#সিলেট বিভাগ

১৯ দিন ধরে বিদ্যুৎহীন হবিগঞ্জের শতাধিক পরিবার।

সিলেট প্রতিনিধি :
বন বিভাগ ও বিদ্যুৎ বিভাগের দ্বন্দ্বে ১৯ দিন ধরে বিদ্যুৎহীন রয়েছে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর একশটি পরিবার। বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার তিন বছর পর ‘সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার আইন নেই’ উল্লেখ করে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বন বিভাগ। এ কারণে ওই পরিবারগুলোর বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। এজন্য ওই এলাকার বাসিন্দারা দুর্ভোগে পড়েছেন।

বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য বন বিভাগ তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। যদিও এ বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে বন বিভাগ।

হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বাহুবল আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে জানা যায়, বাহুবল উপজেলার পুটিজুড়ি বন বিটের মধুপুর হিল রিজার্ভ ফরেস্টের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা কালিগজিয়া। সেখানে দুটি টিলায় ৩০০ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পরিবারের বাস। ২০১৮ সালের শেষের দিকে কালিগজিয়ার ১০০ পরিবারকে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয় হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বাহুবল আঞ্চলিক অফিস। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় ওই এলাকায় সংযোগ দেওয়া হয়। ২০২০ সালে পুটিজুড়ি বন বিট অফিসও একটি সংযোগ নেয়।

২০২১ সালের প্রথম দিকে কালিগজিয়া এলাকার ২ নম্বর টিলায় সংযোগ দিতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি খুঁটি বসানোর কাজ শুরু করলে বাধা দেয় বন বিভাগ। একপর্যায়ে হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বাহুবল আঞ্চলিক অফিসের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. শহীদ উল্লাহর নাম উল্লেখ করে তিন জনের বিরুদ্ধে হবিগঞ্জ বন আদালতে মামলা করেন পুটিজুড়ি বন বিটের তৎকালীন বিট কর্মকর্তা জুয়েল রানা। মামলায় বনের প্রায় সাড়ে ১৬ লাখ টাকা ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়।

চলতি বছরের ২৬ মে আসামিদের আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন আদালত। এরপর বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে গত ১৯ দিন ধরে ওই এলাকার ১০০টি পরিবার অন্ধকারে রয়েছে। ব্যাঘাত ঘটছে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায়। এ ছাড়া সেখানে গড়ে ওঠা তাঁত পল্লিতেও প্রশিক্ষণ নিতে পারছেন না নারীরা।

কালিগজিয়া গ্রামের বাসিন্দা সুনীল দেববর্মা বলেন, ‘তিন বছর আগে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়। তখন বন বিভাগ বাধা দেয়নি। এখন বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে বন বিভাগের কোনও ঝামেলা হওয়ায় মামলা করছে। বিদ্যুৎ লাইন কেটে দিয়েছে।’

একই গ্রামের এসএসসি পরীক্ষার্থী পায়েল দেববর্মা বলেন, ‘এই গ্রামে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী রয়েছে ১২ জন। বিদ্যুৎ না থাকায় লেখাপড়া করতে পারছি না আমরা। খুব বিপদে আছি।’

ওই এলাকার বাসিন্দা গৌতম দেববর্মা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশের একটি পরিবারও অন্ধকারে থাকবে না। তাহলে আমরা কেন বিদ্যুৎ পাবো না?’ স্বপ্না দেববর্মা বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকায় অন্ধকারে বন্যপ্রাণীরা বাড়িঘরে হামলা করে।’

কালিগজিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সীমা দেববর্মা বলেন, ‘শিশুদের লেখাপড়া করতে সমস্যা হচ্ছে। এমনিতেই আমরা পানির সমস্যায় আছি। তার মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় মোটর দিয়ে পানি তুলতে পারছি না। স্কুলে এসে কোনও শিক্ষার্থী পানি খেতে পারছে না।’

হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বাহুবল আঞ্চলিক অফিসের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার মো. শহীদ উল্লাহ বলেন, ‘বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার সময় বন বিভাগ বাধা দেয়নি। এমনকি তারাও একটি সংযোগ নিয়েছে। পরে দুই নম্বর টিলায় সংযোগ দিতে গেলে স্বার্থে আঘাত লাগায় মামলা করেছে।’ তবে স্বার্থটা কী তা তিনি জানেন না বলেন জানান।

মামলার বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘বন বিভাগ আমাদের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছে। মূলত সরকারি দফতরের কোনও মামলায় নাম উল্লেখ করার কথা না। এতেই বোঝা যায় তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলাটি করেছে।’

এদিকে, বন বিভাগ বলছে, প্রথম সংযোগ দেওয়ার সময়ই বাধা দেওয়া হয়। কিন্তু তা উপেক্ষা করে সংযোগ দেয় তারা। এরপর বারবার বলার পরও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেনি, তাই মামলা করা হয়েছে।

মধুপুর হিল রিজার্ভ ফরেস্টের পুটিজুড়ি বিট কর্মকর্তা রতীন্দ্র কিশোর রায় বলেন, ‘সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার নিয়ম নেই বলেই আগের কর্মকর্তা মামলাটি করেছিলেন।’

এ বিষয়ে বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহুয়া শারমিন ফাতেমা বলেন, ‘সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার নিয়ম নেই, এটা সত্য। তিন বছর পর লাইন বিচ্ছিন্ন করা ঠিক হয়নি। মানবিক বিষয় বিবেচনা করে পুনরায় সংযোগটি চালু করার চেষ্টা করবো।’

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *