#ইতিহাস ও ঐতিহ্য

জেনারেল ওসমানী ও পাকিস্তানী স্বৈরাচার আইয়ুব খান – বাসেত ওসমানী।

আজ শোনাবো, জেনারেল ওসমানীর সাথে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান এর কিছু দ্বৈরথ এর ঘটনা।

জেনারেল ওসমানীর সাথে তৎকালীন পাক-আর্মি প্রধান ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান এর সম্পর্ক অনেকটা “দা কুমড়া” ‘র মতো ছিলো। নীচে বর্ণিত ঘটনাবলী আমার বাবার মুখে শোনা।

আজকের ঘটনাগুলো জেনারেল চাচার ইস্পাত কঠিন মানসিকতা, ঘটনা প্রবাহের নিবিড় পর্যবেক্ষন, অসাধারণ স্মৃতিশক্তি আর নিবিড় দেশপ্রেম এবং সাথে পাঠককে পরিচয় করিয়ে দিবে।

অবসর পরবর্তী জীবনে জেনারেল ওসমানী এক জোড়া কুকুর পোষেন, তার একটির নাম খুবসঙ্গত কারনে ছিলো “ফিল্ড মার্শাল”, অপরটি ইন্দিরা। আমি খুব ছোট ছিলাম সময় জেনারেল চাচার বনানী ডি ও এইচ এস এর বাসায়, এই “সরাইল হাউন্ড” জাতের কুকুর দুটিকে দেখেছি (এটিও কিন্তু আমাদের দেশী এবং খুব স্বনামধন্য কুকুরের ব্রীড)।

ঘটনা ১

জেনারেল ওসমানী তখন কর্নেল এবং পাক আর্মিতে পশ্চিম পাকিস্তানে কর্মরত। একদিন সামরিক বাহিনীর “দরবার” চলাকালীন তৎকালীন আর্মি প্রধান ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসরত বাঙ্গালীদের নিয়ে একটি বিদ্রুপপূর্ন মন্তব্য করেন।

তখন সামরিক বাহিনীতে কর্মরত উপস্থিত সকল অফিসারের মধ্যে শুধুমাত্র কর্নেল ওসমানী তৎক্ষনাৎ দাড়িয়ে – ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান এর এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করেন। এবং বলেন যতক্ষন পর্যন্ত ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান এই মন্তব্য প্রত্যাহার করে এর জন্য দুঃখ প্রকাশ না করবেন তিনি বসবেন না।

এই ঘটনায় ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান অপ্রস্তুত হয়ে যান, এবং শেষ পর্যন্ত বেশ কিছু বাক্য বিনময় শেষে, তার মন্তব্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন আর তার এই মন্তব্যের জন্য দুঃখ-ও প্রকাশ করেন।

ঘটনা ২

এই ঘটনার কিছুদিন পর, এক উচ্চ পর্যায়ের সামরিক বাহিনী অফিসারদের এক মিটিং চলাকালে ঘটে দ্বিতীয় ঘটনা।

ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান সরাসরি কর্নেল ওসমানীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “You Bengali people want self independence? whereas you can not manage yourselves.”

কর্নেল ওসমানীর তাৎক্ষনিক ও দৃঢ়চেতা উত্তর ছিলো, “at least we can mismanage ourselves on our own”.

ঘটনা ৩

৬০ দশকের শেষ দিকের ঘটনা। কর্নেল ওসমানী তখন অবসর নিয়ে ঢাকায় তার বনানী ডি ও এইচ এস এর বাসায় থাকেন। একদিন তিনি আব্বাকে বিকাল ০৩৩০ টায় তার বাসায় ডেকে পাঠালেন। আব্বা সময়মতো হাজির, দেখলেন জেনারেল চাচা তার বাসার দোতলায় সামনের বারান্দায় একটা আরাম কেদারায় শুয়ে আছেন, আর তার দুই পাশে তার কুকুর দুটি শুয়ে আছে।

চাচা আব্বাকে বসতে বল্লেন। তার কথামতো আব্বা বসতে বসতে খেয়াল করলেন, চাচা তার বারান্দায় পাটকাঠির তৈরী ঝালরটি নামিয়ে রেখেছেন যাতে ভিতরটা দেখা না যায়, কিন্তু ভেতর থেকে বাহিরটা দেখা যাচ্ছিলো।

তখন আব্বা জেনারেল চাচাকে বল্লেন – ভাইসাহেব, আমাকে ডেকেছেন? কোনো প্রয়োজন? চাচার উত্তর ছিলো “বসো, মজা দেখো”।

এরপর তিনি আব্বাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কয়টা বাজে? আব্বার উত্তর বিকাল ০৩৪৫। চাচা এবার আব্বাকে বল্লেন, ঠিক ০৪০০টার সময় তুমি একটা জীপের আওয়াজ পাবা, সামনের রাস্তার বাম দিক থেকে। আর এরপর দেখবা একজন বাদাম বিক্রেতা ওই দিক থেকে হেটে আসবে বাদাম বিক্রি করতে। এর ঠিক পাঁচ মিনিট পর তুমি আবার জীপের আওয়াজ পাবা, কিন্তু এবার ডান দিক থেকে।

আব্বাও চাচার কথামতো চূপচাপ বসে থাকলেন, ঠিক চাচার পাশে। ঘড়ির কাঁটা যখন ০৪০০ টা ছুঁইছুঁই, আব্বা একটা জীপের আওয়াজ পেলেন, একদম চাচার কথামতো রাস্তার বাম পাশ থেকে।

এর একটু পর আব্বা খেয়াল করলেন, চাচার কুকুর ফিন্ড মার্শাল হঠাৎ মাথা উচু করে “গরররর” করে শব্দ করে উঠলো, আর চাচা “quite” বলতেই আবার মাথা নামিয়ে শুয়ে পড়লো।

এসময় একজন হকারের উদয়, একদম চাচার কথা মতো, রাস্তার বাম দিক থেকে। বলছে “এই বাদাম, বাদাম লাগবে বাদাম….”, এই বলে বলে ওই লোক চাচার বাসার সামনের রাস্তার বামদিক থেকে ডানদিকে হেটে হেটে চলে গেলো।

এর পাঁচ মিনিট পর একটি জীপের আওয়াজ, এবার রাস্তার ডান দিকে, যেটা প্রায় সাথে সাথেই আবার উল্টো পথে সজোরে চলে যাওয়ার শব্দও শুনতে পেলেন।

অবাক আব্বা, চাচাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ভাইসাহেব, ব্যাপারটা কি?”। চাচার এক কথায় উত্তর ছিলো “টিকটিকি”।

ঘটনার শেষ এখানে নয়, চাচার সাথে ওই “টিকটিকি”র আবার দেখা হয়েছিলো স্বাধীনতার পরে। চাচা তখন পূর্ন জেনারেল পদমর্যাদায় তিন বাহিনী প্রধান।

তখন জেনারেল চাচার উনার প্রতি প্রথম প্রশ্ন ছিলো ” কি আপনার বাদাম বিক্রি শেষ?”

সমাপ্ত

পাদটীকা ১:
চাচার এইরূপ ঘটনা কিন্তু ঐসময়েই শেষ হয় নাই, ৭০ দশকের শেষ দিকেও, তিনি তার সেই বাসার সামনে – প্রচন্ড বৃস্টিতে ভিজে ডিউটিরত এইরকম এক “টিকটিকি”কে ছাতা পাঠিয়েছিলেন, যাতে উনি নির্বিঘ্নে তার ডিউটি করতে পারেন!!!!

পাদটীকা ২:
অনেক পাঠকের অনুরোধেক্রমে, আমার বাবার পরিচয় আপনাদের অবগতির জন্য আবার দিচ্ছি:
আমার বাবা, এ. জেড. মুস্তাফিজুর রহমান ওসমানী, একটি মার্কিন বহুজাতিক ঔষধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন, বর্তমানে অবসর জীবন কাটাচ্ছেন।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *