আইভির হাতেই থাকলো নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন।
ইভিএম জটিলতা, ধীরগতিতে ভোট গ্রহণ, হাতি প্রতীকের এজেন্টের অনুপস্থিতি ও সমর্থককে গ্রেফতার, স্বতন্ত্রপ্রার্থীর লোকজন প্রবেশে বাধা, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও পুলিশের বিরুদ্ধে আতঙ্ক ছড়ানোসহ নানা অভিযোগের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি (নাসিক) নির্বাচন। এতে ফের নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হলেন নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী।
২০১১ সালের ৫ মে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর এ নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হয়ে জয়ের হ্যাটট্রিক করলেন আওয়ামী লীগের এ নেতা। তার নিকটতম স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার থেকে ৬৯ হাজার ১০২ ভোট বেশী পেয়ে তিনি মেয়র নির্বাচিত হন। বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী ২৭টি ওয়ার্ডের ১৯২টি কেন্দ্রে আইভি ভোট পান ১ লাখ ৬১ হাজার ২৭৩ ভোট। সন্ধ্যার পর ডিসি অফিসের সামনে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তা এফল ফল ঘোাষণা করেন। অন্যদিকে তৈমুর আলম খন্দকারের ভোটের সংখ্যা ৯২ হাজার ১৭১টি। ভোটের মাঠে এবার মেয়র পদে সাত, সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডে ৩৪ এবং সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ১৪৫ জনসহ মোট ১৮৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। মোট ভোটার ৫ লাখ ১৭ হাজার ৩৬১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৯ হাজার ৮৪৬ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৫৭ হাজার ৫১১ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৪ জন। সব কেন্দ্রে ভোট ইভিএম পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালে বাংলাদেশের কোনো সিটি করপোরেশনের প্রথম নারী মেয়র নির্বাচিত হন আইভী। ২০১৬ সালে দলীয় নৌকা প্রতীকে অনুষ্ঠিত প্রথম সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও তিনি জয়ী হয়েছিলেন। এর আগে ২০০৩ সালে পৌর মেয়র হিসেবে আইভীকে বেছে নিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জবাসী।
গতকাল রোববার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত নাসিক নির্বাচনে ২৭টি ওয়ার্ডের ১৯২টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। প্রত্যক্ষ কোনো গোলযোগের খবর না থাকলেও বেশ কিছু কেন্দ্রে সামিয়ক ইভিএম মেশিন নষ্ট থাকা, আঙ্গুলের চাপ ঠিকমত কাজ না করায় ভোট গ্রহণে ধীরতা ছিল লক্ষণীয়। এতে করে ঘন্টায় মাত্র ১০ থেকে ১২টি ভোট আদায় হয়। এছাড়া বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকার অভিযোগ করেছেন, একটি কেন্দ্রে তার একজন সমর্থককে পুলিশ ভোট দিতে আসার সময় রাস্তা থেকে গ্রেফতার করে। বিষয়টি জানাজানি হলে অনেকেই হয়রানিসহ গ্রেফতার আতংকে ভোট কেন্দ্রে আসতে ভয় পান। এছাড়া ভোটের আগের দিন রাতে হাতি মার্কা সমর্থিত নেতাকর্মীদের বাসায় পুলিশ ও সরকারদলীয়রা হয়রানিসহ হুমকি-ধামকি দিয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। প্রত্যক্ষদর্শী অনেকেই বলেছেন, দুপুরের আগে যুবদলের সাবেক একজন নেতাকে গ্রেফতারের খবরে অনেকেই ভোট কেন্দ্রে আসা থেকে বিরত থাকেন। এছাড়া আগের দিন রাতে হয়রানি ও হুমকি-ধামকির ভয়ে হাতি মার্কার ভোটাররা কেন্দ্রে আসতে ভয় পেয়েছে।
তবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব মো. হুমায়ুন কবীর খোন্দকার। একই সঙ্গে টাঙ্গাইল-৭ উপনির্বাচন ও ৫টি পৌরসভা নির্বাচনও শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ইভিএমের কারণে ভোট দানে ধীরগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে মক ভোটিং এর ব্যবস্থা করেছিলাম। কিন্তু সাড়া কম পাওয়ায় কেন্দ্রের লাইনে তাদের বুঝিয়ে দিতে হয়েছে। ওইখানে হয়তো একটু সময়ে লেগেছে। ইসি সচিব বলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রায় ৫০ শতাংশ ভোট পড়েছে।
ইসি তার কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে সবগুলো ভোট পর্যবেক্ষণ করেছে। কোন ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। আচরণবিধি লঙ্ঘন করে সংসদ সদস্যের প্রচার ও নারায়ণগঞ্জে তফসিল ঘোষণার পরে কিছু মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে।এসব বিষয়ে ইসিকে অবহিত করা হয়নি ইসি কমিশনার মাহবুব তালুকদারের এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, এটা আসলে তালুকদার স্যার ভালো বলতে পারবেন। তবে রিটার্নিং অফিসারের কাছে যতগুলো অভিযোগ এসেছে, তিনি সবগুলো অ্যাড্রেস করেছেন।
ভোট চলাকালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকার বলেছেন, নির্বাচনে দৃশ্যমান কোনও কারচুপি না হলে জনগণ যে রায় দেবে তা মেনে নেবো। তৈমুর বলেন, গোলযোগ ছাড়াই ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। তবে নির্বাচনে বিতর্কিত কিছু হয়েছে কিনা সেটা দেখতে হবে। কারণ ইভিএমে ভোট গ্রহণের বিষয়ে আমাদের শঙ্কা আছে। অনেক জায়গায় ইভিএম মেশিন হ্যাং হয়ে গেছে। সতিনি বলেন, নির্বাচনে তাকে অনেক ডিস্টার্ব করা হয়েছে, অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে নারায়ণগঞ্জ ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসায় ভোট দেন তৈমুর। দুপুরে আইইটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্র পরিদর্শনে এসে তিনি আরও বলেন, প্রশাসন ডিস্টার্ব করেছে। শত বাধার পরেও আমার নেতাকর্মীরা মাঠে রয়েছে। গ্রেফতার হওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এ সরকারের ক্ষমতা রয়েছে, তাদের ক্ষমতা অপব্যবহারের নজিরও রয়েছে। ক্ষমতার শত অপব্যবহার এর বিপরীতে আমরা ফাইট করে যাবো। আমরা শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকবো। তিনি বলেন, আমার প্রতি জুলুম অত্যাচার চলেছে। আমার অনেক লোককে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত আমার সাত জন লোক গ্রেফতার হয়েছে। এরমধ্যে যুবদলের মহানগর সহ-সভাপতি রয়েছেন।





