে বাংলা কেনো, সিলেটের সাহিত্যভান্ডার আবারো পূর্ণ হতো। যখনি মনে হয় শুধু মাত্র অর্থাভাবে রাজকুমারের সৃষ্টি আলোর সামনে আসেনি তখন যেমন দুঃখ হয় তেমনি নিজেকে পরম সৌভাগ্যবান মনে হয় উত্তর আধুনিক যুগে জন্মেছি বলে।আজ ইন্টারনেট আছে, আছে ফেসবুক! চাইলেই শত অভিধায় কবি হওয়া যায়! পাওয়া যায় কবিত্বের অসংখ্য পদকও! লজ্জাহীন ভাবে চলে অনুকরণ! আহা ! ইতিহাস এত নির্মম কেন? আজকের যুগে যদি রামকুমারের জন্ম হতো তাহলে কি প্রকাশনার অভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতো লেখাগুলো? মনে হয়না আমার । এমনওতো হতে পারে রামকুমারের লেখা সঙ্গীত এখনো গীত হয় ‘সংগ্রহ’ বা “কালেক্টেড’ শব্দের অভিধায়। হয়তো আমরা জানিইনা এর স্রষ্টা ছিলেন রামকুমার নন্দী নামের এক স্বশিক্ষিত ভদ্রলোক। আজকাল শুধু নামের হিড়িক, প্রচারনার জয়জয়কার, সকলে হীরার খনি কেটে হীরে আনতে ছুটলেও হীরার থেকে অমূল্য সংস্কৃতির এ সকল সম্পদ কেউ স্বেচ্ছায় খোঁজতে চান না। কারন,সেখানে কোন লাভ নেই। ঠিক যেমন করে ‘ইতিহাস’ নিয়ে পড়াশোনা করাকে প্রায় বোকামী মনে হয়, কারন তাদের মতে ইতিহাস দ্বীনহীন দারিদ্র্যময় একটি বিষয়! অথচ এর ভেতরেই স্বযত্নে লালিত হয় সভ্যতা আর সংস্কৃতি, সংরক্ষিত থাতে রত্নরাজি! স্বার্থঘেরা পুঁজিবাদ শুধু অর্থনীতিকে নয়, করাল গ্রাস করেছে আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতিকেও। নবীনরা কি এগিয়ে আসবে ইতিহাসের এই অমূল্য রতনের সাধনায়!রামকুমার নন্দীরা কি আবার জেগে উঠবেন তাদের সৃষ্টিসুখের উল্লাসে! জ্বলবে কী সত্যের সাঁজবাতি!

আনুমানিক ১৯০৫ সালে,আজ থেকে প্রায় একশত পনেরো বছর আগে পৃথিবী থেকে পরলোকে গমন করেন বাংলা সাহিত্য তথা বৃহত্তর সিলেটের অমূল্য রত্নরাজির এই তারকা। বিনম্র শ্রদ্ধা রইলো সাধক রামকুমার নন্দী স্মরণে… রামকুমারেরা কালের আবর্তে হারালেও ইতিহাসে বেঁচে থাকেন স্বগৌরবে।

তথ্যসূত্র: সিলেটের আরো একশত একজন।
লেখক : ফজলুর রহমান।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *