#সিলেট বিভাগ

শায়েস্তাগঞ্জে তানভীর হত্যা, ৬বছর লালিত জিঘাংসার বাস্তবায়ন !

এম হায়দার চৌধুরী, শায়েস্তাগঞ্জ (হবিগঞ্জ):: হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে তানভীরকে অপহরণ করা হয়েছে বলে ৮০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চেয়েছিল ঘাতকরা। হত্যার সাথে জড়িত ঘাতক উজ্জল ও শান্ত আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বুধবার (২৭ জানুয়ারি) কড়া নিরাপত্তার মধ্যে আসামীদেরকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে আসামীরা আদালতকে ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা দেয়।
হবিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম ঘাতক চক্রের বর্ণনা অনুযায়ী জানান, দীর্ঘ প্রায় ৬ বছর আগেই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে। নিহত তানভীরের প্রতিবেশী উজ্জল তাদের বাড়ির পাশে চাষাবাদ করত। উজ্জলের চাষ করা কলা বিক্রির জন্য বাজারে নিয়ে যাওয়ার সময় তানভীরের বাবা ফারুক মিয়া উজ্জলকে বলেছিলেন ‘তুই এই কলা চুরি করে নিয়ে এসেছিস’। পরে ওই কলা বিক্রির ঘটনা নিয়ে বাজারে সালিশ বৈঠক হয়। ওই সালিশে নিহত তানভীরের বাবা ফারুক মিয়া ঘাতক উজ্জলের বাবা সৈয়দ আলীকে অপমান করেন। উজ্জল এই অপমানের ঘটনা মেনে নিতে পারেনি। তার মনে জিঘাংসার উদ্রেক হয়। তার এ প্রতিশোধের আগুন দিনে দিনে বিশাল আকার ধারণ করে।

এদিকে, ঘাতক উজ্জলের বাবা সৈয়দ আলী তার পুত্রের হাবভাব বুঝতে পেরে ঝামেলা এড়াতে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে দেন। দীর্ঘ ৬ বছর পর দেশে ফিরে আসে উজ্জল। আবার তার মস্তিষ্কে জ্বলে ওঠে জিঘাংসার অনল। সে বিভিন্নভাবে ছক কষতে থাকে তার বাবার অপমানের বদলা নেয়া যায়। কিছুদিন থেকে নসরতপুর রেলগেইটে উজ্জল তার মোবাইল টেলিকমের দোকানে বসে পরিকল্পনা করে ফারুক মিয়ার একমাত্র ছেলে তানভীরকে অপহরণ করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী উজ্জল এবং জাহিদ তানভীরকে অপহরণ করার চেষ্টা করে। প্রথম চেষ্টায় তারা ব্যর্থ হয়, বেঁচে যায় তানভীর। এরই মাঝে উজ্জল আরও বিভিন্ন উপায়ে প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করে। পরবর্তীতে জাহিদের মাধ্যমে নীল নকশার অংশ নেয় শান্ত নামের আরেক জন।
পরিকল্পনা মতে গত ২৪ জানুয়ারি উজ্জল, জাহিদ এবং শান্ত তানভীরকে হত্যা করার চুড়ান্ত পরিকল্পনা করে। তাদের পরিকল্পনা মোতাবেক ওইদিন সন্ধ্যায় শান্ত কৌশলে তানভীরকে উজ্জলদের পুকুর পাড়ে ডেকে আনে। ঘাতক উজ্জল তৎক্ষণাৎ তানভীরের গলায় সুতা দিয়ে ফাঁস লাগিয়ে দেয়। শান্ত এবং জাহিদ উভয়েই তানভীরের মুখ চেপে ধরে রাখে। এতে কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পরে তানভীর। তাদের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী মরদেহটি হাত পা বাঁধা অবস্থায় পাশের মজা পুকুরে লুকিয়ে রাখে। এরপর ঘাতক উজ্জল লক্ষ্য করে মরদেহটি বার বার ভেসে উঠছে। তখন উজ্জল মৃতদেহের পেটে ছুরিকাঘাত করে যাতে ভেসে না উঠে। পরবর্তীতে তানভীরের মরদেহটি তারা তিনজন মিলে পুকুরে কাদাঁর নিচে চাপা দিয়ে রাখে। মরদেহের উপর অনেক কচুরিপানা দিয়ে রাখে যাতে লাশের সন্ধান কেউ না পায়।


লাশ গুম করার পর উজ্জল এবং জাহিদ তাদের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী অপহরণের নাটক সাজায়। পরে জাহিদ তানভীরের ব্যবহৃত সিম থেকে তার বাবার নাম্বার সংগ্রহ করে। এরপর উজ্জলের পরামর্শ অনুযায়ী ৮০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবী করে তানভীরের বাবা ফারুক মিয়ার কাছে। অপহরণ এবং মুক্তিপণ চাওয়ার বিষয়টি শায়েস্তাগঞ্জ থানাকে অবহিত করেন তানভীরের বাবা ফারুক মিয়া। এরপর সন্দেহজনক ভাবে উজ্জলকে আটক করে পুলিশ। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী শান্ত ও জাহিদকে আটক করা হয়। আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে বেড়িয়ে আসে ভয়ংকর তথ্য।
গত মঙ্গলবার (২৬ জানুয়ারি) দুপুরে আসামী উজ্জলের বাড়ীর পরিত্যক্ত একটি ডোবা থেকে তানভীরের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এদিকে, তানভীর হত্যা ঘটনায় বুধবার তানভীরের বাবা পাঁচ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও কয়েক জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেছেন। এ মামলার আসামীরা হলেন, উপজেলার পশ্চিম নছরতপুর গ্রামের সৈয়দ আলীর ছেলে উজ্জল মিয়া (২৫) ও নুরপুর গ্রামের মলাই মিয়ার ছেলে শান্ত (২৬) ও বাছিরগঞ্জ বাজারের জলিল কবিরাজের ছেলে জাহিদ মিয়া (২৮)। ইতোমধ্যে এই তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
শায়েস্তাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অজয় চন্দ্র দেব বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃত তিনজন এছাড়াও আরো দুইজনের নাম মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের পরিচয় এখন প্রকাশ করতে চাচ্ছি না।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *