‘মায়া’ – শামীমা রিতু।
মায়ার মনটা আজ মোটেও ভাল নেই। সকাল আটটা বাজে তবু তার বিছানা ছাড়তে ইচ্ছা হচ্ছে না। অনেক্ষণ পর সাড়ে ন’টায় মায়া হাত মুখ ধোয়ে নিল তারপর আলস্যের মত নাস্তা করল। আজ ওর বার বার মেনে হচ্ছে নদীর দারে বেড়াতে যাবে।
মায়া একা একা ছাদে গেল। আকাশের দিকে তাকিয়ে ওর হৃদয় প্রশান্তিতে ভরে গেল। কি সুন্দর শরতের আকাশ। একফোটা মেঘ নেই। তুলোর মত সাদা মেঘ যেন পাখির মত উড়ছে। মায়া রবীন্দ্রনাথ পড়তে খুব ভালবাসে। ছাদে ও একটা চেয়ার আছে সেখানে বসে ও বই পড়ে। চারদিকে কত পাখি ডাকছে, উড়ে বেড়াচ্ছে। শিউলী ফুলের গাছটা সাদা সাদা ফুলে ভরে গেছে। মায়া আনমনে ভাবছে কত তাড়াতাড়ি ওর জীবনটা বদলে গেল। বার বার ভাবে পাশের মানুষ গুলো কেন ওর সাথে এমনটা করল। মানুষের মন বড় আযব জিনিস। স্বার্থ যখন তার কাছে বড় হয়ে দাড়ায় তখন সে নিজেকে ছাড়া কাউকে চিনে না । মায়ার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। কিছুদির ধরে ওর কি হয়েছে বুঝতে পারে না । কাজে যায় না অনলাইনে ভাল লাগে না সারাদিন একা একা থাকে কার জন্য ওর মন এতটা অস্থির? কাকে ভাবে সে সারাক্ষণ?নিজের কাছ থেকে এর কোন উত্তর পায় নি মায়া। শরতের আকাশটা অনেক সুন্দর। পাখির কলতান যেন সময়টাকে আরো মোহনীয় করে তুলেছে। নিজের মনে মনে মায়া বলল-কি হবে মিথ্যা মরিচীকার আশা করে ! একটা দীর্ঘশ্বাস যেন সেই স্নিগ্ধ বাতাসকে মুহুর্তেই সিক্ত করে ফেলল । শরতের নীল সাদা আকাশ আর ফর্সা মায়ার গায়ে জড়ানো নীল সাদা উড়নাটা যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। প্রকৃতির সাথে এত মিল থাকার পরও কেন যেন বসন্ত আসতে চায়না মায়ার জীবনে !
হাঁপিয়ে উঠেছি আমি। আর পারছি না নিজের সাথে এ অভিনয় করতে। ভালো থাকার ভান করা মোটেই সহজ নয়, আমি বড্ড ক্লান্ত- নিজে নিজে বলল মায়া। তারপর চুপচাপ ছাদ থেকে নেমে তৈরি হয়ে বাইরে গেল। একটা পার্কের পুকুরপাড়ে বসল সে। চারদিকে নানা রঙের ফুল। তাদের পাঁপড়িতেও যেন শারদীয় আভা লেগেছে। অসংখ্য প্রজাপতি উড়ছে। পুকুরে নানা জাতের মাছ গুলো যেন স্বপ্ন হয়ে ভাসছে। মায়া নিরব হয়ে বসে আছে। হটাৎ ওর বান্ধবী তানিশা এসে বলল- ‘কিরে এখানে একা একা বসে কী ভাবছিস ? দার্শনিক হয়ে যাবি নাকি’? মুখে আলতো হাসি ফুটিয়ে মায়া বলল ‘ধুর কী যে বলিস না তুই’। কেমন আছিস? এই তো অাছি বেশ- মলিন মুখে বলল মায়া। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে তানিশা বলল, ‘শুন মায়া আমরা কলেজ জীবনে অনেকদিন একসাথে পড়েছি, ঘুরেছি, আড্ডা দিয়েছি। তোকে তো ভালবাবেই জানি। অদেখা একটা মানুষের জন্য ভেবে কি লাভ বল? সে তো তোকে নিয়ে মোটেই ভাবছে বলে মনে হয় না। দয়া করে তুই এসব ভাবনা ছেড়ে নিজের জন্য ভাব তাহলেই দেখবি সেও একদিন তোর কথা ভাবতে বাধ হবে। যারা প্রকৃত ভালবাসাকে অবহেলা করে তারাই একদিন এই ভালবাসার জন্য আফসোস করে! নিজেকে ধিক্কার দেয় সেই মানুষটাকে অবহেলা কার জন্য। আমি জানি তুই অনেক বড় হবার যোগ্যতা রাখিস। তোর কাছ থেকে আমরা অনেক কিছু আশা করি রে’। মায়া তানিশার কথা শুনছিল। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল ‘কি করব আমি’? তানিশা জোর গলায় বলল-কি করবি মানে? দুই নিজেও জানিস না তুই কত কিছু করতে পারিস, তুই ভালভাবে প্রস্তুতি নেয়া শুরু কর, জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করে দেখিয়ে দে তুইও তার থেকে কম নয়, এমন ভাবে যে,সে তোকে দেখে আফসোস করে, নিজের অবহেলার জন্য নিজেকে ধিক্কার দেয়।’ অবাক হয়ে তানিশার দিকে তাকায় মায়া, চোখ দিয়ে বর্ষার শ্রাবণধারার মত জল পড়ছে। তানিশা দেখতে পেল মায়ার চোখে অপার বিষ্ময় , দিগন্ত জোড়া অদৃশ্য ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অভিলাষ । তানিশা মায়ার হাতে হাত রেখে বিজয়ী দৃষ্টিতে তাকাল। পাশেই একটা কাঠঠোকরা পাখি অনরবত গাছের গায়ে ঠোকরিয়ে চলেছে তার অনির্বাণ প্রচেষ্টা সফল করার জন্য , সেদিকে তাদের মোটেও খেয়াল ছিল না ।





