“মতি” – শামীমা রিতু।
এক.
আজ বৃষ্টি আসবে আসবে করেও আসছে না। নদীর পাড়ে লেবুর ঝোপের ধারে বসে আছে মতি। আজ খেলতে যাবার ইচ্ছাও নাই তার। জৈষ্ঠ্য মাস। গরমে এই জারুল গাছের ছায়াতে ভালই লাগছে তার। চারদিকে পাখির ডাক, সামনে দিয়ে বয়ে চলা জলাই নদী। মতির মন উদাস হয়ে গেছে। এগারো বছরের বালক এমন পরিবেশে চুপচাপ বসে থাকার কথা নয়,কিন্তু তার জীবনটা আর দশটা বালকের মত নয় বলেই সে একা চুপচাপ এখানে বসে আছে।
জলাই নদীর ওপাড় জুড়ে ফসলের সমাহার। নানা রকমের ফসলে পরিপূর্ণ। সেইসাথে আছে নামহীন ফুলের মেলা। নির্বাক চাহনিতে সব দেখছে মতি। বিশাল পৃথিবীতে সে যেন একা, চারপাশের এ পরিবেশই যেন তার নিত্যসংগী।
দুই.
মতি ছোটবেলা থেকে ই তার নানা নানীর কাছে বড় হয়েছে। মতির জীবন আকাশের মত ই বিচিত্র। কখনো সাদা মেঘের ভেলা, কখনো রংধনুর মেলা আবা কখনো কালো মেঘে ছাওয়া!
মতির মায়ের বিয়ে হয়েছিল তা বয়সে তিনগুন বড় একজন প্রবাসীর সাথে।সেই লোকটি মতিকে দুই মাসের গর্ভে রেখেই বিদেশ পাড়ি দেয়। তারপর আর আসেনি। মতি বুঝ হবার পর অনেক অনুনয় বিনয় করেছে তারপরেও লোকটি আসতে চায়নি। মতি যখন তিন বছরের তখন মতির মা তার বাবাকে তালাক দিয়ে অন্য একজনকে বিয়ে করে। তাতে মতি হয়ে যায় অসহায়। এই অল্প বয়সে তাকে সহ্য করতে হয়েছে জীবনের কঠিন বাস্তবতার আঘাত।মা বাবাহীন প্রায় এতিমের মত জীবন কাটছে তার। কেননা মায়ের নতুন সংসারে ঠাই হয়নি মতির। উদাস মনে সে ঘুরে বেড়ায় গ্রাম ময়। নদীর জলে ভেসে যাওয়া শ্যাওলার মতই তার জীবন। তার মামারা বলেছে আরো কিছুদিন গেলেই তাকে কাজে লাগিয়ে দিবে। মতির ইচ্ছা সে অনেক বড় লোক হবে। তার মত অসহায়দের আশ্রয় দিবে। শিশুমনে বাস্তবতার টানেই এমন চিন্তার উন্মেষ হয়েছে তার।
মতির বাবা দেশে ফিরেনি, মায়ের জীবনও গোছানো কিন্তু মতি! সে তো ডানা ভাংগা পাখির মত! মাঝে মাঝে সে ভাবে মানুষ বিয়ে করে কেন?কেন সন্তান জন্ম দেয়? অন্য মানুষরা তো এমন করে না! তার সাথের কত শিশুরা মা বাবার সাথে থাকে। তারও থাকতে যখন খুব ইচ্ছা হয় তখন সে কাঁদে। সে কান্না জানে শুধু জলাই নদী! মানব সন্তান জন্মদান সহজ কিন্তু পিতা কিংবা মাতা হওয়া অনেক কঠিন।
তিন.
বিকাল হয়ে গেছে কিন্তু মতির খোজ নেই। তার বৃদ্ধ নানী তাকে খোঁজতে বের হলেন। তিনি জানেন সে কোথায় কোথায় যায়।ডাকতে যাকতে লেবুর ঝোঁপেই পেলেন। বকা ঝকা করতেও পারেন না তাকে। এই নানীই তাকে লালন পালন করে এত বড় করেছেন। অবাক হয়ে দেখলেন তিনি মতি কাঁদছে। একাকীত্ব আর অসহায়ত্বের এই কান্নার কোন সান্ত্বনা হয় না। নীরবে তিনি হাত ধরলেন,সেই সকালে রুটি চা খেয়েছিলো মতি আর কিছু খায়নি । বিশাল দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মতি চললো নানীর ঘরের দিকে। ভাংগা ঘরে চাঁদের আলোয় মতি স্বপ্ন দেখে বড় হবার স্বপ্ন। সে ভাবে তার বাবা মায়ের কি কস্ট হয়না তার জন্য?কেন তাকে আবর্জনার মত ছুড়ে ফেলে দিলো তারা! রাত গভীর হয়, ঘুম হীন চোখে মতি ভেবে যায় সেই অজানার ভাবনা।





