#সাহিত্য ও সংস্কৃতি

পরান বাবু – ইফতেখার চৌধুরী।

পরান বাবু আজ খুশিতে আত্মহারা হয়ে গান ধরেছেন। “লোকে বলে, বলেরে ঘর বাড়ি বালা না আমার…”

খুশির কারনটা কিছুটা আধি ভৌতিক হতেও পারে। তবে এই ভুতের গল্পে আসলে ভীতি নাই। খালি মজা আর মজা। ভুত বাবাজীর যেমন উল্টা দিকে পা, পরান বাবুর জীবন ও তেমন উল্টা পা হয়ে আছে। উনার বয়েস বাড়ছে না। বাড়ছে না বলা ভুল হতে পারে, বলা যায় কমে যাচ্ছে।

বছর ত্রিশেক আগে পরানের বয়েস যখন ২৪/২৫ হবে, তখন পরানের শখ হলো বিয়ে করবার। বাবা-মায়ের কাছে আবদার করতেই পরানের মা খুব করে বকা দিলেন। ২০ বছর বয়েসে কি কেউ বিয়ে করে হে ছোড়া? তুই তো এখনো ছোট্ট বাবু। আরো কয়েকটা বছর যাক না বাবা। পরান মায়ের কথায় রুস্ট হয়ে বলতে লাগলো, আমি আসছে অগ্রানে আমার বয়েস হবে ২৫ আর তুমি বলছো ২০। এ কেমন কথা? পরানের মা মুচকি হেসে সেদিন বলেছিলেন ” থাক না বাবা, আরো কিছুকাল বিশে!”।

তারও ১০ বছর পরে, “পরানের বিশ” বছর বয়েসে বিয়ে করার অনুমুতি পান তিনি। বিয়ে করেন। তার সব বন্ধুরা যখন ছেলে মেয়েদের স্কুলে পাঠাচ্ছে, তখন তার সাধ হয় নতুন বউকে নিয়ে ঘুরতে যাবেন। পরানের বউ রাজি হয় না। তার কথা, এই বিশ বছর বয়েসেই তাকে সংসারের হাল ধরতে হবে। ছোট্ট পরান তখন পাশের বাড়ির খগেনের কাছে যান, পরামর্শ করতে।

খগেন আর পরান ছিলেন নেংটা কালের বন্ধু। প্রকৃতির নির্মম পরিহাস, সেই খগেন এখন দুইটা বিচ্ছুর বাবা। বেচারার বয়েস মনে হয় পয়ত্রিস হয়ে গেলো। এদিকে পরান সেই যে “বিশের বিশ”, তাই রয়ে গেছে। গঞ্জের বাজারে অবশ্য পরান খগেনকে চিনেও না চেনার ভান করেন। এই রকম সিনিয়র মানুশের সাথে তো একটা দুরত্ব রাখতেই হয়।

খগেনবাবু, বাড়ি আছেন? পরান হাকেন। অনেক অনেক বছর পরে, বাল্যবন্ধুর এই আদিখ্যেতার তামাসায় বিপর্যস্ত অতিসয় বিনয়ী খগেন বাবু কিছুটা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে বাড়ীর আংগিনায় দৌড়ে আসেন। “এযে আমাদের পরান রে!”

ইতোস্তত পরান বুঝে উঠতে পারেন না, কি নামে ডাকবেন তার বাল্যবন্ধুকে। সাহস করে একবার দাদা বলে ডাকলে কি হয় ভাবতে ভাবতেই, মুখ থেকে বেড়িয়ে গেলো শব্দযুগল। “আজ্ঞে দাদা”।

তার মুখে দাদা শুনে খগেন দিগ্বিদিকজ্ঞানশুন্য হয়ে যাচ্ছিলেন। তবুও সামলে নিলেন। ভদ্রলোকেরা নাকি অকারেন বিবাদ করেনা। তাই, খগেন উত্তর দিয়েছিলেন “কি হে পরান” বলে?
পরান সেই থেকে তার লেঙ্গুটি বন্ধুকেও দাদা ডাকা শুরু করেন। খগেনের সাথে শলা করে পরান ঠিক করেন যে সংসার শুরু করতেই হবে। কি আর করা!

এরপরে তো বুড়িগংগার জল কালো হতে হতে আলকাতরার মতো হয়ে গেলো। পরানেরো “দুই তিন বছর পর পর, এক এক করে” বয়েস বারে। কিন্তু তার বেয়াড়া ছেলে, ঠাই ঠাই করে “বিশের” হয়ে গেলো প্রায়। ছেলের বয়েস টা তো আর বেধে রাখ হয়নি।

পরান এখন তার পিশ’তো ছোট ভাই নির্মল, জেঠাতো দিদির হাটুর বয়েসী মেয়ে চপলা এদের সাথে নিজের বয়েসের মিল খুজে পান। যদিও নিন্দুকেরা বলে এরা সবাই তার থেকে বছর বিশকের ছোট হবে। কিন্তু, পরানের তাতে কি আসে যায়?

নিজের ছেলে আর মেয়ে বিশ ছুই ছুই, নাহলে তিনি এখনো বিশেই থাকতেন।

খগেনের পঞ্চান্ন হলে তার কি আসে যায়? ছেলের বিশ হলে আমার চল্লিশ ই সই।

পরান জনে জনে তার চল্লিশের গান শুনান। খগেনের মতো চক্ষু লজ্জ্বায় নির্মল আর চপলাও চুপ থাকে।

পরান গান ধরেন…।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *